মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বাল্যবিবাহ এবং ১৮ বছর বয়সের আগে সন্তান প্রসবের ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। রাজ্যে এই দুই সমস্যার ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানিয়েছেন, বাল্যবিবাহে জড়িত ব্যক্তি, অভিভাবক এবং বিয়ে সম্পাদনে সাহায্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হতে পারে।
‘১ নম্বরে রান করছি’ (Suvendu Adhikari)
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ছ’মাসের হিসাবেই রাজ্যে ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়েদের সন্তান প্রসবের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। তাঁর কথায়, “আমরা দু’টো বিষয়ে ভারতবর্ষে এখন প্রথম। বিগত সরকারের কুফল। একটা হচ্ছে ১৮ বছরের নীচে বিবাহ। আর ১৮ বছরের নীচে সন্তান (Child Marriage) প্রসব। এটাতে আমরা এখন ১ নম্বরে রান করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা নির্দিষ্ট কিছু কেস তো করবই, গ্রেফতার তো করবই। থামাতে হবে তো, থামাতে হবে এবং পচা খাবারে যেমন অভিযান হচ্ছে, এটায় আরও বড় অভিযানে নামব, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তুলে আনব।”
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাল্যবিবাহ কিংবা ১৮ বছরের আগে সন্তান প্রসবের ঘটনায় দোষ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের সরকারি ভাতা বন্ধ করা হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, “সব বন্ধ করব। রাস্তায় গড়াগড়ি খেলেও ভাতা পাবে না। পকসো আইনে জেলে চলে যাবে।”
তবে আইনি দিক থেকে বিষয়টি একটু স্পষ্ট করে দেখা প্রয়োজন। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে মূল শাস্তির বিধান রয়েছে বাল্যবিবাহ নিষেধ আইন, ২০০৬-এ। অন্যদিকে নাবালিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী শিশুদের যৌন অপরাধ থেকে সুরক্ষা আইন, ২০১২ প্রযোজ্য হতে পারে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতাও সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য হতে পারে।
বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে কী শাস্তি?
আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের বেশি বয়সি কোনও পুরুষ কোনও শিশুকে বিয়ে করলে তাঁর সর্বোচ্চ দু’বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা, অথবা দু’টোই হতে পারে।
শুধু বিয়ে করলেই নয়, বাল্যবিবাহ সম্পাদন, পরিচালনা, নির্দেশ দেওয়া কিংবা তাতে সহায়তা করার ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান রয়েছে। পুরোহিত, কাজি, মধ্যস্থতাকারী বা অন্য কোনও ব্যক্তি বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করতে সাহায্য করলে তাঁরও সর্বোচ্চ দু’বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
শিশুর অভিভাবক বা দায়িত্বে থাকা কোনও ব্যক্তি বাল্যবিবাহে উৎসাহ দিলে, অনুমতি দিলে অথবা তা আটকানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে (Suvendu Adhikari)।
নাবালিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্কে পকসো
১৮ বছরের কম বয়সি প্রত্যেকেই শিশু হিসেবে শিশুদের যৌন অপরাধ থেকে সুরক্ষা আইনের আওতায় পড়ে। ফলে কোনও নাবালিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের অভিযোগ উঠলে, বিয়ে হয়েছে কি না—সেটি একমাত্র বিষয় নয়; পরিস্থিতি অনুযায়ী পকসো আইন প্রযোজ্য হতে পারে।
অনুপ্রবেশমূলক যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ন্যূনতম ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, যা যাবজ্জীবন পর্যন্ত হতে পারে। আর ‘গুরুতর অনুপ্রবেশমূলক যৌন নির্যাতনে’র ক্ষেত্রে সংশোধিত আইনে ন্যূনতম ২০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড থেকে আমৃত্যু যাবজ্জীবন, এমনকি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
বিশেষত ১২ বছরের কম বয়সি শিশুর ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন, একাধিকবার যৌন নির্যাতন, নিকট আত্মীয় বা অভিভাবকসুলভ অবস্থানে থাকা ব্যক্তির দ্বারা নির্যাতন এবং শিশুকে জেনে যে সে গর্ভবতী, তার উপর যৌন নির্যাতন—আইনে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
১৮ বছরের আগে সন্তান প্রসব হলে?
শুধু কোনও নাবালিকা গর্ভবতী হয়েছে বা সন্তান প্রসব করেছে বলেই তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তির প্রশ্ন ওঠে না। আইনের মূল লক্ষ্য শিশুটিকে সুরক্ষা দেওয়া এবং তার সঙ্গে যৌন অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে পকসো আইনে মামলা হতে পারে।
বাল্যবিবাহ রুখতে আরও কড়া অভিযান
রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই বাল্যবিবাহ শনাক্ত করতে বাড়ি বাড়ি অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে। বাল্যবিবাহে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তির পাশাপাশি বিয়ে সম্পাদনকারী বা সহযোগীদের বিরুদ্ধেও মামলা করার কথা বলা হয়েছে (Suvendu Adhikari)।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাল্যবিবাহ এবং নাবালিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক—দু’টি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। বাল্যবিবাহের জন্য মূলত বাল্যবিবাহ নিষেধ আইন প্রযোজ্য হলেও, ১৮ বছরের কম (Child Marriage) বয়সি শিশুর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের অভিযোগ উঠলে কার্যকর হতে পারে পকসো আইনের কঠোর বিধান।
