তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
বাড়ির পোষ্য হোক কিংবা পথ চলতে গিয়ে, কখনও আবার হঠাৎ কোনও দুর্ঘটনা—বিভিন্ন প্রাণীর কামড় বা আঁচড় মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। জ্বর, মাথাব্যথা, কামড়ের জায়গায় জ্বালা বা অস্বস্তি প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে। পরবর্তী সময়ে জল বা খাবার গিলতে সমস্যা, হাত-পায়ে খিঁচুনি, এমনকি বারবার অচেতন হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এই ধরনের বিপদ এড়াতে প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পরে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রেবিস টিকাকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজ্যের বহু জায়গায় পর্যাপ্ত রেবিস টিকার জোগান না থাকায় সমস্যায় পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা সরকারি হাসপাতালে ঘুরতে হয়। ফলে টিকাকরণের উপযুক্ত সময় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই হয়রানি কমাতেই রাজ্য সরকার রেবিস ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করার দিকে বাড়তি নজর দিতে চাইছে। পাশাপাশি রাজ্যে চারটি পৃথক রেবিস টিকাকরণের মডেল কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। উদ্দেশ্য, জেলা থেকে শহর—সমস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালে যাতে প্রয়োজনমতো রেবিস টিকাকরণের ব্যবস্থা থাকে এবং রোগীদের অযথা হয়রানির শিকার হতে না হয়।
কেন মডেল টিকাকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা?
চিকিৎসকদের মতে, রেবিস ভাইরাস আক্রান্ত প্রাণীর লালার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। সংক্রমণের পরে সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও টিকাকরণ না হলে রোগটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
স্বাস্থ্য কর্তাদের একাংশের দাবি, রাজ্যের একাধিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনেক সময় রেবিস ভ্যাকসিনের জোগান ঠিকমতো থাকে না। আবার কোথাও ভ্যাকসিন থাকলেও টিকাকরণের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। এর জেরেই সমস্যায় পড়েন সাধারণ মানুষ।
এই পরিস্থিতি বদলাতেই চারটি মডেল রেবিস টিকাকরণ কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলি থেকে রাজ্যের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত টিকার জোগান রয়েছে কি না, তা নজরদারি করা হবে। কোথাও কর্মীর ঘাটতি থাকলে তা সমাধানেরও চেষ্টা করা হবে।
রেবিসের টিকাকরণ একাধিক ডোজে সম্পূর্ণ করতে হয়। তাই কোনও রোগী নিয়ম মেনে টিকাকরণের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন কি না, সেদিকেও নজর রাখা হবে। সামগ্রিকভাবে জলাতঙ্কে মৃত্যুর হার কমাতেই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
শুধু কুকুর নয়, কোন কোন প্রাণীর কামড়ে প্রয়োজন রেবিস টিকা?
রেবিসের ক্ষেত্রে শুধু কুকুরের কামড়কেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয় না। বাঁদর বা হনুমানের কামড় কিংবা আঁচড় থেকেও সংক্রমণের আশঙ্কা থাকতে পারে। তাই এমন ঘটনা ঘটলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বাদুড়ের সংস্পর্শের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাদুড়ের কামড় বা আঁচড় অনেক সময় সহজে বোঝা যায় না। এমনকি ঘুমন্ত অবস্থাতেও কামড় বা আঁচড়ের ঘটনা ঘটতে পারে। তাই এ ধরনের ঘটনায় ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গ্রামাঞ্চলে শিয়ালের কামড় বা আঁচড়ের ঘটনাও ঘটে। এমন ক্ষেত্রেও রেবিস সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী টিকাকরণ করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীর লালার সংস্পর্শে এলে রেবিস ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই কুকুর, বেড়াল, হনুমান, বাঁদর, বাদুড়, শিয়াল-সহ কোনও স্তন্যপায়ী প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের ঘটনা ঘটলে অবহেলা না করে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া প্রয়োজন।
কেন রেবিস টিকাকরণে বাড়তি গুরুত্ব?
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৯৫ লক্ষ মানুষ প্রাণীর কামড়ের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭৬ শতাংশই কুকুরের কামড়ের ঘটনা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর ৬ হাজারেরও বেশি মানুষ রেবিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
চিকিৎসকদের মতে, রেবিসের উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পরে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তাই সংক্রমণের সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় টিকাকরণ অত্যন্ত জরুরি।
একই সঙ্গে রেবিস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন। কোনও প্রাণীকে বাইরে থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক মনে হলেও তার মধ্যে রেবিস ভাইরাস থাকতে পারে। তাই কোনও স্তন্যপায়ী প্রাণীর কামড় বা আঁচড়কে হালকা ভাবে না নিয়ে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কামড়ের জায়গায় কী করবেন?
প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পরে ক্ষতস্থানে হলুদ, মাটি বা অন্য কোনও পদার্থ লাগানো উচিত নয়। বরং দ্রুত ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রেবিস টিকাকরণই এই প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
