Tag: Pakistan security crisis

  • Balochistan: চতুর্মুখী সঙ্কটে পাকিস্তান, সন্ত্রাসবাদ-গণবিক্ষোভ আর সীমান্ত সংঘাতে জেরবার ইসলামাবাদ

    Balochistan: চতুর্মুখী সঙ্কটে পাকিস্তান, সন্ত্রাসবাদ-গণবিক্ষোভ আর সীমান্ত সংঘাতে জেরবার ইসলামাবাদ

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: অভূতপূর্ব এক অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক সঙ্কটের সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে পাকিস্তান। দেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রের অন্তত চারটি ভিন্ন প্রান্তে জ্বলছে ক্ষোভের আগুন। একদিকে যেমন বেড়েছে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীগুলির রক্তক্ষয়ী তৎপরতা, তেমনই অন্যদিকে ধেয়ে আসছে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের তীব্র গণবিক্ষোভের ঢেউ। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে তৈরি হওয়া যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি। সব মিলিয়ে দেশের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামরিক শক্তির চরম পরীক্ষা নিচ্ছে এই চতুর্মুখী সঙ্কট।

    গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স (Balochistan)

    গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে পাকিস্তানে হিংসা ও জঙ্গি হামলায় মৃত্যুর সংখ্যা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই বছর দেশটিতে জঙ্গি হামলায় মৃত্যু হয়েছে ১,১৩৯ জনের, যা ২০১৩ সালের পর সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালের জুন মাসে হামলার সংখ্যা সামান্য কমলেও, পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (পিআইসিএসএস) রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছে, কেবল জুন মাসেই ১১৮টি বড় ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় ১১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৪৮ জন জখম হয়েছেন। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সন্ত্রাসবাদের কোনও যৌক্তিকতা না থাকলেও, আজকের এই জঙ্গিগোষ্ঠীগুলির উত্থান আসলে পাকিস্তানের গত কয়েক দশকের নিজস্ব ভুল নীতিরই ফসল। আঞ্চলিক স্বার্থে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদত দেওয়ার যে কৌশল ইসলামাবাদ নিয়েছিল, তা এখন ব্যুমেরাং হয়ে দেশের অভ্যন্তরেই বড়সড় নিরাপত্তা সঙ্কট তৈরি করেছে। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে পাক নাগরিকদের মধ্যেও।

    বালুচিস্তানে দ্বিমুখী যুদ্ধ

    পাকিস্তানের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বালুচিস্তান। এই বিস্তীর্ণ প্রদেশটি দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইসলামাবাদ এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদকে চরমভাবে শোষণ করছে, অথচ স্থানীয় মানুষদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। গুম এবং রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এখানে আরও উসকে দিয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদের আগুনকে। বর্তমানে সেখানে একদিকে চলছে স্বাধিকারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, অন্যদিকে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি। গত জুলাই মাসে বালুচিস্তানের জিয়ারত জেলার মাঙ্গি বাঁধের কাছে একটি পুলিশ পোস্টে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-র জঙ্গিরা হামলা চালায়। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই হামলায় দু’জন স্টেশন হাউস অফিসার-সহ ন’জন পুলিশ কর্মী নিহত হন। পরে আরও ১৮ জনকে অপহরণ করে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর ঠিক দু’দিন পরে, বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-র যোদ্ধারা লাসবেলা জেলায় পাক সেনাবাহিনীর একটি কনভয়ে অতর্কিতে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল বেশ কয়েকজন সেনা কর্মীর। কোয়েটার কাছে অন্য একটি হামলায় চারজন অসামরিক নাগরিক নিহত হন। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে পাকিস্তানের প্রায় ৪০ জন নিরাপত্তা কর্মী প্রাণ হারান।

    ইসলামাবাদের মাথাব্যথা

    ইসলামাবাদের বড় চিন্তার বিষয় হল, বালুচিস্তানে তাদের একই সঙ্গে দু’টি ভিন্ন আদর্শের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। বিএলএ লড়ছে স্বাধীন বালুচিস্তানের দাবিতে, যার মূল ভিত্তি বালুচ জাতীয়তাবাদ। আর, টিটিপির লক্ষ্য হল পুরো পাকিস্তানে তাদের নিজস্ব চরমপন্থী ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এই বছর বিএলএর রণকৌশলে বড় বদল দেখা গিয়েছে। তারা দেশের ১০টিরও বেশি শহরে হামলা চালিয়ে পুলিশ স্টেশন, রেললাইন, ব্যাঙ্ক ও সরকারি ভবন ধ্বংস করেছে।

    খাইবার পাখতুনখোয়ায় ড্রোনের ব্যবহার

    একদিকে যখন বালুচিস্তান জ্বলছে, তখন খাইবার পাখতুনখোয়া বা কেপি প্রদেশেও অব্যাহত টিটিপির হামলা। উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান, বান্নু, বাজাউর, খাইবার এবং ডেরা ইসমাইল খানের মতো উপজাতীয় অঞ্চলে নিত্যদিন চলছে বোমা বিস্ফোরণ, অতর্কিত হামলা এবং টার্গেট কিলিং। সম্প্রতি আপার দির এবং বান্নুতে পৃথক হামলায় তিন পুলিশ কর্মী নিহত এবং প্রায় ২০ জন জখম হয়েছেন। কৌশল বদলে টিটিপি এখন পুলিশ স্টেশন এবং নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার জন্য বাণিজ্যিক ড্রোনের ব্যবহার শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান আর প্রথাগত জঙ্গি দমনের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এখন ড্রোন হামলা, সীমান্ত পারের জঙ্গি চলাচল, গোয়েন্দা যুদ্ধ এবং অনলাইন প্রোপাগান্ডার এক জটিল মিশ্রণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। ২০২২ সালের শেষের দিকে যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর, বারবার সামরিক অভিযান চালিয়েও, টিটিপির নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে পারেনি পাকিস্তান। পরন্তু বালুচিস্তানে টিটিপির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি প্রমাণ করছে যে, কেপি এবং বালুচিস্তানের সংঘাতগুলি এখন একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে।

    পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে তীব্র গণবিক্ষোভ

    উপজাতীয় এবং সীমান্ত অঞ্চলগুলিতে যখন সশস্ত্র লড়াই চলছে, তখন পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জম্মু-কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) নেতৃত্বে সেখানে মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুতের আকাশছোঁয়া বিল, আটার দাম বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবিতে বিশাল বিক্ষোভ চলছে। বিশেষ করে, পাকিস্তানের অন্য প্রান্তে বসবাসকারী জম্মু ও কাশ্মীরের উদ্বাস্তুদের জন্য প্রাদেশিক পরিষদে সংরক্ষিত ১২টি আসন নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় মানুষ। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই আসনগুলির মাধ্যমে ইসলামাবাদ স্থানীয় রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এবং স্থানীয়দের কণ্ঠরোধ করে।

    এই আন্দোলনের জবাবে পাক প্রশাসন কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেছে। ইন্টারনেট বন্ধ, গণজমায়েতে নিষেধাজ্ঞা এবং নির্বিচারে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এমনকি জেএএসিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও আন্দোলন থামানো যায়নি। জুলাই মাসের সংঘর্ষে অন্তত ন’জন নিহত হয়েছেন। রাওয়ালকোট থেকে মুজাফফরাবাদ পর্যন্ত পরিকল্পিত বিক্ষোভ মিছিল ঠেকাতে প্রায় ৪,০০০ রেঞ্জার্স, পুলিশ ও ফ্রন্টিয়ার ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। বহু এলাকায় সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

    বন্ধু থেকে শত্রু আফগানিস্তান

    ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তান সরকার আনন্দের সঙ্গে তাদের স্বাগত জানিয়েছিল। ইসলামাবাদ আশা করেছিল, কাবুলের নতুন সরকার দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত করবে এবং সীমান্ত সুরক্ষিত রাখবে। কিন্তু ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে পৌঁছে পাকিস্তানের সেই আশা চুরমার হয়ে গিয়েছে। পাকিস্তান এখন সরাসরি অভিযোগ করছে, আফগান তালেবান তাদের মাটিতে টিটিপির শীর্ষ নেতাদের আশ্রয় দিচ্ছে এবং সেখান থেকে পাকিস্তানে হামলা চালানো হচ্ছে। যদিও তালেবান অভিযোগ অস্বীকার করে একে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা বলে দাবি করেছে। এই বিরোধ এখন প্রকাশ্য সামরিক সংঘাতের রূপ নিয়েছে। করাচিতে পাকিস্তান রেঞ্জার্সের ওপর হামলার পর, পাক বিমানবাহিনী আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে পাক্তিয়া, পাক্তিকা এবং কুনার প্রদেশে বিমান ও স্থল অভিযান চালায়। ইসলামাবাদ দাবি করে তারা জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করেছে, কিন্তু রাষ্ট্রসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় বহু সাধারণ আফগান নাগরিক হতাহত হয়েছেন। এর জবাবে আফগান তালেবানও চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি সামরিক টার্গেটে ড্রোন ও বিমান হামলা চালানোর দাবি করেছে। ফলস্বরূপ, ডুরান্ড লাইন এখন আর কেবল আন্তর্জাতিক সীমান্ত নয়, বরং একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

    সঙ্কট কি দেশের ভাঙন ডেকে আনবে?

    এই চারটি সঙ্কট একই সময়ে ঘটায় আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কযুক্ত মনে হলেও, এদের লক্ষ্য ও পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা। বিএলএ চায় স্বাধীনতা, টিটিপি চায় শরিয়া শাসন, জেএএসি চায় অর্থনৈতিক স্বস্তি ও রাজনৈতিক অধিকার, আর আফগান তালেবান ব্যস্ত তাদের নিজস্ব শাসন কায়েম করতে। তবে এই গোষ্ঠীগুলির লক্ষ্য যা-ই হোক না কেন, এরা প্রত্যেকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক কাঠামোর দুর্বলতাকে বেআব্রু করে দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও সম্প্রতি সংসদে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছেন, দেশের দু’টি প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন অত্যন্ত সক্রিয় এবং দেশের পরিস্থিতি দিন দিন আরও গুরুতর হয়ে উঠছে। প্রাক্তন আফগান ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহ সম্প্রতি পাকিস্তানে নতুন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরার পর, দেশটির ভেঙে যাওয়ার তত্ত্ব নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে পাকিস্তানের সীমানা বদলে যাওয়ার মতো কোনও জোরালো প্রমাণ নেই। কারণ প্রতিটি আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং দাবি আলাদা। তা সত্ত্বেও, এটি মানতেই হবে যে পাকিস্তান তার ইতিহাসের অন্যতম কঠিন অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই বহুমুখী চাপ সামলাতে গিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক শক্তি কতটা সফল হয়, সেটাই দেখার।

     

LinkedIn
Share