তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
অতিমারির সংক্রমণ রুখতে কিংবা মায়ের প্রসবের জটিলতা কমাতে, প্রথম সারির স্বাস্থ্য ‘যোদ্ধা’ আশা কর্মী। রাজ্য জুড়ে প্রাথমিক পর্বের স্বাস্থ্য পরিষেবা তাঁরাই দেন। গ্রাম হোক বা শহর, আশা কর্মীদের উপরেই জনস্বাস্থ্য পরিষেবা অনেকটাই নির্ভর করে আছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও রাজ্যজুড়ে আশা কর্মীদের সঙ্গে মমতার সরকারের বেনজির সংঘাত (ASHA workers vs Mamata Government) শুরু হয়েছে। নিয়মিত ভাতা পাওয়া সহ কয়েক দফা দাবিতে বারবার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার আবেদন জানানো সত্ত্বেও আশা কর্মীদের সমস্যা সমাধান নিয়ে সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এমনটাই অভিযোগ রাজ্যের অধিকাংশ আশা কর্মীর। আলোচনার আশ্বাস পেয়ে স্বাস্থ্য ভবন যাওয়ার পথেও তাঁরা দিনভর হয়রানির শিকার হন। টানা ৩০ দিন ধরে রাজ্যজুড়ে কর্মবিরতি (Asha Workers Shortage) পালন করছেন আশা কর্মীরা। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধের কথাও তাঁরা জানিয়েছেন। আর এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, রাজ্য আজ ‘স্বাস্থ্য বিপর্যয়’-র (Public Health Crisis) মুখে দাঁড়িয়ে।
আশা কর্মীদের অনুপস্থিতি কেন রাজ্যে স্বাস্থ্য বিপর্যয় তৈরি করতে পারে?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, রাজ্যের প্রাথমিক পর্বের স্বাস্থ্য পরিষেবায় আশা কর্মীদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মূলত মহিলাদের সন্তান প্রসবকালে আশা কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আশা কর্মীরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী। টিকাকরণ, প্রসবকালীন প্রয়োজনীয় সাহায্য তাঁরা করেন। তাছাড়া কোনও এলাকায় সংক্রামক রোগ হচ্ছে কিনা সেই তথ্য সংগ্রহ করা, কীভাবে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করা যাবে সেই সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা আশা কর্মীদের কাজ। তাঁরা প্রশাসন এবং জনগণের মধ্যে সেতু নির্মাণ করেন। জনস্বাস্থ্যে তাই আশা কর্মীদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য প্রশাসনের একাংশ জানাচ্ছেন, রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব অর্থাৎ বাড়িতে নয়, হাসপাতাল কিংবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সন্তান প্রসব এবং মায়ের মৃত্যুরোধে আশা কর্মীদের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ থাকে। গর্ভাবস্থায় মায়ের জরুরি আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেন আশা কর্মী। আবার নবজাতকের কোন কোন টিকা প্রয়োজন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই টিকাকরণ হচ্ছে কিনা, সেই সম্পর্কে সমস্ত তথ্য আদানপ্রদান হয় আশা কর্মীর মাধমেই। আশা কর্মীর হাত ধরেই রাজ্যের কয়েক কোটি শিশু সময় মতো পোলিও, রুবেলা, মিজেলস ভ্যাকসিন পায়। রোগ প্রতিরোধ হচ্ছে। আশা কর্মীর অনুপস্থিতি তাই শিশুদের সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যক্ষ্মা থেকে করোনা, ডেঙ্গি-ম্যালেরিয়া থেকে নিপায় দরকার আশা কর্মীদের
নবজাতক, গর্ভবতী ও শিশুদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার পাশপাশি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে আশা কর্মীদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, এলাকার কোথায় যক্ষ্মা রোগী আছে, আক্রান্ত সম্পূর্ণ চিকিৎসা করাচ্ছেন কিনা, রোগ ছড়িয়ে যাতে না পড়ে সে দিকে নজর দেওয়া, সবটাই করেন আশা কর্মী। ভারতে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে মূল প্রতিবন্ধকতা অসম্পূর্ণ চিকিৎসা। যা আশা কর্মীরা নজরদারি করেন। আক্রান্ত যাতে সম্পূর্ণ চিকিৎসা করান, সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। প্রয়োজনে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যান। আশা কর্মীর অভাবে সেই কাজেও ছেদ পড়ছে। যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
করোনা, নিপার মতো জটিল ভাইরাস ঘটিত সংক্রামক রোগ কিংবা ডেঙ্গি-ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত সংক্রামক রোগ, যেকোনও স্বাস্থ্য সঙ্কট রুখতে আশা কর্মীদের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। এমনটাই জানাচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাঁরা জানাচ্ছেন, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের মূল হাতিয়ার জনসচেতনতা। আর এই জনসচেতনতার কাজ চালান আশা কর্মীরা। দিন কয়েক আগেই রাজ্যে নিপা ভাইরাসের দাপট দেখা গিয়েছিলো। করোনা মহামারির স্মৃতি এখনো তাজা। তাছাড়া বছরভর ডেঙ্গি-ম্যালেরিয়ার দাপট রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আশা কর্মী কতখানি জরুরি তা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। এলাকায় কোথায় কে কোন ধরনের অসুখে আক্রান্ত প্রশাসন সেই খবর আশা কর্মীদের থেকেই পায়। তাঁদের অনুপস্থিত কার্যত প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছেদ ঘটালো বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে পথে আশা কর্মীরা?
রাজ্যে প্রায় ৮০ হাজার আশা কর্মী রয়েছেন। কয়েক মাস ধরেই তাঁরা নিজেদের নানান দাবিতে সরব হয়েছেন। কিন্তু মঙ্গলবার পুরুলিয়া, আসানসোল থেকে শিয়ালদা, নিউটাউন— রাজ্যের একাধিক জায়গায় আশা কর্মীদের সঙ্গে রাজ্য সরকারের বেনজির সংঘাত সামনে এল। আশা কর্মীদের তরফে জানানো হয়েছে, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন তাঁরা নিয়মিত পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না। তাঁরা পাঁচ হাজার টাকা ভাতা পান। কিন্তু কয়েক মাস ধরে সেই টাকাও অনিয়মিত পান। স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার পাশপাশি রাজ্য সরকারের আয়োজিত সমস্ত মেলা এবং অনুষ্ঠানে তাঁদের বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকতে হয়। অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। কিন্তু পরিবর্তে তাঁরা কোনও অতিরিক্ত পারিশ্রমিক পান না। ছুটির অধিকার তাঁদের নেই। ছুটি নিলেই কাজ থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি টাকাও কেটে নেওয়া হয়। আশা কর্মীদের দাবি, তাঁদের নিয়মিত পারিশ্রমিক দেওয়া হোক। তাঁদের বেতন অন্তত ১৫ হাজার টাকা করা হোক। এছাড়াও তাঁদের ছুটির অধিকার রাজ্য সরকার নিশ্চিত করুক। অতিরিক্ত কাজ করলে অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের দাবি তাঁরা করেছেন।
কেন রাজ্য সরকারের সমালোচনায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মহল?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, রাজ্যের ৮০ হাজার আশা কর্মী দিনের পর দিন অনুপস্থিত থাকলে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা কার্যত ভেঙে পড়বে। আর তার ফলে কয়েক কোটি সাধারণ মানুষ ভুক্তভোগী হবেন। রাজ্য জুড়ে মা ও শিশু মৃত্যুর হার বাড়তে পারে। সংক্রামক রোগের দাপট ও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। রাজ্য সরকার আশা কর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় বসলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারত। মঙ্গলবার আলোচনার আশ্বাস দেওয়ার পরেও যেভাবে কলকাতা সহ রাজ্যের একাধিক জেলায় আশা কর্মীদের হেনস্থা করা হয়েছে, তাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। দ্রুত আশা কর্মীদের দাবি নিয়ে আলোচনা করে, পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে, রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে।









