Tag: ramakrishna

ramakrishna

  • Ramakrishna 524: “পূর্ণজ্ঞান আর পূর্ণভক্তি একই, ‘নেতি’ ‘নেতি’ করে বিচারের শেষ হলে, ব্রহ্মজ্ঞান”

    Ramakrishna 524: “পূর্ণজ্ঞান আর পূর্ণভক্তি একই, ‘নেতি’ ‘নেতি’ করে বিচারের শেষ হলে, ব্রহ্মজ্ঞান”

    ৪৯ শ্রীশ্রীরথযাত্রা বলরাম-মন্দিরে

    অষ্টম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১৫ই জুলাই

    ভক্তিযোগের গূঢ় রহস্য—জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বয়

    মুখুজ্জে, হরিবাবু, পূর্ণ, নিরঞ্জন, মাস্টার, বলরাম 

    মুখুজ্জে—হরি (বাগবাজারের হরিবাবু) আপনার কালকের কথা শুনে অবাক্‌! বলে, ‘সাংখ্যদর্শনে, পাতঞ্জলে, বেদান্তে—ও-সব কথা আছে। ইনি সামান্য নন।’

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—কই, আমি সাংখ্য, বেদান্ত পড়ি নাই।

    “পূর্ণজ্ঞান আর পূর্ণভক্তি একই। ‘নেতি’ ‘নেতি’ করে বিচারের শেষ হলে, ব্রহ্মজ্ঞান।—তারপর যা ত্যাগ করে গিছিল, তাই আবার গ্রহণ। ছাদে উঠবার সময় সাবধানে উঠতে হয়। তারপর দেখে যে, ছাদও যে জিনিসে—ইট-চুন-সুরকি—সিঁড়িও সেই জিনিসে তৈয়ারী!

    “যার উচ্চ বোধ আছে, তার নিচু বোধ আছে। জ্ঞানের পর, উপর নিচে এক বোধ হয়।

    “প্রহ্লাদের যখন তত্ত্বজ্ঞান হত, ‘সোঽহম্‌’ হয়ে থাকতেন। যখন দেহবুদ্ধি আসত ‘দাসোঽহম্‌’, ‘আমি তোমার দাস’, এই ভাব আসত।

    “হনুমানের (Kathamrita) কখনও ‘সোঽহম্‌’, কখন ‘দাস আমি’, কখন ‘আমি তোমার অংশ’, এই ভাব আসত।

    “কেন ভক্তি নিয়ে থাকো?—তা না হলে মানুষ কি নিয়ে থাকে! কি নিয়ে দিন কাটায়।

    “‘আমি’ তো যাবার নয়, ‘আমি’ ঘট থাকতে সোঽহম্‌ হয় না। সমাধিস্থ হলে ‘আমি’ পুছে যায়, —তখন যা আছে তাই। রামপ্রসাদ বলে (Kathamrita), তারপর আমি ভাল কি তুমি ভাল, তা তুমিই জানবে।

    “যতক্ষণ ‘আমি’ রয়েছে ততক্ষণ ভক্তের মতো থাকাই ভাল! ‘আমি ভগবান’ এটি ভাল না। হে জীব, ভক্তবৎ এটি ভাল না। হে জীব, ভক্তবৎ ন চ কৃষ্ণবৎ!—তবে যদি নিজে টেনে লন, তবে আলাদা কথা। যেমন মনিব চাকরকে ভালবেসে বলছে, আয় আয় কাছে বোস আমিও যা তুইও তা। গঙ্গারই ঢেউ, ঢেউয়ের গঙ্গা হয় না!

    “শিবের (Ramakrishna) দুই অবস্থা। যখন আত্মারাম তখন সোঽহম্‌ অবস্থা, — যোগেতে সব স্থির। যখন ‘আমি’ একটি আলাদা বোধ থাকে তখন ‘রাম! রাম!’ করে নৃত্য।

    “যাঁর অটল আছে, তাঁর টলও আছে।

    “এই তুমি স্থির। আবার তুমিই কিছুক্ষণ পরে কাজ করবে।

    “জ্ঞান আর ভক্তি একই জিনিস। — তবে একজন বলছে ‘জল’, আর-একজন ‘জলের খানিকটা চাপ’।”

  • Ramakrishna 523: “রামলালার উপর যা যা ভাব হত, তাই পূর্ণাদিকে দেখে হচ্ছে! রামলালাকে নাওয়াতাম, খাওয়াতাম, শোয়াতাম”

    Ramakrishna 523: “রামলালার উপর যা যা ভাব হত, তাই পূর্ণাদিকে দেখে হচ্ছে! রামলালাকে নাওয়াতাম, খাওয়াতাম, শোয়াতাম”

    ৪৯ শ্রীশ্রীরথযাত্রা বলরাম-মন্দিরে

    সপ্তম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১৫ই জুলাই
    সুপ্রভাত ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ — মধুর নৃত্য ও নামকীর্তন

    এইবার ঠাকুর ভক্তসঙ্গে ছোট ঘরটিতে বসিয়াছেন। দিগম্বর! যেন পাঁচ বৎসরের বালক! মাস্টার, বলরাম আরও দুই-একটি ভক্ত বসিয়া আছেন।

    রূপদর্শন কখন? গুহ্যকথা—শুদ্ধ-আত্মা ছোকরাতে নারায়ণদর্শন

    রামলালা, নিরঞ্জন, পূর্ণ, নরেন্দ্র, বেলঘরের তারক, ছোট নরেন

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—ঈশ্বরীয় রূপ দর্শন করা যায়! যখন উপাধি সব চলে যায়,—বিচার বন্ধ হয়ে যায়,—তখন দর্শন। তখন মানুষ অবাক্‌ সমাধিস্থ হয়। থিয়েটারে গিয়ে বসে লোকে কত গল্প করে,—এ-গল্প সে গল্প। যাই পর্দা উঠে যায় সব গল্প-টল্প বন্ধ হয়ে যায়। যা দেখে তাইতেই মগ্ন হয়ে যায়।

    “তোমাদের অতি গুহ্যকতা বলছি। কেন পূর্ণ, নরেন্দ্র, এদের সব এত ভালবাসি। জগন্নাথের সঙ্গে মধুরভাবে আলিঙ্গন করতে গিয়ে হাত ভেঙে গেল। জানিয়ে দিলে, “তুমি শরীরধারণ করেছ—এখন নররূপের সঙ্গে সখ্য, বাৎসল্য এইসব ভাব লয়ে থাকো।”

    “রামলালার উপর যা যা ভাব হত, তাই পূর্ণাদিকে দেখে হচ্ছে! রামলালাকে নাওয়াতাম, খাওয়াতাম, শোয়াতাম,—সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতাম,—রামলালার জন্য বসে বসে কাঁদতাম, ঠিক এই সব ছেলেদের নিয়ে তাই হয়েছে! দেখ না নিরঞ্জন। কিছুতেই লিপ্ত নয়। নিজের টাকা দিয়ে গরিবদের ডাক্তারখানায় নিয়ে যায়। বিবাহের কথায় বলে, ‘বাপরে! ও বিশালাক্ষীর দ!’ ওকে দেখি যে, একটা জ্যোতিঃর উপর বসে রয়েছে।

    “পূর্ণ উঁচু সাকার ঘর—বিষ্ণুর অংশে জন্ম। আহা কি অনুরাগ!

    (মাস্টারের প্রতি)—“দেখলে না,—তোমার দিকে চাইতে লাগল—যেন গুরুভাই-এর উপর—যেন ইনি আমার আপনার লোক! আর-একবার দেখা করবে বলেছে (Kathamrita)। বলে কাপ্তেনের ওখানে দেখা হবে।”

    নরেন্দ্রের কত গুণ—ছোট নরেণের গুণ

    “নরেন্দ্রের খুব উঁচু ঘর—নিরাকারের ঘর। পুরুষের সত্তা।

    “এতো ভক্ত আসছে, ওর মতো একটি নাই।

    “এক-একবার বসে বসে খতাই। তা দেখি, অন্য পদ্ম কারু দশদল, কারু ষোড়শদল, কারু শতদল কিন্তু পদ্মমধ্যে নরেন্দ্র সহস্রদল!

    “অন্যেরা কলসী, ঘটি এ-সব হতে পারে,—নরেন্দ্র জালা।

    “ডোবা পুষ্করিণী মধ্যে নরেন্দ্র বড় দীঘি! যেমন হালদার-পুকুর।

    “মাছের মধ্যে নরেন্দ্র রাঙাচক্ষু বড় রুই, আর সব নানারকম মাছ—পোনা, কাঠি বাটা, এই সব।

    “খুব আধার,—অনেক জিনিস ধরে। বড় ফুটোওলা বাঁশ!

    “নরেন্দ্র কিছুর বশ নয়। ও আসক্তি, ইন্দ্রিয়-সুখের বশ নয়। পুরুষ পায়রা। পুরুষ পায়রার ঠোঁট ধরলে ঠোঁট টেনে ছিনিয়ে লয়,—মাদী পায়রা চুপ করে থাকে।

    “বেলঘরের তারককে মৃগেল বলা যায়।

    “নরেন্দ্র পুরুষ, গাড়িতে তাই ডান দিকে বসে। ভবনাথের মেদী ভাব ওকে তাই অন্যদিকে বসতে দিই!

    “নরেন্দ্র সভায় থাকলে আমার বল।”

    শ্রীযুক্ত মহেন্দ্র মুখুজ্জে আসিয়া প্রণাম করিলেন। বেলা আটটা হইবে। হরিপদ, তুলসীরাম, ক্রমে আসিয়া প্রণাম করিয়া বসিলেন। বাবুরামের জ্বর হইয়াছে,—আসিতে পারেন নাই।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) মাস্টারাদির প্রতি — ছোট নরেন এলো না? মনে করেছে, আমি চলে গেছি। (মুখুজ্জের প্রতি) কি আশ্চর্য! সে (ছোট নরেন) ছেলেবেলায় স্কুল থেকে এসে ঈশ্বরের জন্য কাঁদত। (ঈশ্বরের জন্য) কান্না কি কমেতে হয়!

    “আবার বুদ্ধি খুব। বাঁশের মধ্যে বড় ফুটোওলা বাঁশ!

    “আর আমার উপর সব মনটা। গিরিশ ঘোষ বললে (Kathamrita), নবগোপালের বাড়ি যেদিন কীর্তন হয়েছিল, সেদিন (ছোট নরেন) গিছিল,—কিন্তু ‘তিনি কই’ বলে আর হুঁশ নাই,—লোকের গায়ের উপর দিয়েই চলে যায়!

    “আবার ভয় নাই—যে বাড়িতে বকবে। দক্ষিণেশ্বরে তিনরাত্রি সমানে থাকে।”

  • Ramakrishna 522: “কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! গোপীকৃষ্ণ! গোপী! গোপী! রাখালজীবন কৃষ্ণ! নন্দনন্দন কৃষ্ণ! গোবিন্দ! গোবিন্দ!”

    Ramakrishna 522: “কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! গোপীকৃষ্ণ! গোপী! গোপী! রাখালজীবন কৃষ্ণ! নন্দনন্দন কৃষ্ণ! গোবিন্দ! গোবিন্দ!”

    ৪৯ শ্রীশ্রীরথযাত্রা বলরাম-মন্দিরে

    সপ্তম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১৫ই জুলাই

    সুপ্রভাত ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ — মধুর নৃত্য ও নামকীর্তন

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) বৈঠকখানার পশ্চিমদিকের ছোট ঘরে শয্যায় শয়ন করিয়া আছেন। রাত ৪টা। ঘরের দক্ষিণে বারান্দা, তাহাতে একখানি টুল পাতা আছে। তাহার উপর মাস্টার বসিয়া আছেন।

    কিয়ৎক্ষণ পরেই ঠাকুর বারান্দায় আসিলেন। মাস্টার ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিলেন। সংক্রান্তি, বুধবার, ৩২শে আষাঢ়; ১৫ই জুলাই, ১৮৮৫।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—আমি আর-একবার উঠেছিলাম। আচ্ছা, সকালবেলা কি যাব?

    মাস্টার — আজ্ঞা, সকালবেলায় ঢেউ একটু কম থাকে।

    ভোর হইয়াছে—এখনও ভক্তেরা আসিয়া জুটেন নাই। ঠাকুর মুখ ধুইয়া মধুর স্বরে নাম করিতেছেন। পশ্চিমের ঘরটির উত্তর দরজার কাছে দাঁড়াইয়া নাম করিতেছেন। কাছে মাস্টার। কিয়ৎক্ষণ পরে অনতিদূরে গোপালের মা আসিয়া দাঁড়াইলেন। অন্তঃপরে দ্বারের অন্তরালে ২/১টি স্ত্রীলোক ভক্ত আসিয়া ঠাকুরকে দেখিতেছেন। যেন শ্রীবৃন্দাবনের গোপীরা শ্রীকৃষ্ণদর্শন করিতেছেন! অথবা নবদ্বীপের ভক্ত মহিলারা প্রেমোন্মত্ত হইয়া শ্রীগৌরাঙ্গকে আড়াল হইতে দেখিতেছেন।

    রামনাম করিয়া ঠাকুর কৃষ্ণনাম করিতেচেন, কৃষ্ণ! কৃষ্ণ! গোপীকৃষ্ণ! গোপী! গোপী! রাখালজীবন কৃষ্ণ! নন্দনন্দন কৃষ্ণ! গোবিন্দ! গোবিন্দ!

    আবার গৌরাঙ্গের নাম করিতেছেন—

    শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ। হরেকৃষ্ণ হরে রাম, রাধে গোবিন্দ!

    আবার বলিতেছেন, আলেখ নিরঞ্জন! নিরঞ্জন বলিয়া কাঁদিতেছেন। তাঁহার কান্না দেখিয়া ও কাতর স্বর শুনিয়া, কাছে দণ্ডায়মান ভক্তেরা কাঁদিতেছেন। তিনি কাঁদিতেছেন, আর বলিতেছেন, ‘নিরঞ্জন! আয় বাপ—খারে নেরে—কবে তোরে খাইয়ে জন্ম সফল করব! তুই আমার জন্য দেহধারণ করে নররূপে এসেছিস।’

    জগন্নাথের কাছে আর্তি করিতেছেন (Kathamrita)—জগন্নাথ! জগবন্ধু! দীনবন্ধু! আমি তো জগৎছাড়া নই নাথ, আমায় দয়া কর!

    প্রেমোন্মত্ত হইয়া গাহিতেছেন—“উড়িষ্যা জগন্নাথ ভজ বিরাজ জী!”

    এইবার নারায়ণের নামকীর্তন করিতে করিতে নাচিতেছেন ও গাহিতেছেন—শ্রীমন্নারায়ণ! শ্রীমন্নারায়ণ! নারায়ণ! নারায়ণ!

    নাচিতে নাচিতে আবার গান গাইতেছেন (Kathamrita):

    হলাম যার জন্য পাগল, তারে কই পেলাম সই।
    ব্রহ্মা পাগল, বিষ্ণু পাগল, আর পাগল শিব,
    তিন পাগলে যুক্তি করে ভাঙলে নবদ্বীপ
    আর এক পাগল দেখে এলাম বৃন্দাবনের মাঠে,
    রাইকে রাজা সাজায়ে আপনি কোটাল সাজে!

  • Ramakrishna 521: “তুমি সর্বঘটে অর্ঘপুটে, সাকার আকার নিরাকারা, তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা”

    Ramakrishna 521: “তুমি সর্বঘটে অর্ঘপুটে, সাকার আকার নিরাকারা, তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা”

    ৪৯ শ্রীশ্রীরথযাত্রা বলরাম-মন্দিরে

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১৪ই জুলাই

    নরেন্দ্রের গান—ঠাকুরের ভাবাবেশে নৃত্য

    রথাগ্রে কীর্তন ও নৃত্যের পর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) ঘরে আসিয়া বসিয়াছেন। মণি প্রভৃতি ভক্তেরা তাঁহার পদসেবা করিতেছেন।

    নরেন্দ্র ভাবে পূর্ণ হইয়া তানপুরা লইয়া আবার গান গাহিতেছেন:

    (১)     এসো মা এসো মা, ও হৃদয়-রমা, পরাণ-পুতলী গো,
    হৃদয়-আসনে, হও মা আসীন, নিরখি তোমারে গো।

    (২)     মা ত্বং হি তারা, তুমি ত্রিগুণধরা পরাৎপরা।
    আমি জানি গো ও দীন-দয়াময়ী, তুমি দুর্গমেতে দুখহারা ॥
    তুমি সন্ধ্যা তুমি গায়ত্রী, তুমি জগদ্ধাত্রী গো মা।
    তুমি অকূলের ত্রাণকর্ত্রী, সদাশিবের মনোরমা ॥
    তুমি জলে, তুমি স্থলে, তুমি আদ্যমূলে গো মা।
    তুমি সর্বঘটে অর্ঘপুটে, সাকার আকার নিরাকারা ॥

    (৩)     তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা।
    এ-সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা ॥

    একজন ভক্ত নরেন্দ্রকে বলিতেছেন, তুমি ওই গানটা গাইবে?—

    অন্তরে জাগিছো গো মা অন্তরযামিনী!

    শ্রীরামকৃষ্ণ — দূর! এখন ও-সব গান কি! এখন আনন্দের গান — ‘শ্যামা সুধা-তরঙ্গিণী।’

    নরেন্দ্র গাইতেছেন:

    কখন কি রঙ্গে থাক মা, শ্যামা, সুধা-তরঙ্গিনী!
    তুমি রঙ্গে ভঙ্গে অপাঙ্গে অনঙ্গে ভঙ্গ দাও জননী ॥

    ভাবোন্মত্ত হইয়া নরেন্দ্র বারবার গাইতে লাগিলেন (Kathamrita):

    কভু কমলে কমলে থাকো মা পূর্ণব্রহ্মসনাতনী।

    ঠাকুর প্রেমোন্মত্ত হইয়া নৃত্য করিতেছেন, — ও গাইতেছেন, ওমা পূর্ণব্রহ্মসনাতনী! অনেকক্ষণ নৃত্যের পর ঠাকুর আবার আসন গ্রহণ করিলেন। নরেন্দ্র ভাবাবিষ্ট হইয়া সাশ্রুনয়নে গান গাহিতেছেন দেখিয়া ঠাকুর অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন।

    রাত্রি প্রায় নয়টা হইবে, এখনও ভক্তসঙ্গে ঠাকুর বসিয়া আছেন।

    আবার বৈষ্ণবচরণের গান শুনিতেছেন।

    (১)     শ্রীগৌরাঙ্গ সুন্দর নটবর তপত কাঞ্চন কায়।

    (২)     চিনিব কেমনে হে তোমায় (হরি)।
    ওহে বঙ্কুরায়, ভুলে আছ মথুরায় ॥
    হাতিচড়া জোড়াপরা, ভুলেছ কি ধেনুচরা
    ব্রজের মাখন চুরি করা, মনে কিছু হয়।

    রাত্রি দশটা-এগারটা। ভক্তেরা প্রণাম করিয়া বিদায় লইতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—আচ্ছা, আর সব্বাই বাড়ি যাও—(নরেন্দ্র ও ছোট নরেনকে দেখাইয়া) এরা দুইজন থাকলেই হল! (গিরিশের প্রতি) তুমি কি বাড়ি গিয়ে খাবে? থাকো তো খানিক থাক। তামাক্‌! — ওহ বলরামের চাকরও তেমনি। ডেকে দেখ না—দেবে না। (সকলের হাস্য) কিন্তু তুমি তামাক খেয়ে যেও।

    শ্রীযুক্ত গিরিশের সঙ্গে একটি চশমাপরা বন্ধু আসিয়াছেন। তিনি সমস্ত দেখিয়া শুনিয়া চলিয়া গেলেন। ঠাকুর গিরিশকে বলিতেছেন, — “তোমাকে আর হরে প্যালাকে বলি, জোর করে কারুকে নিয়ে এসো না,—সময় না হলে হয় না।”

    একটি ভক্ত প্রণাম করিলেন। সঙ্গে একটি ছেলে। ঠাকুর সস্নেহে কহিতেছেন (Kathamrita)— “তবে তুমি এসো—আবার উটি সঙ্গে।” নরেন্দ্র, ছোট নরেন, আর দু-একটি ভক্ত, আর একটু থাকিয়া বাটী ফিরিলেন।

  • Ramakrishna 520: “রথের রজ্জু ধরিয়া একটু টানিলেন—তৎপরে রথাগ্রে ভক্তসঙ্গে নৃত্য ও কীর্তন করিতেছেন”

    Ramakrishna 520: “রথের রজ্জু ধরিয়া একটু টানিলেন—তৎপরে রথাগ্রে ভক্তসঙ্গে নৃত্য ও কীর্তন করিতেছেন”

    ৪৯ শ্রীশ্রীরথযাত্রা বলরাম-মন্দিরে

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১৪ই জুলাই
    বলরামের রথযাত্রা—নরেন্দ্রাদি ভক্তসঙ্গে সংকীর্তনানন্দে

     

    ভক্তেরা বাটী হইতে আহারাদি করিয়া ক্রমে ক্রমে আসিতেছেন।

    মহেন্দ্র মুখুজ্জেকে দূর হইতে প্রণাম করিতে দেখিয়া ঠাকুর তাঁহাকে প্রণাম করিতেছেন — আবার সেলাম করিতেছেন। কাছের রকটি ছোকরা ভক্তকে বলিতেছেন, ওকে বল্‌না ‘সেলাম করলে’,—ও বড় অলকট্‌ অলকট্‌ করে। (সকলের হাস্য) গৃহস্থ ভক্তেরা অনেকে নিজেদের বাটীর পরিবারদের আনিয়াছেন;—তাঁহারা শ্রীশ্রীঠাকুরকে দর্শন করিবেন ও রথের সম্মুখে কীর্তনানন্দ দেখিবেন (Kathamrita)। রাম, গিরিশ প্রভৃতি ভক্তেরা ক্রমে ক্রমে আসিয়াছেন। ছোকরা ভক্তেরা অনেকে আসিয়াছেন।

    এইবার নরেন্দ্র গান (Ramakrishna) গাইতেছেন:

    (১)     কত দিনে হবে সে প্রেম সঞ্চার।
    হয়ে পূর্ণকাম বলব হরিনাম,
    নয়নে বহিবে প্রেম-অশ্রুধার ॥

    (২)     নিবিড় আঁধারে মা তোর চমকে ও রূপরাশি।
    তাই যোগী ধ্যান ধরে হয়ে গিরিগুহাবাসী ॥

    বলরাম আজ কীর্তনের বন্দোবস্ত করিয়াছেন,—বৈষ্ণবচরণ ও বেনোয়ারীর কীর্তন। এইবার বৈষ্ণবচরণ গাহিতেছেন—শ্রীদুর্গানাম জপ সদা রসনা আমার। দুর্গমে শ্রীদুর্গা বিনে (Kathamrita) কে করে নিস্তার।

    গান একটু শুনিতে শুনিতে ঠাকুর সমাধিস্থ! দাঁড়াইয়া সমাধিস্থ!—ছোট নরেন ধরিয়া আছেন। সহাস্যবদন। ক্রমে সব স্থির! একঘর ভক্তেরা অবাক্‌ হইয়া দেখিতেছেন। মেয়ে ভক্তেরা চিকের মধ্য হইতে দেখিতেছেন। সাক্ষাৎ নারায়ণ বুঝি দেহধারণ করিয়া ভক্তের জন্য আসিয়াছেন। কি করে ঈশ্বরকে ভালবাসতে হয়, তাই বুঝি শিখাতে এসেছেন!

    নাম করিতে করিতে অনেকক্ষণ পরে সমাধিভঙ্গ হইল। ঠাকুর আসন গ্রহণ করিলে বৈষ্ণবচরণ আবার গান ধরিলেন:

    (১)     হরি হরি বল রে বীণে!

    (২)     বিফলে দিন যায় রে বীণে, শ্রীহরির সাধন বিনে।

    এইবার আর এক কীর্তনীয়া, বেনোয়ারী, রূপ গাহিতেছেন। কিন্তু সদাই গান গাহিতে ‘আহা! আহা!’ বলিয়া ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করেন। তাহাতে শ্রোতারা কেহ হাসে, কেহ বিরক্ত হয়।

    অপরাহ্ন হইয়াছে। ইতিমধ্যে বারান্দায় শ্রীশ্রীজগন্নাথের সেই ছোট রথখানি ধ্বজা পতাকা দিয়া সুসজ্জিত করিয়া আনা হইয়াছে। শ্রীশ্রীজগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম চন্দনচর্চিত ও বসন-ভূষণ ও পুষ্পমালা দ্বারা সুশোভিত হইয়াছেন। ঠাকুর বেনোয়ারীর কীর্তন ফেলিয়া বারান্দায় রথাগ্রে গমন করিলেন,—ভক্তেরাও সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন। রথের রজ্জু ধরিয়া একটু টানিলেন—তৎপরে রথাগ্রে ভক্তসঙ্গে নৃত্য ও কীর্তন করিতেছেন। অন্যান্য গানের সঙ্গে ঠাকুর পদ ধরিলেন:

    যাদের হরি বলতে নয়ন ঝরে, তারা তারা দুভাই এসেছে রে!
    যারা মার খেয়ে প্রেম যাচে, তারা তারা দুভাই এসেছে রে!
    আবার — নদে টলমল টলমল করে, গৌরপ্রেমে হিল্লোলে রে।

    ছোট বারান্দাতে রথের সঙ্গে সঙ্গে কীর্তন ও নৃত্য হইতেছে। উচ্চ সংকীর্তন ও খোলের শব্দ শুনিয়া বাহিরের লোক অনেকে বারান্দা মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে। ঠাকুর হরিপ্রেমে মাতোয়ারা (Ramakrishna) । ভক্তেরাও সঙ্গে সঙ্গে প্রেমোন্মত্ত হইয়া নাচিতেছেন।

  • Ramakrishna 519: “চীনের পুতুল দোকানে চিঠি হাতে করে যায় শুনেছ! ঈশ্বরই কর্তা! আপনাকে অকর্তা জেনে কর্তার ন্যায় কাজ করো”

    Ramakrishna 519: “চীনের পুতুল দোকানে চিঠি হাতে করে যায় শুনেছ! ঈশ্বরই কর্তা! আপনাকে অকর্তা জেনে কর্তার ন্যায় কাজ করো”

    ৪৯ শ্রীশ্রীরথযাত্রা বলরাম-মন্দিরে

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১৪ই জুলাই
    বলরামের রথযাত্রা—নরেন্দ্রাদি ভক্তসঙ্গে সংকীর্তনানন্দে

    বেলা ১টা হইয়াছে। ঠাকুর আহারান্তে আবার বৈঠকখানা গরে আসিয়া ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন। একটি ভক্ত পূর্ণকে ডাকিয়া আনিয়াছেন। ঠাকুর মহানন্দে মাস্টারকে বলিতেছেন, “এই গো! পূর্ণ এসেছে।” নরেন্দ্র (Ramakrishna), ছোট নরেন, নারাণ, হরিপদ ও অন্যান্য ভক্তেরা কাছে বসিয়া আছেন ও ঠাকুরের সহিত কথা (Kathamrita) কহিতেছেন।

    স্বাধীন ইচ্ছা (ফ্রি উইল) ও ছোট নরেন—নরেন্দ্রের গান

    ছোট নরেন—আচ্ছা, আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা (ফ্রি উইল) আছে কি না?

    শ্রীরামকৃষ্ণ — আমি কে খোঁজ দেখি। আমি খুঁজতে খুঁজতে তিনি বেরিয়ে পড়েন! ‘আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী’। চীনের পুতুল দোকানে চিঠি হাতে করে যায় শুনেছ! ঈশ্বরই কর্তা! আপনাকে অকর্তা জেনে কর্তার ন্যায় কাজ করো।

    “যতক্ষণ উপাধি, ততক্ষণ অজ্ঞান; আমি পণ্ডিত, আমি জ্ঞানী, আমি ধনী, আমি মানী; আমি কর্তা বাবা গুরু — এ-সব অজ্ঞান থেকে হয়। ‘আমি যন্ত্র, তুমি যন্ত্রী’—এই জ্ঞান। অন্য সব উপাধি চলে গেল। কাঠ পোড়া শেষ হলে আর শব্দ থাকে না—উত্তাপও থাকে না। সব ঠাণ্ডা! — শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ!

    (নরেন্দ্রকে)—“একটু গা না।”

    নরেন্দ্র—ঘরে যাই—অনেক কাজ আছে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ(Ramakrishna)—তা বাছা, আমাদের কথা শুনবে কেন? ‘যার আছে কানে সোনা, তার কথা আনা আনা। যার আছে পোঁদে ট্যানা তার কথা কেউ শোনে না!’ (সকলের হাস্য)

    তুমি গুহদের বাগান যেতে পারো। প্রায় শুনি, আজ কোথায়, না গুহদের বাগানে! — এ কথা বলতুম না, তুই কেঁড়েলি করলি—”

    নরেন্দ্র কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া আছেন। বলছেন, “যন্ত্র নাই শুধু গান—”

    শ্রীরামকৃষ্ণ—আমাদের বাছা যেমন অবস্থা—এইতে পার তো গাও। তাতে বলরামের বন্দোবস্ত!

    “বলরাম বলে (Kathamrita), ‘আপনি নৌকা করে আসবেন, একান্ত না হয় গাড়ি করে আসবেন’,-(সকলের হাস্য) খ্যাঁট দিয়েছে। আজ তাই বৈকালে নাচিয়ে নেবে (হাস্য)। একান থেকে একদিন গাড়ি করে দিছলো—বারো আনা ভাড়া;—আমি বললাম, বার আনায় দক্ষিণেশ্বরে যাবে? তা বলে, ‘ও অমন হয়।’ গাড়ি রাস্তায় যেতে যেতে একধার ভেঙে পড়ে গেল — (সকলের উচ্চ হাস্য)। আবার ঘোড়া মাঝে মাঝে একেবারে থেমে যায়। কোন মতে চলে না; গাড়োয়ান এক-একবার খুব মারে, আর এক-একবার দৌড়ায়! (উচ্চ হাস্য) তারপর রাম খোল বাজাবে—আর আমরা নাচব—রামের তালবোধ নাই। (সকলের হাস্য) বলরামের ভাব, আপনারা গাও, নাচো, আনন্দ করো। (সকলের হাস্য)

  • Ramakrishna 518: “যাদের হরি বলতে নয়ন ঝরে, তারা তারা দুভাই এসেছে রে! বিফলে দিন যায় রে বীণে, শ্রীহরির সাধন বিনে”

    Ramakrishna 518: “যাদের হরি বলতে নয়ন ঝরে, তারা তারা দুভাই এসেছে রে! বিফলে দিন যায় রে বীণে, শ্রীহরির সাধন বিনে”

    ৪৯ শ্রীশ্রীরথযাত্রা বলরাম-মন্দিরে

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১৪ই জুলাই
    বলরামের রথযাত্রা—নরেন্দ্রাদি ভক্তসঙ্গে সংকীর্তনানন্দে

    মহেন্দ্র মুখুজ্জেকে দূর হইতে প্রণাম করিতে দেখিয়া ঠাকুর (Ramakrishna) তাঁহাকে প্রণাম করিতেছেন—আবার সেলাম করিতেছেন। কাছের রকটি ছোকরা ভক্তকে বলিতেছেন, ওকে বল্‌না ‘সেলাম করলে’,—ও বড় অলকট্‌ অলকট্‌ করে। (সকলের হাস্য) গৃহস্থ ভক্তেরা অনেকে নিজেদের বাটীর পরিবারদের আনিয়াছেন;—তাঁহারা শ্রীশ্রীঠাকুরকে দর্শন করিবেন ও রথের সম্মুখে কীর্তনানন্দ দেখিবেন (Kathamrita)। রাম, গিরিশ প্রভৃতি ভক্তেরা ক্রমে ক্রমে আসিয়াছেন। ছোকরা ভক্তেরা অনেকে আসিয়াছেন।

    এইবার নরেন্দ্র গান গাইতেছেন:

    (১)     কত দিনে হবে সে প্রেম সঞ্চার।
    হয়ে পূর্ণকাম বলব হরিনাম,
    নয়নে বহিবে প্রেম-অশ্রুধার ॥

    (২)     নিবিড় আঁধারে মা তোর চমকে ও রূপরাশি।
    তাই যোগী ধ্যান ধরে হয়ে গিরিগুহাবাসী ॥

    বলরাম আজ কীর্তনের বন্দোবস্ত করিয়াছেন,—বৈষ্ণবচরণ ও বেনোয়ারীর কীর্তন। এইবার বৈষ্ণবচরণ গাহিতেছেন—শ্রীদুর্গানাম জপ সদা রসনা আমার। দুর্গমে শ্রীদুর্গা বিনে কে করে নিস্তার।

    গান একটু শুনিতে শুনিতে ঠাকুর সমাধিস্থ! দাঁড়াইয়া সমাধিস্থ!—ছোট নরেন ধরিয়া আছেন। সহাস্যবদন। ক্রমে সব স্থির! একঘর ভক্তেরা অবাক্‌ হইয়া দেখিতেছেন। মেয়ে ভক্তেরা চিকের মধ্য হইতে দেখিতেছেন। সাক্ষাৎ নারায়ণ বুঝি দেহধারণ করিয়া ভক্তের জন্য আসিয়াছেন। কি করে ঈশ্বরকে ভালবাসতে হয়, তাই বুঝি শিখাতে এসেছেন!

    নাম করিতে করিতে অনেকক্ষণ পরে সমাধিভঙ্গ হইল। ঠাকুর আসন গ্রহণ করিলে বৈষ্ণবচরণ আবার গান ধরিলেন:

    (১)     হরি হরি বল রে বীণে!

    (২)     বিফলে দিন যায় রে বীণে, শ্রীহরির সাধন বিনে।

    এইবার আর এক কীর্তনীয়া, বেনোয়ারী, রূপ গাহিতেছেন (Ramakrishna)। কিন্তু সদাই গান গাহিতে ‘আহা! আহা!’ বলিয়া ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করেন। তাহাতে শ্রোতারা কেহ হাসে, কেহ বিরক্ত হয়।

    অপরাহ্ন হইয়াছে। ইতিমধ্যে বারান্দায় শ্রীশ্রীজগন্নাথের সেই ছোট রথখানি ধ্বজা পতাকা দিয়া সুসজ্জিত করিয়া আনা হইয়াছে। শ্রীশ্রীজগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম চন্দনচর্চিত ও বসন-ভূষণ ও পুষ্পমালা দ্বারা সুশোভিত হইয়াছেন। ঠাকুর বেনোয়ারীর কীর্তন ফেলিয়া বারান্দায় রথাগ্রে গমন করিলেন,—ভক্তেরাও সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন। রথের রজ্জু ধরিয়া একটু টানিলেন—তৎপরে রথাগ্রে ভক্তসঙ্গে নৃত্য ও কীর্তন করিতেছেন। অন্যান্য গানের সঙ্গে ঠাকুর পদ ধরিলেন(Kathamrita):

    যাদের হরি বলতে নয়ন ঝরে, তারা তারা দুভাই এসেছে রে!
    যারা মার খেয়ে প্রেম যাচে, তারা তারা দুভাই এসেছে রে!
    আবার — নদে টলমল টলমল করে, গৌরপ্রেমে হিল্লোলে রে।

    ছোট বারান্দাতে রথের সঙ্গে সঙ্গে কীর্তন ও নৃত্য হইতেছে। উচ্চ সংকীর্তন ও খোলের শব্দ শুনিয়া বাহিরের লোক অনেকে বারান্দা মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে। ঠাকুর হরিপ্রেমে মাতোয়ারা। ভক্তেরাও সঙ্গে সঙ্গে প্রেমোন্মত্ত হইয়া নাচিতেছেন।

  • Ramakrishna 517: “আমি পণ্ডিত, আমি জ্ঞানী, আমি ধনী, আমি মানী; আমি কর্তা বাবা গুরু—এ-সব অজ্ঞান থেকে হয়”

    Ramakrishna 517: “আমি পণ্ডিত, আমি জ্ঞানী, আমি ধনী, আমি মানী; আমি কর্তা বাবা গুরু—এ-সব অজ্ঞান থেকে হয়”

    ৪৯ শ্রীশ্রীরথযাত্রা বলরাম-মন্দিরে

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১৪ই জুলাই
    বলরামের রথযাত্রা—নরেন্দ্রাদি ভক্তসঙ্গে সংকীর্তনানন্দে

    বেলা ১টা হইয়াছে। ঠাকুর আহারান্তে আবার বৈঠকখানা গরে আসিয়া ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন। একটি ভক্ত পূর্ণকে ডাকিয়া আনিয়াছেন। ঠাকুর মহানন্দে মাস্টারকে বলিতেছেন, “এই গো! পূর্ণ এসেছে।” নরেন্দ্র, ছোট নরেন, নারাণ, হরিপদ ও অন্যান্য ভক্তেরা কাছে বসিয়া আছেন ও ঠাকুরের (Ramakrishna) সহিত কথা কহিতেছেন (Kathamrita)।

    স্বাধীন ইচ্ছা (ফ্রি উইল) ও ছোট নরেন—নরেন্দ্রের গান

    ছোট নরেন — আচ্ছা, আমাদের স্বাধীন ইচ্ছা (ফ্রি উইল) আছে কি না?

    শ্রীরামকৃষ্ণ—আমি কে খোঁজ দেখি। আমি খুঁজতে খুঁজতে তিনি বেরিয়ে পড়েন! ‘আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী’। চীনের পুতুল দোকানে চিঠি হাতে করে যায় শুনেছ! ঈশ্বরই কর্তা! আপনাকে অকর্তা জেনে কর্তার ন্যায় কাজ করো।

    “যতক্ষণ উপাধি, ততক্ষণ অজ্ঞান; আমি পণ্ডিত, আমি জ্ঞানী, আমি ধনী, আমি মানী; আমি কর্তা বাবা গুরু—এ-সব অজ্ঞান থেকে হয়। ‘আমি যন্ত্র, তুমি যন্ত্রী’—এই জ্ঞান। অন্য সব উপাধি চলে গেল। কাঠ পোড়া শেষ হলে আর শব্দ থাকে না—উত্তাপও থাকে না। সব ঠাণ্ডা! — শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ!

    (নরেন্দ্রকে)— “একটু গা না।”

    নরেন্দ্র—ঘরে যাই—অনেক কাজ আছে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) —তা বাছা, আমাদের কথা শুনবে কেন? ‘যার আছে কানে সোনা, তার কথা আনা আনা। যার আছে পোঁদে ট্যানা তার কথা কেউ শোনে না!’ (সকলের হাস্য)

    তুমি গুহদের বাগান যেতে পারো। প্রায় শুনি, আজ কোথায়, না গুহদের বাগানে! — এ কথা বলতুম না, তুই কেঁড়েলি করলি —”

    নরেন্দ্র কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া আছেন। বলছেন, “যন্ত্র নাই শুধু গান —”

    শ্রীরামকৃষ্ণ—আমাদের বাছা (Kathamrita) যেমন অবস্থা—এইতে পার তো গাও। তাতে বলরামের বন্দোবস্ত!

    “বলরাম বলে, ‘আপনি নৌকা করে আসবেন, একান্ত না হয় গাড়ি করে আসবেন’, — (সকলের হাস্য) খ্যাঁট দিয়েছে। আজ তাই বৈকালে নাচিয়ে নেবে (হাস্য)। একান থেকে একদিন গাড়ি করে দিছলো— বারো আনা ভাড়া;—আমি বললাম, বার আনায় দক্ষিণেশ্বরে যাবে? তা বলে, ‘ও অমন হয়।’ গাড়ি রাস্তায় যেতে যেতে একধার ভেঙে পড়ে গেল— (সকলের উচ্চ হাস্য)। আবার ঘোড়া মাঝে মাঝে একেবারে থেমে যায়। কোন মতে চলে না; গাড়োয়ান এক-একবার খুব মারে, আর এক-একবার দৌড়ায়! (উচ্চ হাস্য) তারপর রাম খোল বাজাবে — আর আমরা নাচব— রামের তালবোধ নাই। (সকলের হাস্য) বলরামের (Ramakrishna) ভাব, আপনারা গাও, নাচো, আনন্দ করো। (সকলের হাস্য)

    ভক্তেরা বাটী হইতে আহারাদি করিয়া ক্রমে ক্রমে আসিতেছেন।

  • Ramakrishna 516: “মেয়েভক্তদের গোপাল ভাব—‘বাৎসল্য ভাব’ বেশি ভাল নয়, ওই ‘বাৎসল্য’ থেকেই আবার একদিন ‘তাচ্ছল্য’ হয়”

    Ramakrishna 516: “মেয়েভক্তদের গোপাল ভাব—‘বাৎসল্য ভাব’ বেশি ভাল নয়, ওই ‘বাৎসল্য’ থেকেই আবার একদিন ‘তাচ্ছল্য’ হয়”

    ৪৯ শ্রীশ্রীরথযাত্রা বলরাম-মন্দিরে

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১৪ই জুলাই
    পূর্বকথা—৺কাশীধামে শিব ও সোনার অন্নপূর্ণাদর্শন—
    অদ্য ব্রহ্মাণ্ডকে শালগ্রাম রূপে দর্শন

    শ্রীরামকৃষ্ণ (সারদার প্রতি)—দক্ষিণেশ্বরে যাস না কেন? কলিকাতায় যখন আসি, তখন আসিস না কেন?

    সারদা—আমি খবর পাই না।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Kathamrita) — এইবার তোকে খবর দিব। (মাস্টারকে সহাস্যে) একখানা ফর্দ করো তো—ছোকরাদের। (মাস্টার ও ভক্তদের হাস্য)

    পূর্ণের সংবাদ—নরেন্দ্রদর্শনে ঠাকুরের আনন্দ

    সারদা—বাড়িতে বিয়ে দিতে চায়। ইনি (মাস্টার) বিয়ের কথায় আমাদের কতবার বকেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—এখন বিয়ে কেন? (মাস্টারের প্রতি) সারদার বেশ অবস্থা হয়েছে। আগে সঙ্কোচ ভাব ছিল। যেন ছিপের ফাতা টেনে নিত। এখন মুখে আনন্দ এসেছে।

    ঠাকুর একজন ভক্তকে বলিতেছেন, “তুমি একবার পূর্ণর জন্য যাবে?”

    এইবার নরেন্দ্র আসিয়াছেন। ঠাকুর নরেন্দ্রকে জল খাওয়াইতে বলিলেন। নরেন্দ্রকে দেখিয়া বড়ই আনন্দিত হইয়াছেন। নরেন্দ্রকে খাওয়াইয়া যেন সাক্ষাৎ নারায়ণের সেবা করিতেছেন। গায়ে হাত বুলাইয়া আদর করিতেছেন, যেন সূক্ষ্মভাবে হাত-পা টিপিতেছেন! গোপালের মা (‘কামারহাটির বামনী’) ঘরের মধ্যে আসিলেন। ঠাকুর বলরামকে কামারহাটিতে লোক পাঠাইয়া গোপালের মাকে আনিতে বলিয়াছিলেন। তাই তিনি আসিয়াছেন। গোপালের মা ঘরের মধ্যে আসিয়াই বলিতেছেন, “আমার আনন্দে চক্ষে জল পড়ছে।” এই বলিয়া ঠাকুরকে ভূমিষ্ঠ হইয়া নমস্কার করিলেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — সে কি গো। এই তুমি আমাকে গোপাল বল—আবার নমস্কার!

    “যাও, বাড়ির ভিতর গিয়ে একটি বেন্নন রাঁধ গে-খুব ফোড়ন দিও — যেন এখানে পর্যন্ত গন্ধ আসে।” (সকলের হাস্য)

    গোপালের মা—এঁরা (বাড়ির লোকেরা) কি মনে করবে?

    গোপালের মা কি ভাবিতেছেন যে, এখানে নূতন এসেছি,—যদি আলাদা রাঁধব বলে বাড়ির লোকেরা কিছু মনে করে!

    বাড়ির ভিতর যাইবার আগে তিনি নরেন্দ্রকে সম্বোধন করিয়া কাতরস্বরে বলিতেছেন (kathamrit), “বাবা! আমার কি হয়েছে; না বাকী আছে?”

    আজ রথযাত্রা—শ্রীশ্রীজগন্নাথের ভোগরাগাদি হইতে একটু দেরি হইয়াছে। এইবার ঠাকুর সেবা হইবে। অন্তঃপুরে যাইতেছেন। মেয়ে ভক্তেরা ব্যাকুল হইয়া আছেন,—তাঁহাকে দর্শন ও প্রণাম করিবেন।

    ঠাকুরের অনেক স্ত্রীলোক ভক্ত ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁহাদের কথা পুরুষ ভক্তদের কাছে বেশী বলিতেন না। কেহ মেয়ে ভক্তদের কাছে যাতায়াত করিলে, বলিতেন, ‘বেশী যাস নাই; পড়ে যাবি!’ কখন কখন বলিতেন, ‘যদি স্ত্রীলোক ভক্তিতে গড়াগড়ি যায়, তবুও তার কাছে যাতায়াত করবে না।’ মেয়েভক্তেরা আলাদা থাকবে—পুরুষ-ভক্তেরা আলাদা থাকবে। তবেই উভয়ের মঙ্গল। আবার বলিতেন, “মেয়েভক্তদের গোপাল ভাব—‘বাৎসল্য ভাব’ বেশি ভাল নয়। ওই ‘বাৎসল্য’ থেকেই আবার একদিন ‘তাচ্ছল্য’ হয়।”

  • Ramakrishna 515: “সুলক্ষণ শালগ্রাম,—বেশ চক্র থাকবে,—গোমুখী…আর সব লক্ষণ থাকবে—তাহলে ভগবানের পূজা হয়”

    Ramakrishna 515: “সুলক্ষণ শালগ্রাম,—বেশ চক্র থাকবে,—গোমুখী…আর সব লক্ষণ থাকবে—তাহলে ভগবানের পূজা হয়”

    ৪৯ শ্রীশ্রীরথযাত্রা বলরাম-মন্দিরে

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১৪ই জুলাই
    পূর্বকথা—৺কাশীধামে শিব ও সোনার অন্নপূর্ণাদর্শন—
    অদ্য ব্রহ্মাণ্ডকে শালগ্রাম রূপে দর্শন

    বেলা দশটা বাজিয়াছে। ঠাকুর (Ramakrishna) ভক্তসঙ্গে কথা কহিতেছেন। মাস্টার গঙ্গাস্নান করিয়া আসিয়া ঠাকুরকে প্রণাম করিলেন ও কাছে বসিলেন।

    ঠাকুর ভাবে পূর্ণ হইয়া কত কথাই বলিতেছেন। মাঝে মাঝে অতি গুহ্য দর্শনকথা একটু একটু বলিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—সেজোবাবুর সঙ্গে যখন কাশী গিয়েছিলাম, মণিকর্ণিকার ঘাটের কাছ দিয়ে আমাদের নৌকা যাচ্ছিল। হঠাৎ শিবদর্শন। আমি নৌকার ধারে এসে দাঁড়িয়ে সমাধিস্থ। মাঝিরা হৃদেকে বলতে লাগল — ‘ধর! ধর!’ পাছে পড়ে যাই। যেন জগতের যত গম্ভীর নিয়ে সেই ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রথমে দেখলাম দূরে দাঁড়িয়ে তারপর কাছে আসতে দেখলাম (Kathamrita), তারপর আমার ভিতরে মিলিয়ে গেলেন!

    “ভাবে দেখলাম, সন্ন্যাসী হাতে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। একটি ঠাকুরবাড়িতে ঢুকলাম — সোনার অন্নপূর্ণাদর্শন হল!

    “তিনিই এই সব হয়েছেন, — কোন কোন জিনিসে বেশি প্রকাশ।

    (মাস্টারাদির প্রতি)—“শালগ্রাম তোমরা বুঝি মান না—ইংলিশম্যানরা মানে না। তা তোমরা মানো আর নাই মানো। সুলক্ষণ শালগ্রাম,—বেশ চক্র থাকবে,—গোমুখী। আর সব লক্ষণ থাকবে—তাহলে ভগবানের পূজা হয়।”

    মাস্টার—আজ্ঞা, সুলক্ষণযুক্ত মানুষের ভিতর যেমন ঈশ্বরের বেশি প্রকাশ।

    শ্রীরামকৃষ্ণ(Ramakrishna) —নরেন্দ্র আগে মনের ভুল বলত, এখন সব মানছে।

    ঈশ্বরদর্শনের কথা বলিতে বলিতে ঠাকুরের ভাবাবস্থা হইয়াছে। ভাব-সমাধিস্থ। ভক্তেরা একদৃষ্টে চুপ করিয়া দেখিতেছেন। অনেকক্ষণ পরে ভাব সম্বরণ করিলেন ও কথা কহিতে লাগিলেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (মাস্টারের প্রতি) — কি দেখছিলাম। ব্রহ্মাণ্ড একটি শালগ্রাম। — তার ভিতর তোমার দুটো চক্ষু দেখছিলাম(Kathamrita)!

    মাস্টার ও ভক্তেরা এই অদ্ভুত, অশ্রুতপূর্ব দর্শনকথা অবাক্‌ হইয়া শুনিতেছেন। এই সময় আর-একটি ছোকরা ভক্ত, সারদা, প্রবেশ করিলেন ও ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া উপবেশন করিলেন।

LinkedIn
Share