মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ছত্তিশগড়ের মাওবাদী (Chhattisgarh Naxalism) দমনে ফের বড়সড় সাফল্য পেল পুলিশ ও যৌথ নিরাপত্তা বাহিনী। দক্ষিণ বস্তার দান্তেওয়াড়া এবং কাঙ্কের জেলায় দুটি পৃথক অভিযানে মাওবাদীদের লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক, সোনা ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। সময়মতো মাওবাদীদের এই গোপন আস্তানা বা ‘ডাম্প’গুলির হদিশ মেলায় বড়সড় নাশকতার ছক ব্যর্থ করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
আত্মসমর্পণকারীদের তথ্যে তোলপাড় দান্তেওয়াড়া
পুলিশ সূত্রে খবর, সম্প্রতি মাওবাদী মতাদর্শ এবং হিংসার পথ ছেড়ে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে এসেছে বেশ কিছু মাওবাদী। তাদেরই দেওয়া সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত তথ্যের ভিত্তিতে দান্তেওয়াড়া জেলার বারসুর থানার অন্তর্গত তোড়মা গ্রামের ঘন জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকায় একটি বিশাল তল্লাশি অভিযান (Dantewada Operation) চালানো হয়। সেখানেই মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা একটি বিশাল গোপন ডাম্পের সন্ধান পায় বাহিনী। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মোট বাজার মূল্য প্রায় ১৮ লক্ষ টাকা। পুলিশের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে বড়সড় হামলা চালানো এবং এলাকায় নাশকতামূলক কাজের উদ্দেশ্যেই মাওবাদীরা এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছিল।
দান্তেওয়াড়া থেকে উদ্ধার হওয়া সামগ্রী (Maoist Arms Recovery)
১১৬ গ্রাম ওজনের সোনার বিস্কুট, যার আনুমানিক বাজার মূল্য ১৬ লক্ষ টাকা। নগদ ২ লক্ষ টাকা। ১টি ইনসাস (INSAS) রাইফেল এবং ১৬টি ইনসাস ম্যাগাজিন। ৪টি একে-৪৭ ম্যাগাজিন এবং ৬৮ রাউন্ড গুলি। ২৩টি এসএলআর (SLR) ম্যাগাজিন এবং ৩৪ রাউন্ড গুলি। ৫টি ১২-বোর বন্দুক এবং ৭ রাউন্ড গুলি। ৩টি বিজিএল (BGL) লঞ্চার এবং ১টি বিজিএল সেল। ২টি কারবাইন ম্যাগাজিন। ৮টি .৩০৩ রাউন্ড গুলি এবং ৪৫টি .৩০৩ চার্জার। ১০টি ভাঙা ভরমার বন্দুক, ১টি রিভলভার এবং ১টি এয়ারগান। ৬টি টিফিন বোমা, ৪টি পাইপ বোমা, ১২২টি তির বোমা, ১টি প্যারা বোমা, ২টি দেশি হ্যান্ড গ্রেনেড, ২টি দেশি মর্টার, ১ স্টিল বক্স জিলেটিন, ২০টি ডেটোনেটর, ১ বান্ডিল কোডেক্স ওয়্যার এবং ১৪টি কুকার। এছাড়াও উদ্ধার করা হয়েছে, মাওবাদী ইউনিফর্ম, ওষুধ, লিফলেট-প্যামফলেট এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
মাওবাদীদের বার্তা পুলিশের
বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও রসদ উদ্ধারকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে প্রশাসন। বস্তার রেঞ্জের পুলিশ আইজি বদ্রী নারায়ণ মিনা, সিআরপিএফ ডিআইজি (অপারেশনস) রাকেশ চৌধুরী এবং দান্তেওয়াড়ার পুলিশ সুপার গৌরব রাইয়ের যৌথ নির্দেশনায় ও তত্ত্বাবধানে এই অভিযানটি সফল হয়। দান্তেওয়াড়া পুলিশের পক্ষ থেকে সমস্ত পথভ্রষ্ট মাওবাদীদের স্পষ্ট বার্তা, হিংসার পথ ও মাওবাদী মতাদর্শ পুরোপুরি ত্যাগ করে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসে। অস্ত্র ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে শান্তি, অহিংসা ও এলাকার উন্নয়নের পথে শামিল হওয়ার জন্যও বার্তা জেলা পুলিশের।
কাঙ্কের-নারায়ণপুর সীমান্তেও উদ্ধার ‘মাওবাদী ডাম্প’
অন্যদিকে, দান্তেওয়াড়ার পাশাপাশি ছত্তীসগঢ়ের কাঙ্কের ও নারায়ণপুর জেলার সীমান্তবর্তী কোয়লিবোড়া থানা এলাকাতেও মাওবাদীদের আরও একটি গোপন আস্তানার সন্ধান পেয়েছে বাহিনী। আলপরাস ও গুমচুর গ্রামের মধ্যবর্তী পাহাড়ি জঙ্গলে রুটিন টহলদারির সময় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (BSF) এবং ডিস্ট্রিক্ট রিজার্ভ গার্ড (DRG)-এর একটি যৌথ দল মাটির নিচে কিছু লুকানো রয়েছে বলে সন্দেহ করে। এরপর সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি করতেই উদ্ধার হয় আধুনিক ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র। কাঙ্কেরের পুলিশ সুপার নিখিল রাখেচা, বিএসএফ-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ড্যান্ট অঙ্কুশ কুমার এবং কোয়লিবোড়ার থানা ভারপ্রাপ্ত পরিদর্শক নির্মল জংড়ের নেতৃত্বে এই যৌথ অভিযানটি সফল হয়।
কাঙ্কের থেকে উদ্ধার হওয়া সামগ্রী
২টি .৩০৩ রাইফেল এবং ৩২ রাউন্ড তাজা গুলি। ১টি ল্যাপটপ এবং ১টি ট্যাবলেট। ১টি রেডিও সেট এবং ৩টি ওয়্যারলেস ব্যাটারি। ২টি মাওবাদী ইউনিফর্ম এবং ৫টি পাউচ। ২টি চার্জার এবং ১টি সাধারণ ব্যাটারি। বিপুল পরিমাণ মাওবাদী সাহিত্য ও বইপত্র।
উল্লেখ্য, বস্তার বা দান্তেওয়াড়ার এই জঙ্গলগুলোতে মাওবাদীদের অস্ত্রভাণ্ডার বা ‘ডাম্প’ উদ্ধারের ঘটনা এটা প্রথম নয়। এর আগেও বহুবার নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে মাটির নিচ থেকে বিপুল পরিমাণ মরণাস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে। তবে এবারের ঘটনাটি বাকি সময়ের চেয়ে অনেকটাই আলাদা এবং তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে মূলত গোয়েন্দা সূত্রে বা তল্লাশি চালাতে গিয়ে আচমকা এই ধরনের ডাম্পের সন্ধান মিলত। কিন্তু এবার খোদ আত্মসমর্পণকারী মাওবাদীরাই স্বেচ্ছায় পুলিশকে ডেকে নিয়ে গিয়ে তাদের গোপন আস্তানা চিনিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, লাল সন্ত্রাসবাদীদের পায়ের তলা থেকে মাটি কেবল সরছেই না, বরং খোদ সংগঠনের অন্দরেই মাওবাদী মতাদর্শের মৃত্যু ঘটেছে। বারবার অস্ত্র উদ্ধার এবং প্রথম সারির ক্যাডারদের এই আত্মসমর্পণ বলাই বাহুল্য ছত্তীসগঢ়ে মাওবাদী সাম্রাজ্যের পতনের কাউন্টডাউন আরও ত্বরান্বিত করল।
