Tag: Noakhali Genocide

Noakhali Genocide

  • Shyama Prasad Mukherjee: আজ, ৬ জুলাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন, জানুন তাঁর জীবনকথা

    Shyama Prasad Mukherjee: আজ, ৬ জুলাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন, জানুন তাঁর জীবনকথা

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বিজেপির পূর্বতন ভারতীয় জনসঙ্ঘ গঠন, পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্তানে যেতে না দেওয়া, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বিলোপের দাবিতে আন্দোলন-এই সব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বাঙালি নাম। তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। আজ শনিবার তাঁর জন্মদিন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের (Shyama Prasad Mukherjee) জন্ম ১৯০১ সালের ৬ জুলাই। ‘বাংলার বাঘ’ বলে খ্যাত আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও যোগমায়াদেবীর পুত্র একাধারে ছিলেন শিক্ষাবিদ, অন্যদিকে একজন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা। তাঁর জন্মস্থান কলকাতার ৭৭ রুসা রোডে (বর্তমানে আশুতোষ মুখার্জি রোড)। জন্মদিনে আমরা জানব শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনী।

    শিক্ষাজীবন ও বিবাহ

    ১৯০৬ সালের ২৩ জুলাই কলকাতার ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। 

    ১৯১৭ সালে মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় মেধা বৃত্তি (১০ টাকা প্রতি মাসে) সহ উত্তীর্ণ হন। 

    ১৯১৯ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আর্টসে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

    ১৯২১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন, ইংরেজি অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। 

    ১৯২২ সালের ১৬ এপ্রিল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (Shyama Prasad Mukherjee) বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ডাঃ বেণীমাধব চক্রবর্তীর কন্যা সুধাদেবীর সঙ্গে। 

    ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।

    মাত্র ২৩ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো (Shyama Prasad Mukherjee)

    ১৯২৪ সালের ২৫ মে বিহারের পাটনায় স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই ঘটনা গভীর রেখাপাত করে যুবক শ্যামাপ্রসাদের মনে। তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, পিতার মৃত্যুতে তাঁর জীবন থেকে সমস্ত আনন্দ উধাও হয়ে যায়। এরপরেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মাত্র ২৩ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯২৬ সালে আইন পড়তে তিনি ইংল্যান্ড যান। ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সম্মেলনে ওই বছরেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। কলকাতায় ফিরে আইনজীবী হিসেবে হাইকোর্টে যোগদান করেন। তবে হাইকোর্টের কর্মজীবনকে তিনি খুব বেশি গুরুত্ব দেননি। ১৯২৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে বিধানসভায় প্রবেশ করেন। ১৯৩৩ সালে তাঁর জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে, প্রয়াত হন স্ত্রী সুধাদেবী।

    কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ 

    ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এই সময়ে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। নতুন কোর্স হিসেবে এগ্রিকালচারের ওপর ডিপ্লোমা তিনিই চালু করেন। চিনা ও তিব্বতীয় ভাষাশিক্ষার ওপরে কোর্স চালু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর আমলে নতুনভাবে তৈরি হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরি হল। তিনি (Shyama Prasad Mukherjee) উপাচার্য থাকাকালীন প্রতি বছর ২৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন করতেন। ১৯৩৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি প্রথমবারের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমন্ত্রণ জানান বক্তব্য রাখতে।

    হিন্দু মহাসভায় যোগদান 

    ১৯৩৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তিনি নির্বাচিত হন। ওই বছরেই হিন্দু মহাসভায় যোগদান করেন তিনি। ১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি-লিট উপাধি প্রদান করে। ১৯৩৯ সালে বিনায়ক দামোদর সাভারকারের সভাপতিত্বে কলকাতায় বসে হিন্দু মহাসভার অধিবেশন। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ১৯৪০ সালে তিনি হিন্দু মহাসভার কার্যকরী সভাপতি নির্বাচিত হন।

    শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা 

    ১৯৪১ সালে সাম্প্রদায়িক মুসলিম লিগকে বাংলার ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার জন্য হিন্দু মহাসভার সঙ্গে জোট হয় ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির। এই জোট জনপ্রিয় ছিল শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা নামে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ওই মন্ত্রিসভায় অর্থ মন্ত্রকের দায়িত্ব নেন। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৪২ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন।

    দাঙ্গা বিধ্বস্ত বাংলায় উদ্বাস্তুদের পাশে 

    ১৯৪৪ সালে মধ্যপ্রদেশের বিলাসপুরে বসে হিন্দু মহাসভার সর্বভারতীয় অধিবেশন। ওই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সে বছর থেকেই চালু করেন ‘ন্যাশনালিস্ট’ পত্রিকা। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ এবং নোয়াখালি দাঙ্গা করে মুসলিম লিগ। সে সময় আক্রান্ত হিন্দুদের পাশে থাকা, উদ্বাস্তুদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, সবটাই তিনি নিজে হাতে করেছিলেন। সে সময় তিনি তৈরি করেছিলেন হিন্দুস্থান ন্যাশনাল গার্ড।

    পশ্চিমবঙ্গ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা

    ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় এক ভোটাভুটির মাধ্যমে অবিভক্ত বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় পশ্চিমবঙ্গ। বাঙালি হিন্দু পায় তার নিজস্ব বাসভূমি। মুসলিম লিগের হাত থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভারত-ভুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (Shyama Prasad Mukherjee)। তারপর থেকে এই দিনটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ‘প্রতিষ্ঠা দিবস’। হিন্দু সংখ্যাগুরু পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রতিনিধিদের ৫৮-২১ ভোটে বাংলা ভাগ করার পক্ষে রায় যায়। পৃথক হয় পশ্চিমবঙ্গ। সরকার ২০ জুনকে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে ঘোষণাও করে।

    স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্পমন্ত্রী

    ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট নেহরুর মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় শিল্পমন্ত্রী রূপে শপথ গ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীনের পর হিন্দু মহাসভাকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজে আত্মনিয়োগের পরামর্শ দেন তিনি। ভারতের শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন শিল্প উন্নয়ন নিগম, প্রথম শিল্পনীতি প্রণয়ন, চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ স্থাপন, সিন্ধ্রি সার কারখানা-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তিনি। খড়্গপুরে ভারতের প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি স্থাপনা, কলকাতার প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্থাপনার ভাবনা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত। ১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার বেড়ে চলে। হত্যা, লুন্ঠন, নারীর সম্ভ্রমহানি নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৫০ সালের ১৪ এপ্রিল নেহরু মন্ত্রিসভার মন্ত্রী হয়েও এর প্রতিবাদে লোকসভায় গর্জে ওঠেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং পদত্যাগ করেন।

    ভারতীয় জনসঙ্ঘ (BJS) গঠন

    দেশভাগের পরবর্তীকালে হিন্দু শরণার্থীদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের বন্দোবস্ত তিনিই করেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। একমাত্র জাতীয়তাবাদী সাংসদ হিসেবে তিনিই আইনসভায় হিন্দু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব হতেন। এমন সময় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল স্থাপনের উদ্দেশ্যে গুরুজি গোলওয়ালকারের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। রাজনীতি ক্ষেত্রে গুরুজি কয়েকজন স্বয়ংসেবককে পাঠান, তাঁরা হলেন, দীনদয়াল উপাধ্যায়, অটলবিহারী বাজপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদবানি, জগদীশ মাথুর, সুন্দর সিং ভাণ্ডারি প্রমুখ। ১৯৫১ সালের ২১ অক্টোবর দিল্লির রাঘোমাল গার্লস স্কুলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় জনসঙ্ঘ (BJS)। তিনিই ছিলেন প্রথম সভাপতি। প্রতীক ছিল প্রদীপ। দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জনসঙ্ঘ তিনটি আসন পায়। যার মধ্যে দক্ষিণ কলকাতা থেকে জেতেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিজে।

    জেলবন্দি অবস্থায় রহস্যজনক মৃত্যু  

    দেশের প্রধান বিরোধী কণ্ঠস্বর তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার বিলোপের জন্য তিনি আন্দোলন শুরু করেন। দাবি ছিল ‘এক প্রধান-এক নিশান-এক বিধান’। কারণ কাশ্মীরের জন্য ছিল তখন আলাদা পতাকা। কাশ্মীরে চালু ছিল না ভারতের সংবিধানও। বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল ৩৭০ ধারার মাধ্যমে। এই ধারা কার্যত কাশ্মীরকে পৃথক করে রেখেছিল ভারত থেকে। কাশ্মীরে প্রবেশ করতে ভারতীয়দের লাগত অনুমতিও। এর প্রতিবাদ করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। বিনা পারমিটে কাশ্মীরে প্রবেশ করতে গেলে ফারুক আবদুল্লার সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে ১৯৫৩ সালের ১১ মে। জেলবন্দি অবস্থায় তাঁর (Shyama Prasad Mukherjee) রহস্যজনক মৃত্যু হয় ১৯৫৩ সালের ২৩ জুন।

     

    দেশের খবর, দশের খবর, সব খবর, সবার আগে পেতে ফলো করুন আমাদের  Whatsapp, FacebookTwitter, Telegram এবং Google News পেজ।

  • Shyama Prasad Mukherjee: শ্যামাপ্রসাদ না থাকলে পশ্চিমবঙ্গ যেত পাকিস্তানে, জানুন সেই ইতিহাস

    Shyama Prasad Mukherjee: শ্যামাপ্রসাদ না থাকলে পশ্চিমবঙ্গ যেত পাকিস্তানে, জানুন সেই ইতিহাস

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ১৯০১ সালের ৬ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (Shyama Prasad Mukherjee)। তাঁকে ‘ভারত কেশরী’ বলেও সম্বোধন করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, তিনিই ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের জনক। মুসলিম লিগের পাতা ফাঁদ থেকে তিনি উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছিলেন বাঙালি হিন্দুদের। মূলত তাঁর প্রচেষ্টাতেই অখণ্ড বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমাংশ থেকে যায় ভারতে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অখণ্ড বাংলাকে নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে সুরাবর্দীর প্রস্তাবও ব্যর্থ করেন তিনি। আজ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিনে আমরা জানব কীভাবে তিনি পশ্চিমবঙ্গকে (West Bengal) ভারতে রাখতে সমর্থ হলেন!

    পাকিস্তানের দাবিতে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ ও নোয়াখালি গণহত্যা

    ১৯৪৬ সালের ১৬ অগাস্ট দিনটি ছিল শুক্রবার। বাঙালি হিন্দুর জীবনে সেদিন নেমে আসে এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসে’র নামে, পাকিস্তানের দাবিতে মুসলিম লিগ শুরু করল হিন্দু নিধনযজ্ঞ। অবিভক্ত বাংলায় তখন ছিল সুরাবর্দীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লিগের সরকার। মুসলিম লিগের গুন্ডারা হিন্দুদের ওপর ভয়াবহ সম্প্রদায়িক হামলা শুরু করে। পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়। কয়েক হাজার হিন্দুকে হত্যা করা হয়। হাজার হাজার হিন্দু নারী ধর্ষিতা হন। লুট করা হয় সম্পত্তি। ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর পরেই নোয়াখালিতে মুসলিম লিগ শুরু করে ফের এক হিন্দু নিধনযজ্ঞ। উদ্দেশ্য একটাই, পাকিস্তান। বর্তমান বাংলাদেশের নোয়াখালি, লক্ষ্মীপুর, ফেনী জেলা নিয়ে মেঘনার বাম তীরে অবস্থিত ছিল ব্রিটিশ আমলের নোয়াখালি জেলা। এই জেলাতে তৎকালীন সময়ে হিন্দুদের জনসংখ্যা ছিল ১৮ শতাংশ। ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর ছিল কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো। স্থানীয় হিন্দু বাড়িগুলিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে লিগের গুন্ডারা। গণহত্যা, লুট, গৃহে অগ্নিসংযোগ, অপহরণ ,নারী ধর্ষণ-এই সমস্ত কিছুই চলতে থাকে মুসলিম লিগের নেতা মওলানা গোলাম সারোয়ারের নেতৃত্বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক নোয়াখালিতেই হত্যা করা হয়েছিল ১০ হাজার হিন্দু বাঙালিকে। এর থেকেও বেশি সংখ্যক মানুষকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়। অগণিত মহিলাকে ধর্ষিতা হতে হয়।

    হিন্দু বাঙালির অস্তিত্ব বিপন্ন করতে মুসলিম লিগের ফাঁদ 

    অবিভক্ত বাংলায় তখন মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুসলিম লিগ নেতৃত্বের দাবি, কলকাতা সহ সমগ্র বাংলাকেই পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেই দাবিতেই ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ ও ‘নোয়াখালি গণহত্যা’। এদিকে সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তিকরণের বিরুদ্ধে হিন্দু বাঙালিদের মধ্যেও গড়ে উঠেছে প্রবল জনমত। মুসলিম লিগের নেতা তথা ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’- এর খলনায়ক সুরাবর্দী তখন এক ফাঁদ পাতলেন। দুই বাংলাকে নিয়ে অখণ্ড স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি করার প্রস্তাব রাখলেন তিনি। অর্থাৎ অখণ্ড বাংলা, না হবে ভারতের, না পাকিস্তানের। কিন্তু এরপরেও বাংলাতে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে যেত। আশ্চর্যজনকভাবে অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্রের দাবিতে সম্মতি দিলেন মহম্মদ আলি জিন্না। অর্থাৎ যেনতেন প্রকারেন তৎকালীন অখণ্ড বঙ্গের পশ্চিমাংশ যা বর্তমানের পশ্চিমবাংলা, যেখানে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেটিকে ভারত থেকে আলাদা করতেই হবে। সুরাবর্দীর এমন পাতা ফাঁদে পা দেন কংগ্রেসের দুই নেতা শরৎচন্দ্র বসু ও কিরণশঙ্কর রায়। এমন সময়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বুঝতে পারলেন যে হিন্দু বাঙালির অস্তিত্ব বিপন্ন করতে ফাঁদ পেতেছে মুসলিম লিগ। হয়তো পাকিস্তানে নিয়ে যেতে চাইছে অথবা স্বাধীন রাষ্ট্রের নামে একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে হিন্দুদের তারা সংখ্যালঘু করে রাখতে চাইছে।

    আন্দোলনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (Shyama Prasad Mukherjee) 

    সেই সময় থেকেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর সমস্ত শক্তিকে নিয়োজিত করলেন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গকে ভারতে রাখার জন্য। ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে তিনি একটি কমিটি গঠন করেন এবং সারা বাংলা জুড়ে সফর শুরু করেন। বড় বড় জনসভাগুলিতে বক্তব্য রাখেন। মানুষকে বাংলা ভাগের প্রয়োজনীয়তা তিনি বোঝাতে থাকেন। কংগ্রেসের নেতাদের কাছেও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (Shyama Prasad Mukherjee) আবেদন রাখেন যে তাঁরা যেন বাংলা ভাগের দাবিকে সমর্থন জানান। ১৯৪৭ সালের ১৫ মার্চ কলকাতায় হিন্দু মহাসভা একটি দু-দিনব্যাপী আলোচনাসভার আয়োজন করে। এতে হাজির ছিলেন ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার, ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ। এই সভায় সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে হিন্দু মহাসভা। অখণ্ড বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলিকে নিয়ে একটি আলাদা প্রদেশ গঠন করার কথা লেখা হয় প্রস্তাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ওই প্রস্তাব পেশও করে হিন্দু মহাসভা। ঠিক এমন আবহে তৎকালীন জনপ্রিয় দৈনিক ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ ১৯৪৭ সালের ২৩ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত একটি সমীক্ষা করে। বিষয় ছিল, বাংলা ভাগ করা উচিত কিনা। এই সমীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হয় ১৯৪৭ সালের ২৩ এপ্রিল। জানা যায়, এতে মোট ৫ লাখ ৩৪ হাজার ২৪৯ জন মানুষ নিজেদের মতামত রাখেন। ৯৮. ৩ শতাংশ মানুষই বাংলা ভাগের পক্ষে কথা বলেন। অন্যদিকে, বাংলা ভাগের বিপক্ষে কথা বলেন ০.৬ শতাংশ মানুষ। ১.১ শতাংশ মানুষের মতামত বাতিল হয়।

    মাউন্টব্যাটেন-শ্যামাপ্রসাদ বৈঠক

    এমন সময় ১৯৪৭ সালের ২৩ এপ্রিল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের (Shyama Prasad Mukherjee) সঙ্গে বড়লাট মাউন্টব্যাটেনের একটি বৈঠক হয়। সেখানে ভারত কেশরী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে বোঝান, ‘কেন বাংলা ভাগ করা প্রয়োজন’। আবার ১৯৪৭ সালের ২ মে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মাউন্টব্যাটেনকে বাংলা ভাগের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে একটি দীর্ঘ পত্র লেখেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের এমন আন্দোলন সে সময় খবরের শিরোনামেও আসে। তৎকালীন কলকাতার দৈনিক ‘দ্য স্টেটসম্যান’ ১৯৪৭ সালের ২৪ এপ্রিল একটি খবর প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে তারা জানায়, বাংলা ভাগ করার আন্দোলন একটি বিশাল ঝড়ে পরিণত হয়েছে। এই ঝড় আরম্ভ করেছিল হিন্দু মহাসভা। ঝড়ের কেন্দ্রভূমি হচ্ছে কলকাতা। ১৯৪৭ সালের মে মাসের প্রথম দিকে ভারত কেশরী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বাংলা ভাগের প্রয়োজনীয়তার কথা মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুকেও বলেন। তবে তাঁরা এ বিষয়টি খুব একটা আমল দেননি বলেই জানা যায়। ১৯৪৭ সালের ১৩ মে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সোদপুরে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। সেখানেও তাঁকে একই কথা বলেন।

    বল্লভভাই প্যাটেলের চিঠি

    তৎকালীন কংগ্রেস নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে চিঠি লেখেন এবং সেখানে তিনি বলেন, ‘‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই। বাংলার হিন্দুরা যতদিন নিজেদের স্বার্থ বুঝছে এবং নিজেদের অবস্থান থেকে না সরছে, ততদিন ভয়ের কোনও কারণও নেই। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার ডাক মুসলিম লিগের পাতা ফাঁদ ছাড়া কিছু নয়। বাংলাকে কখনই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।’’ এই সময়ে বাংলা ভাগের দাবিতে বারোটিরও বেশি জনসভা করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। পাঁচটি করেন কংগ্রেসের সঙ্গে যৌথভাবে। কংগ্রেস বাংলা ভাগের দাবিকে শেষ মুহূর্তে সমর্থন জানায়। তার কারণ ছিল একটাই যে তাদের হিন্দু ভোটাররা যেন না সরে যায়।

    শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াসে পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) গঠন

    দীর্ঘ আন্দোলন এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াসের পরে ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইন পরিষদের পশ্চিমাংশের সদস্যরা বাংলার দ্বিখণ্ডীকরণের প্রস্তাব বা পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) প্রস্তাব ৫৮-২১ ভোটে পাশ করান। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মুসলিম লিগের পাতা ফাঁদ থেকে বের করে আনেন হিন্দু বাঙালিকে। হিন্দু বাঙালি পায় তার নিজস্ব হোমল্যান্ড। ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ ও নোয়াখালির দাঙ্গার পরেও মুসলিম লিগ সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়। ব্যর্থ হয় স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র গঠনের নামে হিন্দু বাঙালিকে দাস করে রাখার পরিকল্পনা। মুসলিম লিগের যাবতীয় চক্রান্তকে প্রতিহত করতে সমর্থ হন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

     

    দেশের খবর, দশের খবর, সব খবর, সবার আগে পেতে ফলো করুন আমাদের  Whatsapp, FacebookTwitter, Telegram এবং Google News পেজ।

  • Shyama Prasad Mukherjee: জন্মদিনে ফিরে দেখা ভারত-কেশরী শ্যামাপ্রসাদ

    Shyama Prasad Mukherjee: জন্মদিনে ফিরে দেখা ভারত-কেশরী শ্যামাপ্রসাদ

    বেঁচে থাকলে বয়স হত ১২১ বছর। কিন্তু ১২১ লাইনও কেউ খরচ করলেন না শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্য। গত শতাব্দীর প্রথম বছরে জন্ম শ্যামাপ্রসাদের। অথচ তাঁর পিতা আশুতোষ মুখোপাধ্যাকে নিয়ে বাঙালির প্রজ্ঞার উৎসাহ দেখার মত। কিন্তু তাঁরই সন্তান, তার মতই শিক্ষাবিদ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে কমবয়সী উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদকে রেখে দেওয়া হয়েছিল সেই অন্ধকারেই। এর পিছনে বাংলার রাজনীতি যেমন দায়ী, তেমনই দায় ইতিহাস বিস্মৃত বাঙালি জাতির। যারা কোন দিন সচেতন ভাবে চর্চা করলেন না গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে দাপিয়ে বেড়ানো এই বাঙালি মনীষার ওপর।

    বহুদিন ভুলিয়ে রাখার পর যখন শ্যামাপ্রসাদ চর্চা শুরু হল, তখন থেকে নিত্য দিন নতুন ভাবে বাঙালি চিনতে শুরু করলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে। যিনি একাধারে শিক্ষক-উপাচার্য। একাধারে সচেতন রাজনীতিবিদ। যোগ্য বিধায়ক, সাংসদ।  এবং একজন দার্শনিক। যার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ফসল আজ সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। 

    শুধু শিক্ষাবিদ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়েই লিখে ফেলা যায় গোটা প্রবন্ধ। কিন্তু অল্প কথায় জেনে নেওয়া যাক, এই মেধাবী প্রজ্ঞার সম্পর্কে। ১৯৩৪ সাল, শ্যামাপ্রসাদের বয়স মাত্র তেত্রিশ বছর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। চার বছরের মেয়াদ। চৌত্রিশ থেকে আটত্রিশ সাল। এই চার বছরেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রায় ঢেলে সাজানোর কাজ করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। শিক্ষাবিদ শ্যামাপ্রসাদের হাত ধরেই, দীর্ঘদিনের প্রায় আশি বছরের ইংরাজির জগদ্দল সরিয়ে বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ আসে বাঙালি মেধায়। এছাড়া মহিলাদের জন্য বিশেষ পাঠক্রম ও হোম সায়েন্সের পঠনপাঠন চালু করা ও কৃষিবিদ্যা নিয়ে লেখাপড়ার শুরুও তাঁর হাতে। এমনকি রাজ্য যখন শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে উত্তাল, তখন আরও বেশি করে মনে করা উচিত শিক্ষাবিদ শ্যামাপ্রসাদকে। কারণ তাঁর হাত ধরেই শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাঠক্রম চালু হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিদেশি ভাষা শিক্ষায় তিনি জোর দেন চিনা আর তিব্বতি ভাষায়। হিন্দি, উর্দু, অহমিয়া ভাষা শিক্ষাতেও জোর দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৩৭ সালের সমাবর্তনে প্রথমবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় ভাষণ দেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং। 

    ১৯৩৯ সাল। ব্রিটিশ শাসকের সঙ্গে কংগ্রেসের একটা বড় অংশের আপোষের মনোভাব। কারণ দেশের বড়লোকেদের প্রতিনিধিত্ব করছিল কংগ্রেস। গান্ধীর অহসযোগ, অহিংস আন্দোলনের সঙ্গে সশস্ত্র আন্দোলনের বিরোধ তখন তুঙ্গে। দেশের স্বাধীনতার যোদ্ধারা পথ খুঁজছেন ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি লাভের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর বছর। যুগসন্ধিক্ষণের সময়। ভারতের রাজনীতিতে ঘটে গেল এক বিচিত্র ঘটনা। বাংলার দুই রাজনীতিবিদ কংগ্রেস ছাড়লেন। একজন সুভাষচন্দ্র বসু, আরেকজন অবশ্যই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কংগ্রেসের ব্রিটিশ আপোষকামী রাজনীতির বিরোধিতা করে দুজনে হাঁটলেন দুই পথে। সুভাষচন্দ্র যখন তৈরি করছেন ফরওয়ার্ড ব্লক, ঠিক তখনই শ্যামাপ্রসাদ যোগ দিচ্ছেন ‘হিন্দু মহাসভা’য়। ১৯৩৯ সাল। সাভারকরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে হিন্দু মহাসভায় যোগদান শ্যামাপ্রসাদের। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ঠিক তাঁর পরের বছর, ১৯৪০, কার্যনির্বাহী সভাপতি করা হয় তাঁকে।  ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সাল। হিন্দু মহাসভা সভাপতি হিসেবে কাজ করেছেন শ্যামাপ্রসাদ। 

    সময়টা লক্ষ্য করুন, ১৯৪২-এ ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হয়েছে। যার বিরোধিতা করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। কংগ্রেসের ভিতরেও তখন দোটানা, দোলাচল। ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস নাকি পূর্ণ স্বাধীনতা? কংগ্রেসের ভিতরে বাইরে বিতর্ক চরমে পৌছাচ্ছে। এর আগেই ১৯০৫ সালে বাংলায় দ্বিজাতি তত্ত্বের বীজ বপন করে গেছে ব্রিটিশরা। তাঁর বিষময় ফল ফলতে শুরু করেছে দেশে। ১৯২৯ সালে বাংলা প্রভিন্সের বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের টিকিটে প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। মাঝে কেটে গেছে ১৪ বছর। ততদিনে বুঝে গেছেন শ্যামাপ্রসাদ, বাংলার পরিণতি কি হতে চলেছে। কারণ ১৯২৯-৩০ সালের অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে উজ্জ্বল। স্পষ্ট কংগ্রেসের ভূমিকাও। কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা বাংলার আইনসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। দলের নীতি মেনে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন শ্যামাপ্রসাদও। কিন্তু নিজস্ব অভিজ্ঞতায় বুঝেছিলেন, আইনসভার ভিতরে থেকেই লড়াই চালাতে হবে। প্রয়োজনে কৌশলগত অবস্থান নিতে হবে। সেই কারণে ১৯৩০ সালেই নির্দল হিসেবে জিতে আসেন নিজের বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষেত্র থেকে। কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কের হয়তো সেখানেই ইতি। এরপরে অবশ্য ফজলুর হকের মন্ত্রী সভার অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করেছিলেন যোগ্যতার সঙ্গে। 

    ঠিক যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থার দিনগুলি। ক্লাসে তাঁর উপস্থিতিকেই ভয় পেতেন তাঁর মেধাবী সহপাঠীরা। জানতেন শ্যামাপ্রসাদ যে ক্লাসে থাকবেন সেখানে তিনিই টপার হবেন। মন্ত্রীসভাতেও তেমনি। আইনসভার ভিতরে শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিত্ব যুক্তিবোধ আর বাগ্মীতা সহজেই নজর কাড়ল। বাড়ছিল জনপ্রিয়তাও। ফলে বিরোধিতাও এল। কারণ ফজলুর হকের পার্টি তখন মুসলিম লিগের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে গিয়ে চরম অবস্থানে পৌঁছাচ্ছে। বাংলার চেহারা তখন দুই প্রান্তে দুরকম। পশ্চিমপ্রান্তে হিন্দু আধিক্য থাকলেও মুসলিমদের হাতে অর্থনীতির চাবিকাঠি। ঠিক তাঁর উলটো ছবি পূর্ব প্রান্তে। লড়াইটা দাঁড়িয়ে গেছিল দেশ ভাগের প্রশ্নে। বাংলার অবস্থান কোনদিকে থাকবে। যে বাঙালি হিন্দুর মেধার কাছে নেতৃত্বের কাছে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কাছে কংগ্রেসের তৎকালীন নেতারা নিয়ম করে হেরে যাচ্ছেন। যতবার হারছেন, ততবার গান্ধীজিকে সামনে রেখে পলায়নের পথ খুঁজছিলেন সেই সময়ের নেহেরু ফলোয়াররা। তাঁরা চাইছিলেন পাকিস্তানের অংশ হোক বেশিরভাগ বাংলা। বাকি অংশ জুড়ে দেওয়া হোক বিহার ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে। হিন্দু বাঙালি সত্ত্বার রাজনীতি নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন যে মানুষটা তিনিই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। 

    মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা ঠেকাতে মুখার্জি ১৯৪৬ সালেই বঙ্গভঙ্গের দাবি জানান। তারকেশ্বরে ১৫ এপ্রিল ১৯৪৭ তারিখে হিন্দু মহাসভার ডাকে একটি সভা তাঁকে বঙ্গভঙ্গ নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমোদন দেয়। ১৯৪৭ সালের মে মাসে, শ্যামাপ্রসাদ লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে একটি চিঠি লেখেন, যাতে বলা হয়, ভারত না হলেও বাংলাকে অবশ্যই ভাগ করতে হবে। সে সময়, ১৯৪৭-এ শরৎ বসু এবং বাঙালি মুসলিম রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দাবি ছিল একটি অখন্ড কিন্তু স্বাধীন বাংলার। শ্যামাপ্রসাদ এর বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল পরিষ্কার, ভাগ না হলে পশ্চিম অঞ্চলে হিন্দু অধ্যুষিত বাংলা ধ্বংস হয়ে যাবে।
     
    ঠিক সেই সময়ে পূর্ব বাংলায় নোয়াখালী গণহত্যা। যেখানে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে হিন্দুগণহত্যা চালানো হয়েছিল। মুসলিম লীগের হিন্দু সাফাই অভিযানের পিছনে যে রাজনীতি লুকিয়ে ছিল তা হল, সেই সময়ে মুসলিম লীগের প্রস্তাব। যে প্রস্তাবে বলা হল, সমগ্র বাংলাপ্রদেশকে পাকিস্তানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। যা হবে, ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের জন্য একটি স্বদেশ। এইখানেই বোঝা যায়, শ্যামাপ্রসাদের দূরদর্শিতা। হিন্দু বাঙালির নিজস্ব বাসভূমির পক্ষে তাঁর সওয়াল দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত করেছিল অবিভক্ত বাংলার হিন্দু সমাজকে। এরপর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি নেতৃত্বে “বেঙ্গলি হোমল্যান্ড মুভমেন্ট” শুরু হয়। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ১৯৪৭-এর দেশভাগ, বলা ভাল বাংলা ভাগকে মেনে নেন বাঙালি হিন্দু জনগণ। যা আসলে স্বাধীন ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে নিজেদের জন্য একটি বাসস্থান, আবাসভূমি। যাকে আমরা আজকের দিনে পশ্চিমবঙ্গ বলে চিনি।   

    ২১ জুন পশ্চিমবাংলার জন্মদিন। আর তাঁকেই ভুলে গেছিল বাংলার মানুষ।

    জন্মদিনের প্রণাম ভারত কেশরী শ্যামাপ্রসাদ।   

     

     

     

     

     

     

LinkedIn
Share