মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: রাতভর শ্রীকৃষ্ণের জন্মোৎসবের পর এবার আনন্দের পালা নন্দোৎসবের। শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে পালিত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ জন্মাষ্টমী। আর শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে নন্দোৎসব। বৈষ্ণব পঞ্জিকা অনুযায়ী, জন্মাষ্টমীর পরের দিনই নন্দোৎসব পালনের রীতি রয়েছে। ২০২৬ সালেও সেই নিয়মেই শনিবার নন্দোৎসব পালিত হচ্ছে।
কেন পালিত হয় নন্দোৎসব?
পুরাণকথা অনুযায়ী, মথুরায় দেবকী ও বাসুদেবের সন্তান হিসেবে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হলেও কংসের অত্যাচার থেকে তাঁকে রক্ষা করতে বাসুদেব তাঁকে গোকুলে নন্দ মহারাজের গৃহে রেখে আসেন। সেখানে যশোদা ও নন্দের স্নেহে বড় হতে থাকেন বালক কৃষ্ণ।
কৃষ্ণের জন্মের সংবাদ গোকুলে পৌঁছতেই আনন্দে মেতে ওঠেন নন্দ মহারাজ ও ব্রজবাসীরা। সন্তানের জন্ম উপলক্ষে নন্দ মহারাজ যে আনন্দোৎসব করেছিলেন, সেই স্মৃতিরই প্রতীক নন্দোৎসব। বৈষ্ণব ঐতিহ্যে এটি ‘নন্দ মহোৎসব’ নামেও পরিচিত।
শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধের পঞ্চম অধ্যায়েও কৃষ্ণের জন্মের পর নন্দ মহারাজের আয়োজিত উৎসব ও দানের উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত আছে, সেই সময় ব্রজবাসীদের মধ্যে বিপুল পরিমাণ দান করা হয়েছিল এবং গোটা গোকুল আনন্দে ভরে উঠেছিল।
নন্দোৎসবে কী কী করা হয়?
নন্দোৎসব মূলত আনন্দ, ভক্তি ও দানের উৎসব। এই দিনে বহু বাড়িতে বালক কৃষ্ণের বিশেষ পুজো করা হয়। কোথাও কীর্তন, কোথাও ভজন এবং কোথাও গীতাপাঠের আয়োজন থাকে।
অনেক পরিবারে জন্মাষ্টমীর পরের দিন থেকেই উপবাসের পর্ব সম্পূর্ণ হয় এবং কৃষ্ণকে নানা ধরনের ভোগ নিবেদন করে প্রসাদ গ্রহণ করা হয়। বিভিন্ন বৈষ্ণব পরম্পরায় নন্দোৎসবের রীতিতে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও কৃষ্ণের প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তিই এই উৎসবের মূল ভাবনা।
ব্রজ অঞ্চলের ঐতিহ্যে নন্দোৎসবের সঙ্গে দধি, দুধ, মাখন ও হলুদ দিয়ে আনন্দ প্রকাশের বিশেষ রীতিও জড়িত। নন্দোৎসবকে ঘিরে কোথাও কোথাও দই-হাঁড়ির উৎসবও অনুষ্ঠিত হয়।
নন্দোৎসবের দিনে কী ভোগ দেবেন?
নন্দোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ বিশেষ ভোগ। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, এই দিনে কৃষ্ণকে খিচুড়ি ভোগ দেওয়ার চল রয়েছে বহু বাড়িতে। তার সঙ্গে মিষ্টি বা অন্য কোনও পছন্দের নিরামিষ পদও নিবেদন করা হয়।
অনেক পরিবারে কাঁচকলার তৈরি তরকারি বা অন্য কোনও পদও রান্না করার রীতি রয়েছে। তবে অঞ্চল ও পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী ভোগের ধরন বদলাতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কোনও খাবার বাধ্যতামূলক—এমনটা নয়; ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গেই ভোগ নিবেদন করাই মূল কথা।
পুজো শেষে সেই ভোগ প্রসাদ হিসেবে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। জন্মাষ্টমীর উপবাস পালনকারীরাও নিজেদের পারিবারিক ও ধর্মীয় রীতি মেনে এদিন প্রসাদ গ্রহণ করেন।
নন্দোৎসবে দানের গুরুত্ব
নন্দোৎসবের সঙ্গে দানের একটি বিশেষ যোগ রয়েছে। ধর্মীয় কাহিনি অনুযায়ী, কৃষ্ণের জন্মের আনন্দে নন্দ মহারাজ ব্রজবাসীদের মধ্যে নানা সামগ্রী দান করেছিলেন। সেই স্মৃতিতে আজও এই দিনে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দান করার রীতি রয়েছে।
অসহায় মানুষকে খাবার দেওয়া, বস্ত্রদান কিংবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়া—যে কোনও সেবামূলক কাজকেই এই দিনে শুভ বলে মনে করেন ভক্তরা। কারণ নন্দোৎসবের মূল বার্তাই হল আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।
জন্মাষ্টমীর পর নন্দোৎসব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
জন্মাষ্টমীর রাতের মূল আবহ যেখানে কৃষ্ণের জন্মকে কেন্দ্র করে উপবাস, মধ্যরাতের পুজো ও ভক্তিতে পরিপূর্ণ, সেখানে নন্দোৎসব সেই জন্মের আনন্দকে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উৎসব। তাই অনেকের কাছে জন্মাষ্টমীর মতোই গুরুত্বপূর্ণ নন্দোৎসব।
অর্থাৎ, জন্মাষ্টমী যদি হয় কৃষ্ণের আবির্ভাবের পবিত্র মুহূর্ত, তবে নন্দোৎসব হল সেই আবির্ভাবকে ঘিরে আনন্দ, ভক্তি, প্রসাদ, কীর্তন ও দানের উৎসব। ২০২৬ সালে সেই আনন্দেই শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে নন্দোৎসব।
