মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দেশজুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রসংঘের একটি রিপোর্টে (UN report)। যেখানে দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ (Jaish-e-Mohammed) এখনও সক্রিয় এবং ভারতের মাটিতে একাধিক হামলার সঙ্গে তাদের সঙ্গে যোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গত বছর দিল্লির লালকেল্লার কাছে হওয়া ভয়াবহ বিস্ফোরণ (Delhi Red Fort Blast)। পাকিস্তান বারবার দাবি করেছে জইশ-ই-মহম্মদ এখন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। কিন্তু ভারতের দাবি ছিল জইশের জঙ্গি কার্যকলাপ চালু রয়েছে পুরোদমে। রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্ট সেই দাবিকেই সত্যি প্রমাণ করল।
রাষ্ট্রসংঘের নয়া রিপোর্ট
রাষ্ট্রসংঘের অ্যানালিটিকাল সাপোর্ট ও স্যাংশন মনিটরিং টিমের (UN Analytical Support and Sanctions Monitoring Team) ৩৭তম রিপোর্টে জানানো হয়েছে, একটি সদস্য দেশ (নাম প্রকাশ করা হয়নি) তাদের কাছে তথ্য দিয়েছে যে জইশ একাধিক হামলার দায় স্বীকার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে গত ১০ নভেম্বরের লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণের ঘটনাও রয়েছে। এই ঘটনায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, সংগঠনটি এখনও জঙ্গি কার্যকলাপ চালাচ্ছে। রিপোর্টে কাশ্মীর উপত্যকায় চলতি বছরের বিভিন্ন ঘটনারও উল্লেখ আছে। জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে পহেলগাঁও হামলায় (Pahalgam terror attack) ২৬ জন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়, যার দায় স্বীকার করেছিল লস্কর-ই-তইবার ঘনিষ্ঠ সংগঠন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (TRF)। পরে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালিয়ে পাকিস্তানে জঙ্গি ঘাঁটির উপর পাল্টা আঘাত হানে।
পরিকল্পিত সন্ত্রাসী চক্রের অংশ
লালকেল্লার বিস্ফোরণ (Delhi Red Fort Blast) ঘটনাটি শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে এনআইএ। এর আগে জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ তদন্তে ‘হোয়াইট-কলার টেরর মডিউল’-এর (White Collar Terror Module) সন্ধান পায়, যার যোগ ছিল জইশ ও আনসার গজওয়াত-উল-হিন্দের সঙ্গে। আটক করা হয়েছে মোট ৯ জনকে, এদের মধ্যে তিনজন ডাক্তারও রয়েছেন, যারা নেটওয়ার্ককে সাহায্য করতেন বলে সন্দেহ। তদন্তে উদ্ধার হওয়া একটি ভিডিওতে বিস্ফোরণকারী উমর-উন-নবীকে আত্মঘাতী হামলার কথা বলতে দেখা যায়। এতে স্পষ্ট হয়, হামলাটি কোনও একক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি পরিকল্পিত সন্ত্রাসী চক্রের অংশ। দিল্লি বিস্ফোরণে যে জইশের যোগ থাকতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা আগেই উঠে এসেছিল। বিস্ফোরণের পর ধরপাকড়ের সময়ে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে তদন্তকারীদের হাতে ধরা পড়েছিলেন তুফাইল নিয়াজ ভাট নামে এক সন্দেহভাজন। তুফাইলের সঙ্গে জইশের যোগ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছিলেন তদন্তকারীরা। এবার রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্টেও উল্লেখ করা হল দিল্লি বিস্ফোরণে জইশ-যোগের প্রসঙ্গ। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্বীকৃত লালকেল্লা ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এই অভিযোগকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
জইশ-সম্পর্কে ভিন্ন মত
বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা নজরদারি এড়ানো, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং সমর্থনভিত্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে অন্যান্য উগ্রপন্থী সংগঠনের মতোই জেইএমও নতুন কৌশল নিচ্ছে। জেইএমকে রাষ্ট্রসংঘ আল-কায়েদা-সম্পর্কিত সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটির বিরুদ্ধে বিশেষত জম্মু ও কাশ্মীরে একাধিক হামলার অভিযোগ রয়েছে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা মাসুদ আজহার দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন; তাঁর বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দের নির্দেশ রয়েছে। তবে মনিটরিং টিম জানিয়েছে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংগঠনটির বর্তমান অবস্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিছু দেশ জেইএমকে সক্রিয় ও বিপজ্জনক বলে মনে করলেও, অন্য এক সদস্য রাষ্ট্রের দাবি, সংগঠনটি কার্যত নিষ্ক্রিয়। এই ভিন্নমত দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতাকে জটিল করে তুলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জইশ-এর মহিলা জঙ্গি সংগঠন
জইশের বিষয়ে রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, সম্প্রতি জইশ প্রধান মহম্মদ মাসুদ আজহার আনুষ্ঠানিক ভাবে একটি নতুন শাখা সংগঠনের কথা ঘোষণা করেছেন। শুধু মহিলাদের নিয়ে তৈরি এই জঙ্গিবাহিনীর কাজ বিভিন্ন নাশকতায় সাহায্য করা। মহিলাদের নিয়ে তৈরি ওই জঙ্গিবাহিনীর নাম দেওয়া হয়েছে জামাত উল-মুমিনাত। বস্তুত, জইশ হল পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠী। ভারতে বিভিন্ন জঙ্গি কার্যকলাপে অতীতে জইশের যোগের অভিযোগ উঠে এসেছে। ভারত এবং পাকিস্তান উভয়েই রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভার সদস্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘জামাত-উল-মোমিনাত’-এর গঠন ভবিষ্যতে ভারতীয় উপমহাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উপর বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা
জইশের মহিলা ব্রিগেড ‘জামাত-উল-মোমিনাত’ জম্মু ও কাশ্মীর, উত্তরপ্রদেশ এবং দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। জানা গিয়েছে, ‘জামাত-উল-মোমিনাত’ জম্মু ও কাশ্মীর, উত্তরপ্রদেশ এবং দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। অনলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভারতে তাদের কার্যকলাপ বৃদ্ধির চেষ্টা করছে তারা। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে নিজেদের ভাবনা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্রিগেড ধর্মের নামে মহিলাদের প্রলুব্ধ করে নিজেদের দলে যোগ দেওয়ানোর চেষ্টা করবে। পাশাপাশি, শিক্ষিত এবং শহুরে মুসলিম মহিলাদের টার্গেট করা হবে বলেও মনে করা হচ্ছে। সূত্রের খবর, ‘জামাত-উল-মোমিনাত’-এর নেতৃত্ব রয়েছে মাসুদ আজাহারের বোন সাদিয়া আজাহার। অপারেশন সিঁদুরে সাদিয়ার স্বামী ইউসুফের মৃত্যু হয়। ই ব্রিগেডে ইতিমধ্যেই নাম লেখানো শুরু করেছে সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের স্ত্রীরা। পাশাপাশি, ভাওয়ালপুর, করাচি, মুজফফরাবাদ-সহ দেশের বিভিন্ন এলাকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মহিলাদের দলে টানার চেষ্টা করছে জইশ।
