মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ (Human Trafficking In Bengal) করিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগে একটি বড় মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA)। তদন্তকারীদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ এবং বাগদা সীমান্ত এলাকাকে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে এই চক্র অবৈধ অনুপ্রবেশের কাজ চালিয়ে আসছিল। এনআইএ সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর বাসিন্দা সাহাবুদ্দিন মণ্ডল-সহ মোট সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগ, তারা একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের সদস্য। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের সীমান্তের অরক্ষিত অংশ দিয়ে ভারতে প্রবেশ করানো হতো।
কীভাবে চলত অবৈধ অনুপ্রবেশ
তদন্তে উঠে এসেছে, সীমান্ত (Indo-Bangladesh Border) পার হওয়ার পর অনুপ্রবেশকারীদের প্রথমে সড়কপথে হাওড়া স্টেশনে নিয়ে আসা হতো। সেখান থেকে ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থা করে তাদের দিল্লি, মুম্বই, পুণে, সুরাট, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু এবং হায়দরাবাদ-সহ দেশের বিভিন্ন শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এনআইএ-র প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, এই চক্র শুধুমাত্র অবৈধ অনুপ্রবেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তারা এমন একটি সুসংগঠিত ট্রানজিট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, যার মাধ্যমে সীমান্ত পেরিয়েই দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ত অনুপ্রবেশকারীরা। গোটা চক্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, অর্থ লেনদেন এবং বিদেশি যোগসাজশ রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
তদন্তকারী সংস্থার মতে, বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তের অরক্ষিত অংশ দিয়ে সহজে অনুপ্রবেশের অভিযোগ সামনে আসায় সম্পূর্ণ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছে এনআইএ। অনুপ্রবেশ ঠেকানো মোদি সরকারের কাছে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আগেই এই কথা বারবার বলে এসেছেন বিজেপির নেতারা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেলন, সরকার ডিটেক্ট-ডিলিট-ডিপোর্ট এই নীতির মাধ্যমে খুঁজে খুঁজে এক একজন অনুপ্রবেশকারীকে বাংলার (পশ্চিমবঙ্গ) বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। ইতিমধ্যেই সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ-কে দ্রুত ফেন্সিংয়ের কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন শাহ। উপদ্রুত এলাকায় ত্রিস্তরীয় ফেন্সিং-এর কথা বলেছেন। প্রয়োজনে আরও আধুনিক যন্ত্র আনার কথাও হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণ
এই ঘটনাকে ঘিরে ফের আলোচনায় এসেছে পশ্চিমবঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণের বিষয়টি। সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF)-র দাবি, দীর্ঘদিন ধরে জমি না পাওয়ায় অনেক এলাকায় বেড়া নির্মাণের কাজ আটকে ছিল। রাজ্য সরকারের দাবি, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সীমান্তে বেড়া নির্মাণের জন্য প্রায় ১,০২৫ একর জমি বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। আগামী দিনে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-এর পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকা সফরেরও কথা রয়েছে, যেখানে বেড়া নির্মাণের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রায় ৮৬৪ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গে। যার একটা বড় অংশ উত্তরবঙ্গের।
প্রভাবশালী যোগাযোগ
তবে তদন্তকারী মহলের একাংশের মতে, এত বড় মানবপাচার ও অনুপ্রবেশ চক্র কোনও প্রভাবশালী যোগাযোগ ছাড়া পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ফলে এই চক্রের সঙ্গে অন্য কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও বিস্তারিত তদন্ত চালাচ্ছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ। আন্তর্জাতিক সীমান্তে নজরদারির রাশ (India Bangladesh Border Security) আরও শক্ত করতে ইতিমধ্যেই বড়সড় পদক্ষেপ করেছে প্রশাসন। পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশের চেনা ছক সম্পূর্ণ বানচাল করতে এক অভিনব ও কঠোর যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত পেরিয়ে যাতে কোনওভাবেই অনুপ্রবেশ না ঘটতে পারে, তার জন্য নিশ্ছিদ্র ব্লু-প্রিন্ট তৈরির কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে (Bengal Border Infiltration Plan)। সীমান্ত সংলগ্ন দুর্গম এলাকাগুলিতে নজরদারি দ্বিগুণ করা, সীমান্তে যে কোনও ধরনের সন্দেহজনক গতিবিধি নজরে এলে দেরি না করে দ্রুত পদক্ষেপ করা, স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয় আরও মজবুত করা এবং সবচেয়ে বড় কথা, অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত যে কোনও গোপন বা গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের প্রক্রিয়াকে আরও বেশি গতিশীল ও মসৃণ করার উপর জোড় দেওয়া হয়েছে।
