মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং গভীর সমুদ্রে সাবমেরিন উদ্ধার অভিযানে নতুন মাত্রা যোগ করল ভারতীয় নৌবাহিনী। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ডাইভিং সাপোর্ট ভেসেল (ডিএসভি) আইএনএস নিপুণ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় নৌবাহিনীতে কমিশনড হয়েছে। মুম্বইয়ের নেভাল ডকইয়ার্ডে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে জাহাজটিকে নৌবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ডুবুরি অভিযানেই নয়, গভীর সমুদ্রে বিপদে পড়া সাবমেরিনের দ্রুত উদ্ধার, জটিল আন্ডারওয়াটার অপারেশন এবং দুর্যোগ মোকাবিলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে আইএনএস নিপুণ। দেশের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের আওতায় প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয় জাহাজ নির্মাণের সক্ষমতারও বড় উদাহরণ এই যুদ্ধজাহাজ।
কী এই আইএনএস নিপুণ?
আইএনএস নিপুণ হল ভারতীয় নৌবাহিনীর নিস্তার শ্রেণির ডাইভিং সাপোর্ট ভেসেল। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থা হিন্দুস্তান শিপইয়ার্ড লিমিটেড (এইচএসএল), বিশাখাপত্তনমে জাহাজটি নির্মাণ করেছে। ‘নিপুণ’ একটি সংস্কৃত শব্দ। যার অর্থ হল কোনও কঠিন কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে সক্ষম। জাহাজটির অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও অভিযানের ক্ষমতার সঙ্গে নামটিরও রয়েছে যথেষ্ট সামঞ্জস্য। জাহাজটি ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই ভারতীয় নৌবাহিনীতে কমিশনড হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা এবং নৌবাহিনীতে পূর্ণাঙ্গ অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।
৩০০ মিটার গভীরেও চলবে ডাইভিং অপারেশন
আইএনএস নিপুণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে এর গভীর সমুদ্রে ডাইভিং এবং আন্ডারওয়াটার ইন্টারভেনশন ক্ষমতা। জাহাজটি সমুদ্রের প্রায় ৩০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত ডাইভিং অপারেশনকে সহায়তা করতে পারে। অর্থাৎ, সাধারণ উদ্ধারকারী জাহাজের তুলনায় অনেক বেশি গভীরতায় গিয়ে জটিল ডুবুরি অভিযান পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দীর্ঘ সময় ধরে সহায়তা করার ক্ষমতা রয়েছে নিপুণের। জাহাজে রয়েছে আধুনিক ডাইভিং সিস্টেম, পানির তলায় হস্তক্ষেপ বা মেরামতির জন্য বিশেষ সরঞ্জাম এবং ডুবুরিদের চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা। ফলে সমুদ্রের তলায় কোনও গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটির পরিদর্শন বা প্রয়োজনীয় কাজেও জাহাজটি ব্যবহার করা যাবে।
সাবমেরিন বিপর্যয়ে ‘নিপুণ’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের কাছে সাবমেরিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। কিন্তু গভীর সমুদ্রে কোনও সাবমেরিন দুর্ঘটনার মুখে পড়লে দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন। এই জায়গাতেই আইএনএস নিপুণের গুরুত্ব অনেক বেশি। জাহাজটি সাবমেরিন রেসকিউ অপারেশনে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার জন্য তৈরি। প্রয়োজন অনুযায়ী গভীর সমুদ্রে গিয়ে উদ্ধারকারী দল, ডুবুরি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামকে অপারেশন এলাকায় নিয়ে যেতে পারবে এটি। একই সঙ্গে জাহাজটির উন্নত স্টেশন কিপিং ক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ সমুদ্রের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নির্দিষ্ট জায়গায় নিজের অবস্থান ধরে রেখে আন্ডারওয়াটার অপারেশনে সহায়তা করতে পারবে। এর ফলে কোনও সাবমেরিন দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে উদ্ধারকারী দলের কাজ আরও দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
শুধু সামরিক অভিযান নয়, দুর্যোগেও কাজে আসবে
আইএনএস নিপুণের ব্যবহার কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সমুদ্র দুর্ঘটনা কিংবা মানবিক বিপর্যয়ের সময়ও জাহাজটিকে কাজে লাগানো যাবে। প্রয়োজনে এটি ডিজাস্টার রিলিফ এবং হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড ডিজাস্টার রিলিফ (এইচএডিআর) অভিযানে অংশ নিতে পারবে।
অত্যাধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা, প্ল্যাটফর্ম ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং নির্দিষ্ট অবস্থানে জাহাজকে ধরে রাখার প্রযুক্তি থাকায় প্রতিকূল সমুদ্র পরিস্থিতিতেও বিভিন্ন ধরনের জটিল উদ্ধার অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, ডাইভিং, আন্ডারওয়াটার ইন্টারভেনশন এবং মেডিক্যাল সাপোর্ট—এই সমস্ত ক্ষমতা একত্রিত করে আইএনএস নিপুণকে একটি ইন্টিগ্রেটেড আন্ডারওয়াটার অপারেশন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
৭৫ শতাংশ দেশীয় প্রযুক্তি
আইএনএস নিপুণের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর দেশীয় নির্মাণ। জাহাজটির প্রায় ৭৫ শতাংশ উপাদান সম্পূর্ণ দেশীয়। ভারতীয় শিল্প সংস্থা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলির (এমএসএমই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এর নির্মাণে। এর ফলে গভীর সমুদ্রের গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধার এবং আন্ডারওয়াটার মিশনের ক্ষেত্রে বিদেশি প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের উপর নির্ভরতা কমানোর পথ আরও প্রশস্ত হয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য পূরণে এই ধরনের দেশীয়ভাবে নির্মিত প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। কারণ যুদ্ধ পরিস্থিতি বা আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনও বাধা তৈরি হলেও দেশীয়ভাবে তৈরি জাহাজ ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়।
পূর্ব ও পশ্চিম—দুই উপকূলেই বাড়ল উদ্ধার ক্ষমতা
আইএনএস নিপুণকে বোঝার ক্ষেত্রে ভারতের প্রায় ৭,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শ্রেণির প্রথম জাহাজ আইএনএস নিস্তার ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীতে কমিশনড হয়। সেটি ভারতের পূর্ব উপকূলে বিশাখাপত্তনমে মোতায়েন রয়েছে। এবার পশ্চিম উপকূলে মুম্বইয়ে আইএনএস নিপুণের মোতায়েনের ফলে ভারতের দুই প্রান্তেই ডাইভিং সাপোর্ট এবং সাবমেরিন উদ্ধার সক্ষমতা তৈরি হল। এর কৌশলগত গুরুত্ব যথেষ্ট। পূর্ব উপকূলের পাশাপাশি আরব সাগর ও পশ্চিম উপকূলেও দ্রুত কোনও গভীর সমুদ্র উদ্ধার অভিযানে সাড়া দেওয়া সম্ভব হবে। ফলে ভারতের বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক এলাকায় দুই দিক থেকে দ্রুত রেসপন্স দেওয়ার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হল।
কেন গুরুত্বপূর্ণ আইএনএস নিপুণ?
আইএনএস নিপুণকে শুধু আর একটি নৌবাহিনীর জাহাজ হিসেবে দেখলে এর কৌশলগত গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর মাধ্যমে ভারত একই সঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা বাড়াল—গভীর সমুদ্রে ডাইভিং, সাবমেরিন উদ্ধার এবং আন্ডারওয়াটার ইন্টারভেনশন। বিশেষ করে মুম্বইয়ে মোতায়েনের ফলে পশ্চিম উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি ও আরব সাগর এলাকায় এই সক্ষমতা আরও সহজলভ্য হবে। পূর্বে আইএনএস নিস্তার এবং পশ্চিমে আইএনএস নিপুণ—দুই জাহাজকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় নৌবাহিনী সাবমেরিন উদ্ধার ও গভীর সমুদ্র অভিযানে একটি বিস্তৃত সাপোর্ট নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারবে। সব মিলিয়ে, আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন, গভীর সমুদ্র অভিযান এবং সাবমেরিন নিরাপত্তা—এই তিন ক্ষেত্রেই আইএনএস নিপুণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
