Tag: ndia EU Free Trade Agreement

  • India–EU FTA: ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থেকে কার কী প্রাপ্তি হল? কে কী সুবিধা পাবে? বিশ্লেষণ

    India–EU FTA: ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থেকে কার কী প্রাপ্তি হল? কে কী সুবিধা পাবে? বিশ্লেষণ

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে এক ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement), সংক্ষেপে এফটিএ (FTA), যাকে উভয় পক্ষই আখ্যা দিয়েছে “মাদার অফ অল ডিলস” বা ‘সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তি’ হিসেবে।

    মঙ্গলবার ঘোষিত এই চুক্তিটি প্রায় দুই দশকের টালবাহানা করা আলোচনার পর বাস্তব রূপ পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক ভূ-অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই এই চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। ভারত ও ২৭ দেশের ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে এই চুক্তি কার্যকর হলে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাজার এক ছাতার নিচে আসবে। এর সম্মিলিত বাজারের পরিমাণ প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্বের জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ।

    ২০ বছর আগে যেখানে আলোচনা ভেঙে গিয়েছিল, সেখানে এখন ভারতের সক্ষমতা অনেক বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০১৩ সালে ভারত তার অটোমোবাইল খাত খুলতে অনিচ্ছুক হওয়ায় আলোচনা থমকে যায়। তবে নতুন চুক্তির আওতায় ভারত ইউরোপীয় গাড়ির জন্য নিজস্ব বাজার খুলে দিয়েছে। ইউরোপ থেকে আমদানি হওয়া অধিকাংশ গাড়ির ওপর শুল্ক ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে নামানো হবে এবং ধাপে ধাপে তা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।

    চুক্তিতে কী কী অন্তর্ভুক্ত?

    এটি ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও ব্যাপক বাণিজ্য চুক্তি যা পণ্য, পরিষেবা এবং বিনিয়োগ— তিন ক্ষেত্রকেই অন্তর্ভুক্ত করছে। ২০২৩ সালে ইইউ ভারতের জন্য জিএসপি (Generalised Scheme of Preferences) সুবিধা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, যার ফলে ভারতীয় রফতানিকারকদের ওপর বাড়তি শুল্কের বোঝা পড়েছিল। এখন নতুন চুক্তিতে ভারতের জন্য বস্ত্র, ওষুধ, যন্ত্রপাতি, ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম খাতে বড় সুবিধা এনে দেবে। ইইউ ভারতকে ১৪৪টি পরিষেবা উপখাতে প্রবেশাধিকার দেবে, আর ভারত ইইউকে ১০২টি উপখাতে সুযোগ দেবে, যার মধ্যে আর্থিক পরিষেবা, সামুদ্রিক পরিবহণ ও টেলিযোগাযোগ খাত উল্লেখযোগ্য।

    বর্তমানে ভারত-ইইউ বাণিজ্যের চিত্র

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো ভারত ও ইইউ—উভয়েরই সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। তবে গত এক দশকে ভারত-ইইউ পণ্য বাণিজ্য দ্রুত বেড়েছে। ২০২০ সালে যেখানে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৪ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৪-২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৬ বিলিয়ন ডলারে। ফলে ইইউ এখন ভারতের সবচেয়ে বড় পণ্য বাণিজ্য অংশীদার।

    বর্তমানে ভারতের ইইউ-র সঙ্গে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। ভারত ইইউতে রফতানি করে প্রায় ৭৫.৮৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যেখানে আমদানি করে ৬০.৬৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। ইইউ মূলত যন্ত্রপাতি, পরিবহণ সরঞ্জাম ও রাসায়নিক পণ্য রফতানি করে। আর ভারত রফতানি করে রাসায়নিক, ধাতু, খনিজ পণ্য ও বস্ত্র। দুই পক্ষই ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাণিজ্য ২০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে।

    ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিষেবা বাণিজ্যও বেড়েছে। ভারতীয় পরিষেবা রফতানি ২২.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৪ বিলিয়ন ডলার এবং ইইউ-র রফতানি বেড়েছে ১৭ বিলিয়ন থেকে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে। মূলত ব্যবসায়িক পরামর্শ ও আইটি পরিষেবায় এই লেনদেন বেশি। বর্তমানে ইইউ-র মোট বাণিজ্যের মধ্যে ভারতের অংশ ২.৪ শতাংশ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ১৭.৩ শতাংশ এবং চিনের ১৪.৬ শতাংশ। ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯.৩ লাখ ভারতীয় নাগরিক ইইউ দেশগুলোতে বসবাস করছেন। ইইউ জানিয়েছে, প্রায় ৬,০০০ ইউরোপীয় সংস্থা ভারতে কাজ করছে এবং প্রায় ১,৫০০ ভারতীয় সংস্থার উপস্থিতি রয়েছে ইউরোপে।

    ভারতের কী লাভ হবে?

    • ● ইইউ ভারতের ৯০ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেবে এবং সাত বছরের মধ্যে তা ৯৩ শতাংশে পৌঁছাবে।
    • ● তাৎক্ষণিকভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে সামুদ্রিক খাদ্য (চিংড়ি ও হিমায়িত মাছ), রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও রাবার, চামড়া ও জুতো, বস্ত্র ও পোশাক, ধাতু, রত্ন ও গয়না শিল্প।
    • ● প্রায় ৬ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে আংশিক শুল্কছাড় ও কোটা প্রযোজ্য হবে। এতে ইইউ-র গড় শুল্কহার ৩.৮ শতাংশ থেকে নেমে আসবে ০.১ শতাংশে।
    • ● মোটের ওপর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ৯৯.৫ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে শুল্কছাড়ের সুবিধা পাবে।
    • ● তবে, ভারত এখনও ইস্পাত রফতানির কোটা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। বর্তমানে ইইউ ভারতকে বছরে ১৬ লাখ টন ইস্পাত শুল্কমুক্ত রফতানির অনুমতি দেবে, যা ভারতের বর্তমান রফতানির প্রায় অর্ধেক।

    ইইউ কী সুবিধা পাবে?

    • ● ভারত তাৎক্ষণিকভাবে ইইউ থেকে আমদানি হওয়া ৩০ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক তুলে নেবে। মোটের ওপর ইইউ-র ৯৬.৬ শতাংশ পণ্যের শুল্ক কমানো বা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে। এতে ইউরোপীয় সংস্থাগুলির বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ইউরো সাশ্রয় হবে।
    • ● গাড়ি ছাড়াও যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও ওষুধের ওপর ভারতের বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক প্রায় পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে। বিমান ও মহাকাশ প্রযুক্তির পণ্যের ওপর শুল্ক প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হবে।
    • ● ইইউ থেকে আমদানি হওয়া ওয়াইন ও মদের ওপর বর্তমান ১৫০ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ২০–৩০ শতাংশ (ওয়াইন), ৪০ শতাংশ (স্পিরিটস) এবং ৫০ শতাংশ (বিয়ার) করা হবে।
    • ● এছাড়া আর্থিক ও সামুদ্রিক পরিষেবায় ইউরোপীয় সংস্থাগুলিকে আরও বেশি প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে। শুল্ক প্রক্রিয়া সহজ করা হবে এবং মেধাস্বত্ব (Intellectual Property) সুরক্ষা আরও জোরদার করা হবে।
    • ● বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি শুধু বাণিজ্য নয়, ভারত ও ইউরোপের কৌশলগত অংশীদারিত্বকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
LinkedIn
Share