মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভয়াবহ হড়পা বানে বিপর্যস্ত নেপাল ও তিব্বত। হিমবাহ ধসের পর বরফ-পাথরের বিশাল ধস এবং জলস্রোতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় এখনও পর্যন্ত ৪৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুই দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনও ১,৪৬৮ জন নিখোঁজ বলে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে ভোতে কোশি নদীর উৎসের কাছে তৈরি হওয়া একটি নতুন ‘ব্যারিয়ার লেক’। সেটি ভেঙে গেলে ফের ভয়াবহ বন্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নেপাল পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, হেলিকপ্টারে ৫০ জন বিদেশি-সহ ৭৯৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। স্থলপথে আরও ৭৯৬ জনকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নেপালে ৯১০ জন এবং তিব্বতে ৫৫৮ জনের এখনও কোনও সন্ধান মেলেনি।
২৯০ ভারতীয় এখনও নিখোঁজ
বন্যার জেরে নেপালে ২৯০ জন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। তাঁদের মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী এবং বিভিন্ন রাজ্য থেকে যাওয়া পর্যটকরাও রয়েছেন। ভারত ইতিমধ্যেই ৮৪ জন নাগরিককে উদ্ধার করেছে। তাঁদের মধ্যে ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৬৩ জন কর্মী এবং তামিলনাড়ুর ২১ জন রয়েছেন। পাশাপাশি তিব্বতের দিকে আটকে থাকা প্রায় ২০০ ভারতীয়ও ভারতের কাছে সাহায্য চেয়েছেন। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, নেপাল সরকার, বিভিন্ন মন্ত্রক, রাজ্য সরকার, পর্যটন সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নিখোঁজ ভারতীয়দের সন্ধানে জরুরি পদক্ষেপ করা হচ্ছে। ভারতীয় নাগরিকদের সহায়তার জন্য ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুমও চালু করা হয়েছে।
উদ্ধার ১১ ভারতীয় পর্যটক
নেপালের রসুয়া জেলা থেকে ২৭ জন বিদেশি পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ১১ জন ভারতীয়। এছাড়া চার জন দক্ষিণ কোরীয়, দুই জন ইতালীয় এবং দুই জন মার্কিন নাগরিক ছিলেন। নেপাল আর্মির হেলিকপ্টারে তাঁদের কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বন্যার কারণে দিল্লি-কাঠমান্ডু বাস পরিষেবাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
নতুন ব্যারিয়ার লেক নিয়ে বড় আশঙ্কা
উদ্ধারকাজ চলার মধ্যেই নতুন বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভোতে কোশি নদী ব্যবস্থার উৎসের কাছে তৈরি হয়েছে একটি প্রাকৃতিক ব্যারিয়ার লেক। চিনা কর্তৃপক্ষের অনুমান, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত সেখানে প্রায় ২০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমেছিল। আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লক্ষ ঘনমিটার জল সেখানে জমতে পারে। প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে ফের প্রবল জলস্রোত নেমে আসতে পারে। নেপালের জল ও আবহাওয়া দফতর ভোতে কোশি এবং ত্রিশুলি নদীর তীরবর্তী মানুষকে সতর্ক করে নদীর কাছ থেকে দূরে নিরাপদ জায়গায় থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
হিমবাহ ধসেই বিপর্যয়, ভূমিকম্প নয়
প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প বলে মনে করা হলেও নেপালি কর্তৃপক্ষ এবং মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থার সংশোধিত বিশ্লেষণে জানা গিয়েছে, ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধস এবং বরফ-পাথরের ধসই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। হিমবাহ ধসের পর লহেন্দে নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে বিপুল জল, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ভোতে কোশি এবং ত্রিশুলি নদী ব্যবস্থার দিকে নেমে আসে।
ধ্বংসস্তূপে চাপা রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প
বন্যায় নেপালের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেত্রাবতী থেকে রাসুওয়াগাধি পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার রাস্তার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু কংক্রিট ও ঝুলন্ত সেতু ভেসে গিয়েছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৩৫টি মোটরযোগ্য সেতু, ৪৫টি ঝুলন্ত সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রিশুলি ও দেবীঘাট-সহ একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এদিকে হাসপাতাল, উদ্ধারকেন্দ্র এবং নদীর তীরে নিখোঁজ পরিজনদের খুঁজছেন অসংখ্য পরিবার। বহু এলাকায় এখনও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপাল আর্মি, পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং হেলিকপ্টার ও ড্রোনের সাহায্যে উদ্ধার অভিযান চলছে। ধ্বংসের পূর্ণ চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়। তবে শত শত পরিবার এখনও প্রিয়জনের খবরের অপেক্ষায়, আর নতুন ব্যারিয়ার লেকের আশঙ্কায় বিপর্যয় আরও ভয়াবহ আকার নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
