মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতের অর্থনীতির ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধিকে দেশের মানুষের সম্মিলিত শক্তি ও কঠোর পরিশ্রমের প্রতিফলন বলে প্রশংসা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একইসঙ্গে দেশবাসীকে ‘স্বদেশি’ ও ‘ভোকাল ফর লোকাল’-এর প্রচার আরও জোরদার করার আহ্বান জানালেন তিনি। অপ্রয়োজনীয় বিদেশি খরচ, বিশেষ করে অবকাশযাপন, বিদেশে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং এবং প্রয়োজন না থাকলে সোনা কেনার মতো ব্যয় কমানোর বার্তাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার একটি ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, নানা সংকট এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার মতো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ভারত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। তাঁর মতে, এই সাফল্য কোনও একজনের নয়, বরং দেশের সাধারণ মানুষের সংকল্প ও পরিশ্রমের ফল।
সম্মিলিত শক্তির প্রতিফলন
৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির প্রসঙ্গে মোদি বলেন, “দেশের মানুষকে অনেক অভিনন্দন। ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি। দেশ আনন্দে ভরে উঠেছে। তবে দেশের মানুষের সংকল্প ও কঠোর পরিশ্রমের জন্য তাঁদের অভিনন্দন জানাই। এটি সম্মিলিত শক্তির প্রতিফলন।” বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ অতিমারির সময় থেকে এখনও পর্যন্ত বিশ্বে স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধের খবর আসছে, বিশ্ব একাধিক সংকটের মধ্যে রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। মোদি বলেন, “২০২০ সালে কোভিডের সময় থেকে আজ পর্যন্ত কোথাও স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ব যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে, চারদিকে সংকট। সরবরাহ শৃঙ্খল সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত। তা সত্ত্বেও ভারত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।”
ভোকাল ফর লোকাল
বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা। আমেরিকা ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে বিশ্ব বাজারে। তখন সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে ভারতীয় অর্থনীতি। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার পূর্বাভাসকে ছাপিয়ে গিয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের প্রকৃত জিডিপি GDP) বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ। ভারতের অর্থনীতির এই সাফল্যের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে সাধারণ মানুষকে দেশীয় পণ্য ও পরিষেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বার্তা, প্রয়োজনীয় খরচের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে বেশি অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করতে অপ্রয়োজনীয় বিদেশি ব্যয় কমিয়ে ‘স্বদেশি’ ও ‘ভোকাল ফর লোকাল’-কে আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
মেড ইন ইন্ডিয়া
ভবিষ্যতেও এই সাফল্যের ধারা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে মোদি বলেন, ভারতকে পুরোপুরি ‘আত্মনির্ভর’ হতে হবে এবং ‘স্বদেশী’ মন্ত্র মেনে কাজ করতে হবে। তিনি দেশবাসীকে অনুরোধ জানান, যেন তারা বিদেশে গিয়ে ধুমধাম করে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত বা অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ বদলে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ মন্ত্রকে জীবনে আপন করে নেন। একই সঙ্গে প্রয়োজন ছাড়া সোনা কেনা বন্ধ করার পরামর্শও দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, আমরা যত বেশি দেশি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হব, স্বাধীনতার ১০০ বছরে পৌঁছে দেশের যুবসমাজকে তত সুন্দর এক নতুন ভারত উপহার দিতে পারব।
ভারত আবারও বিকশিত হল
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) ভারতের প্রকৃত GDP (মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন) বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৭.৮ শতাংশ। সোমবার কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রক এই তথ্য প্রকাশ করেছে। এই তথ্য সামনে আসার পরই এক্স হ্যান্ডলে প্রধানমন্ত্রী লেখেন, “২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের ৭.৮ শতাংশের অসাধারণ জিডিপি বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে এক বিরাট সাফল্য। বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে তেলের দামের ধাক্কা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নানা সমস্যার মধ্যেও দেশের মানুষের সম্মিলিত শক্তিই ভারতকে এই প্রবৃদ্ধি অর্জনে সাহায্য করেছে।” এরপরই ভারতীয় অর্থনীতির সমালোচকদের নিশানা করে মোদি লেখেন, “হতাশাবাদীদের ভবিষ্যদ্বাণী মুখ থুবড়ে পড়ল, ভারত আবারও বিকশিত হল।” প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দিলেন, যাঁরা ভারতের অর্থনীতি নিয়ে হতাশার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তাঁদের সেই আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
আরবিআই-এর পূর্বাভাস
প্রসঙ্গত, কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবর্ষের একই ত্রৈমাসিকে জিডিপি (GDP) বৃদ্ধির হার ছিল ৬.৯ শতাংশ। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে সেটাই হয়েছে ৭.৮ শতাংশ। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের প্রকৃত জিডিপি (GDP)-র পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১.৩৬ লক্ষ কোটি টাকা। গত অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে এই পরিমাণ ছিল ৭৫.৪৬ লক্ষ কোটি টাকা। জিডিপি বৃদ্ধির এই হার রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার (RBI) ৭ শতাংশ পূর্বাভাসকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। জুনে শেষ হওয়া ত্রৈমাসিকের জন্য আরবিআই ৭ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল।
তরুণ প্রজন্মকে বার্তা
অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের তরুণ প্রজন্ম নিয়েও আশাবাদী বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, আজ যে পরিশ্রম করা হচ্ছে, তার সুফল ভবিষ্যতে দেশের যুব সমাজ পাবে। মোদি বলেন, তরুণদের স্বপ্ন পূরণ করাই দেশের অন্যতম বড় লক্ষ্য। আজকের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই আগামী দিনের ভারত তৈরি হবে। তিনি দেশবাসীকে দেশের উন্নয়নে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, সরকারের নীতি সঠিক পথে রয়েছে। উদ্দেশ্যও স্পষ্ট। আর ১৪০ কোটি মানুষের সম্মিলিত শক্তি ভারতকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তার মূল সুর হল—দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সাধারণ মানুষকেও নিজেদের কেনাকাটা, ভ্রমণ এবং জীবনযাপনের কিছু সিদ্ধান্তে দেশীয় ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
