মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দু’দিনের জাপান সফরে রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (PM Modi)। এই সফরের সময় তাঁকে উপহার হিসেবে একটি বিশেষ পুতুল দেওয়া হয়, যাকে “দারুমা পুতুল” বলা হয়। স্থানীয় জাপানি ভাষায় এ নামেই পরিচিত এই পুতুলটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুতুলের মধ্যেই জাপানের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন প্রতিফলিত হয়। জানা যাচ্ছে, এই দারুমা পুতুলটি উপহার দেন তাকাসাকির শোরিনজান দারুমা-জি মন্দিরের প্রধান পুরোহিত, রেভারেন্ড সেইশি হিরোস। এটি শুধু একটি খেলনা নয়—জাপানের ঐতিহ্যের একটি প্রতীকও বটে।
দারুমা (Daruma Doll) পুতুলের বৈশিষ্ট্য
দারুমা (Daruma Doll) পুতুল সাধারণত একটি গোলাকার মূর্তি, যার মধ্যে জাপানের ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস প্রতীকীভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে। অনেকেই একে “ধর্ম পুতুল” হিসেবেও আখ্যা দেন। মূলত এটি বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে যুক্ত, এবং সাধারণভাবে বৌদ্ধ পুতুল হিসেবেই বিবেচিত হয়। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গহীন এই পুতুল সাধারণত লাল রঙের হয়ে থাকে, পুতুলটির মুখে এক ধরনের কঠোরতা থাকে এবং চোখ দুটি সম্পূর্ণ সাদা। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—নিচের অংশ ভারী হওয়ার কারণে এটি পড়ে গেলেও নিজে থেকেই আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এই গুণের ভিত্তিতে জাপানি প্রবাদে বলা হয়: “নানাকোরোবি ইয়াওকি”, অর্থাৎ ‘সাতবার পড়লেও, আটবার উঠে দাঁড়াও।’
জাপানের দোকান, রেস্তোরাঁ, বাড়ি সর্বত্র দেখা যায় এই পুতুল
জাপানের দোকান, রেস্তোরাঁ, বাড়ি—প্রায় সর্বত্রই এই পুতুলের দেখা মেলে। জাপানিরা বিশ্বাস করেন, এটি সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি ও অধ্যবসায়ের প্রতীক। দারুমা (Daruma Doll) নামে পরিচিত এই পুতুলটির ইতিহাস ভারতবর্ষের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। এর নামকরণ ও অনুপ্রেরণা এসেছে বোধিধর্ম (বা বোধি ধর্ম) নামক এক ভারতীয় সাধকের জীবন থেকে। বোধিধর্ম ছিলেন তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরমে জন্মগ্রহণকারী একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। ধারণা করা হয়, তিনি ৪৪০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দীতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে চিন হয়ে জাপানে পৌঁছান। বৌদ্ধ ধ্যানচর্চার একাগ্রতাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে তিনি একটানা ৯ বছর ধ্যানস্থ ছিলেন। এত দীর্ঘ সময় ধ্যানমগ্ন থাকার ফলে তাঁর হাত-পা অসাড় হয়ে যায়। আরও জানা যায়, ধ্যানের সময় যাতে ঘুম না আসে, সেজন্য তিনি নিজের চোখের পাতা নিজেই উপড়ে ফেলেন। সেই কারণেই দারুমা পুতুলে চোখ বড় বড় এবং চওড়া।
জাপানে নতুন বছরের শুরুতে সবাই দারুমা কেনেন
ধারণা করা হয়, অতীতে গুটিবসন্ত মহামারির সময়, এই রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় দারুমাকে লাল রঙে রাঙানো হতো। সেই প্রথা থেকেই দারুমা সাধারণত লাল রঙের হয়ে থাকে। তবে এর বিভিন্ন রঙের পেছনেও রয়েছে আলাদা প্রতীকী মানে—হলুদ দারুমা সুরক্ষা ও নিরাপত্তার প্রতীক, সাদা দারুমা প্রেম ও একতার প্রতীক। প্রতিটি দারুমা পুতুলের মুখের নিচে সোনালি অক্ষরে লেখা থাকে “ফুকু ইরি”, যার অর্থ—‘সৌভাগ্য বহনকারী’। জাপানে নতুন বছরের শুরুতে মানুষ একটি দারুমা কেনেন এবং কোনো ইচ্ছা থাকলে তার একটি চোখে রং দিয়ে “প্রাণ প্রতিষ্ঠা” করেন। যদি বছরের মধ্যে সেই ইচ্ছা পূরণ হয়, তবে অন্য চোখেও রং পূরণ করা হয়। আর যদি ইচ্ছেপূরণ না হয়, তবে সেই দারুমাকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে “দারুমা কুইও” নামের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে পূজা দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়।