মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: লোকসভায় পাশ হল অভিবাসন এবং বিদেশি নাগরিক বিল, ২০২৫। নতুন এই বিল নিয়ে বৃহস্পতিবারই লোকসভায় প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে আলোচনা হয়। বিলের ওপর আলোচনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) জানান, ভারত কোনও ধর্মশালা নয়। জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে এমন কাউকে এই দেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। অমিত শাহের বক্তৃতায় উঠে আসে বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের চেষ্টার কথাও। এই প্রসঙ্গে তিনি তোপ দাগেন পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারকেও।
এদেশ ধর্মশালা নয়, বললেন শাহ (Amit Shah)
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে (Immigration and Foreigners Bill 2025) ভারতে আসা বিদেশিদের যাতায়াত, রেজিস্ট্রেশন ও ভিসা নিয়ন্ত্রণ করবে কেন্দ্র সরকার। এতে দু’পক্ষের কাজই সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই বিলের মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের মোট ছটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এগুলি হল- পর্যটক, পড়ুয়া, দক্ষ শ্রমিক, ব্যবসায়ী, উদ্বাস্ত ও অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। এদিন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই বিলটি পেশ করেন লোকসভায়। বিল নিয়ে আলোচনার সময়ে অমিত শাহ (Amit Shah) বলেন, ‘‘যদি কেউ এই দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য এখানে আসতে চান, তাঁদের সব সময় স্বাগত জানানো হবে। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ, তাঁদের এই দেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এই দেশ কোনও ধর্মশালা নয়।’’
অনুপ্রবেশ ইস্যুতে তোপ তৃণমূলকে
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, পর্যটক হিসেবে, ব্যবসার জন্য, শিক্ষা বা চিকিৎসার জন্য কেউ আসতে চাইলে তাঁদেরকে সব সময় এ দেশে স্বাগত জানানো হবে (Immigration and Foreigners Bill 2025)। একইসঙ্গে নয়া অভিবাসন বিলের মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তা আরও মজুবত হবে বলে জানান তিনি। এর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি এবং ব্যবসাতেও গতি আনবে এই বিল, এমনটাই মনে করছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এদিন নিজের বক্তব্যে দেশে অনুপ্রবেশ রুখতেও কড়া পদক্ষেপের বার্তা দিয়েছেন অমিত শাহ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর (Amit Shah) বক্তৃতায় উঠে আসে বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গও। তাঁর দাবি, অসমে কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সেই রাজ্য দিয়ে ব্যাপক অবৈধ অনুপ্রবেশ হয়েছে। এই সময়ই তিনি তোপ দাগেন তৃণমূল সরকারকে। মমতা জমানায় পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে অনুপ্রবেশকারীরা এ দেশে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ শাহের। এই প্রসঙ্গে শাহের অভিযোগ, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের কাছে ভুয়ো নথিও পৌঁছে যাচ্ছে। কোথা থেকে এই আধার কার্ডগুলি দেওয়া হচ্ছে? এনিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘যে সমস্ত বাংলাদেশিরা ধরা পড়েছেন, তাঁদের সকলের কাছে পশ্চিমবঙ্গের ঠিকানার আধার কার্ড পাওয়া গিয়েছে।’’ অমিত শাহের আরও দাবি, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ সরকারের থেকে জমি না-পাওয়ার কারণে সীমান্তে ৪৫০ কিলোমিটার কাঁটাতার দেওয়ার কাজ আটকে রয়েছে।’’
তৃণমূলের গুণ্ডামির কারণেই ৪৫০ কিমি কাঁটাতার আটকে
এরপরেই তিনি বলেন, ‘‘২০২৬ সালের সেখানে (বাংলায়) বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং পশ্চিমবঙ্গে এই অনুপ্রবেশ সমস্যার সমাধান হবে।’’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন ‘‘যখনই সীমানা দেওয়ার কাজ চলছে তখনই সেখানে শাসকদলের কর্মীরা গুণ্ডামি করছে এবং ধর্মীয় স্লোগান দিচ্ছে। ৪৫০ কিলোমিটারের বেশি সীমানা বাঁধার কাজ সম্পন্ন হয়নি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কারণে। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের বর্ডার রয়েছে ২,২১৬ কিলোমিটার। যার মধ্যে ১৬৫৩ কিলোমিটার সীমানা দেওয়া হয়েছে। সীমানার আশেপাশের রাস্তা চেকপোস্ট বানানো হয়েছে। শুধুমাত্র জমি দিচ্ছে না বলে পশ্চিমবঙ্গের ৪৫০ কিলোমিটার সীমানা বাঁধার কাজ বাকি থেকে গিয়েছে।’’
প্রস্তাবিত বিল খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করবে
নিজের বক্তব্যে অমিত শাহ বলেন, ‘‘প্রস্তাবিত বিলটি খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে এদেশে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতেও সহায়তা করবে।’’ তাঁর আরও দাবি, বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার পরে ভারতে অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলায় এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সময়ে বিদেশিদের চলাচলের উপর নজরদারি সহজতর হবে। বিলের ওপর আলোচনার সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, ‘‘এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূল বিষয় হল অভিবাসন কোনও বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বরং এটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে জড়িত। বিলটি ভারতে আসা প্রত্যেকের উপর নিবিড় নজরদারি নিশ্চিত করবে। কেন কেউ ভারতে আসছেন এবং কতক্ষণ থাকছেন তাও বোঝা যাবে। ভারতে আসা প্রতিটি বিদেশি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।’’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরআরও দাবি, ‘‘নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে, এই আইন মাদক কারবার, অনুপ্রবেশকারী, অস্ত্র চোরাচালানকারী এবং যারা ভারতের অর্থনীতিকে ভেতর থেকে ধ্বংস করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে কুঠারাঘাত।’’
আগের চার আইন কী কী ছিল?
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, প্রস্তাবিত আইনটির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার, বিদেশিদের ঘন ঘন আসা-যাওয়ার স্থানগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিদেশি এবং অভিবাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলি বর্তমানে চারটি আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয় – পাসপোর্ট (ভারতে প্রবেশ) আইন, ১৯২০, বিদেশিদের নিবন্ধন আইন, ১৯৩৯, বিদেশী আইন, ১৯৪৬ এবং অভিবাসন (বাহকদের দায়বদ্ধতা) আইন, ২০০০। তবে এই সমস্ত আইনগুলি বর্তমানে বাতিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। নয়া বিলে আগের চার আইনের বেশ কিছু বিধান রয়েছে বলেই জানিয়েছে। নয়া এই বিলে জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এবং অভিবাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলির মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং পর্যটনকে উৎসাহিত করার কথাও বলা হয়েছে।