মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আশ্বিনের শারদ প্রাতে রেডিওয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনীর স্তোত্রর। জানান দেয় পুজো এসেছে। শরতের শিউলি ফোটা ভোর শোনায় মহালয়ার সুর। বেজে ওঠে পুজোর দামামা। গঙ্গায় পিতৃতর্পণ সেরে সারাদিন চলে পুজোর কেনাকাটা। তবে, এবার মহালয়ার দিনটা একটু অন্যভাবে কাটতে চলেছে তিলোত্তমার। মহালয়ার সন্ধ্যা আরও মোহময় হয়ে উঠতে চলেছে ইডেন উদ্যানে রাজ্য সরকারের আয়োজিত মা দুর্গার আবাহনের অনুষ্ঠানে। সেখানে একছন্দে বাজবে তিন হাজার ঢাক। এক হাজার উলুধ্বনিতে মুখরিত হবে বাংলার আকাশ-বাতাস। শঙ্খধ্বনির আওয়াজ জানান দেবে, মা আসছে বাংলার ঘরে ঘরে। নাচে-গানে তিন হাজার ড্রোনের রঙিন আলোয় মাতৃ আবাহনের অভাবনীয় অভিনব দৃশ্যের সাক্ষী থাকবে গোটা বিশ্ব। ঢাকের বোল এবং শঙ্খের মিলিত ধ্বনি বিশ্বরেকর্ড গড়বে।
৪৫ হাজার দর্শকের সমাগম
১০ অক্টোবর ইডেন গার্ডেন্সে মহালয়া উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে। দুর্গাপুজোর সূচনা উদ্যাপনে এই অনুষ্ঠানে প্রায় ৪৫ হাজার দর্শকের সমাগম হতে পারে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি রেড রোডে শোভাযাত্রায় অংশ নিতে পারেন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ। ভিড় সামলাতে টি-২০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের সময়কার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ধাঁচেই প্রস্তুতি নিচ্ছে কলকাতা পুলিশ। স্টেডিয়াম চত্বরে দুই স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি রেড রোডে শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে আরও প্রায় ১৫ হাজার মানুষের জমায়েত হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। সেখানেও পৃথক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সচিবের নেতৃত্বে একটি সমন্বয় বৈঠক হয়। সেখানে কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পুরসভা, রাজ্যের পূর্ত দফতর-সহ একাধিক বিভাগের আধিকারিকেরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয় এবং দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, স্টেডিয়ামের আশপাশে বিশেষ বাহিনী ও কুইক রেসপন্স টিম মোতায়েন থাকবে। দর্শকদের প্রবেশ, বেরিয়ে আসা এবং গোটা সন্ধ্যায় ভিড়ের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজর রাখা হবে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ
বাংলার সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব দুর্গাপুজোর সূচনা উপলক্ষে মহালয়ার দিন ইডেন গার্ডেন্সে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে সাজানো হবে এই অনুষ্ঠান। ঢাকের বাদ্যি, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, থ্রিডি প্রজেকশন ম্যাপিং, ড্রোন শো এবং আতশবাজির প্রদর্শনী অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে। প্রায় চার ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক দর্শকের সমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে। রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ১০ হাজার ঢাকি এবং এক হাজার মহিলা এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন। বাংলার বিভিন্ন জেলার নিজস্ব নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও তুলে ধরা হবে।
রেড রোডে বিকেল ৪টেয় শোভাযাত্রা
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, রেড রোডে অনুষ্ঠান বিকেল ৪টে নাগাদ শুরু হবে। অনুষ্ঠানটি প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট চলার কথা। এরপর ইডেন গার্ডেন্সে মূল অনুষ্ঠান চলবে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা। শনিবার আলোকোজ্জ্বল রেড রোড ধরে খোলা জিপে ইডেনের উদ্দেশে রওনা হবেন মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপাল আর এন রবি। রাস্তার পাশে একেকটি জেলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, শিল্পকলা ও সেখানকার সংগীত-নৃত্য তুলে ধরতে সাজানো হয়েছে স্টেজ। রেড রোড হয়ে সেই শোভাযাত্রা যাবে ইডেনে। সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি থাকবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ড্রোন শো থেকে থ্রি ডি প্রজেকশন ম্যাপিং শো। তাতে ফুটে উঠবে মা দুর্গার আবাহন।
ইডেন থেকে বুর্জ খলিফায়
এই অনুষ্ঠান ইডেন থেকে পৌঁছে যাবে প্রবাসেও। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা, আমেরিকার বস্টন এবং নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারের একসঙ্গে এই অনুষ্ঠান দেখতে পাবেন সেখানকার মানুষও। কলকাতার মূল অনুষ্ঠানের সঙ্গেই জেলায় জেলায় শুরু হয়ে যাবে উৎসব। শুক্রবার পর্যন্ত যে তালিকা রয়েছে তাতে ঠিক আছে, ইডেনে আজকের অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করবেন শান, লগ্নজিতা, কৌশিকী চক্রবর্তী, অন্তরা মিত্র। থাকবে বাংলা ব্যান্ড দোহার এবং শান্তনু মৈত্র ও তাঁর গ্রুপ। এছাড়াও যন্ত্রসঙ্গীতে দেবর্ষি ভট্টাচার্য-সহ অন্যরা।
যান চলাচলে বিধিনিষেধ
ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ময়দান এলাকায় একাধিক বিধিনিষেধ জারি করা হতে পারে। কিংসওয়ে দিয়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। রেড রোডেও একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। শহরের বাস পরিষেবার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি করা হবে। ট্রাফিক পুলিশ চৌরঙ্গি রোড দিয়ে বাসের গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ব্যক্তিগত গাড়ি ও ভাড়া করা গাড়ির পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। আইপিএলের ম্যাচের দিনের পার্কিং ব্যবস্থার ধাঁচে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। স্ট্র্যান্ড রোড সংলগ্ন এলাকাতেও গাড়ি রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
আমন্ত্রণপত্র থাকলেই ইডেনে প্রবেশ
মহালয়া উপলক্ষে কলকাতার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আলোকসজ্জায় সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্য সরকারের। রেড রোডের শোভাযাত্রায় বাংলার বিভিন্ন জেলার নিজস্ব নৃত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরা হবে। এই শোভাযাত্রা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তবে ইডেন গার্ডেন্সের মূল অনুষ্ঠানে প্রবেশের ক্ষেত্রে আমন্ত্রণপত্র বাধ্যতামূলক থাকবে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগমের কথা মাথায় রেখে নিরাপত্তা, যান নিয়ন্ত্রণ, পানীয় জল, শৌচাগার এবং পরিচ্ছন্নতার মতো একাধিক বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন।
ড্রোন দিয়ে আকাশপথে নজরদারি
গঙ্গার দুই পাড়কেও উৎসবের রঙে সাজিয়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে। থাকছে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিভিন্ন শিল্পী ও ব্যান্ডের পরিবেশনার পাশাপাশি থাকছে গঙ্গা আরতি। এদিকে, ইডেনের এই মেগা অনুষ্ঠানের জন্য স্ট্যান্ড রোড-সহ একাধিক রাস্তায় পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ। কলকাতা ট্র্যাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্ট্র্যান্ড রোড, সেন্ট জর্জেস গেট রোডে রাজা উডমন্ট স্ট্রিট ও হেস্টিংস ক্রসিংয়ের মধ্যে কোনও পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকছে। শনিবার ভোর চারটে থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ জারি থাকছে। তবে জরুরি পরিষেবা দেওয়া পণ্যবাহী যানগুলিকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিটি রোড, খগেন চ্যাটার্জি রোড, কাশীপুর রোড, স্ট্র্যান্ড ব্যাঙ্ক রোড, রবীন্দ্র সরণি (কেভিভি অ্যাভিনিউ থেকে বি কে পাল অ্যাভিনিউ পর্যন্ত), শোভাবাজার স্ট্রিট, নিমতলা ঘাট স্ট্রিটও বন্ধ রাখা হচ্ছে। বাবুঘাট রুটের বাসগুলি হেয়ার স্ট্রিট এবং স্ট্র্যান্ড রোডের ক্রসিংয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে। মহালয়া উপলক্ষে শহরে ১৫০০ পুলিশ মোতায়েন থাকছে। জলপথ, সড়কপথে নজরদারি চলছে। ড্রোন দিয়ে আকাশপথেও নজরদারি চলছে।
