মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কলকাতার কসবার ব্যবসায়ী বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে ‘সোনা পাপ্পু’-কে আগামী ২৮ মে পর্যন্ত ইডি হেফাজতের নির্দেশ দিল আদালত। সোমবার প্রায় ৯ ঘণ্টার দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে গ্রেফতার করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। মঙ্গলবার আদালতে পেশ করে তদন্তকারী সংস্থা দাবি করে, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ জমি দখল ও তোলাবাজি চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল সোনা পাপ্পু।
আদালতে ইডির বিস্ফোরক অভিযোগ
আদালতে ইডির আইনজীবী দাবি করেন, ভয় দেখিয়ে এবং প্রভাব খাটিয়ে কম দামে জমি ও সম্পত্তি দখল করাই ছিল সোনা পাপ্পুদের মূল কাজ। তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, এই চক্রে সোনা পাপ্পুর পাশাপাশি আরও দু’জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন— শান্তনু সিনহা বিশ্বাস এবং জয় কামদার।
ইডির দাবি—
- ● পুলিশের এফআইআর এবং ইসিআইআর— দুই ক্ষেত্রেই বিশ্বজিৎ পোদ্দারের নাম রয়েছে
- ● তল্লাশিতে লাইসেন্সবিহীন অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে
- ● স্ত্রীর নামে অস্ত্র কেনার অভিযোগও উঠেছে
- ● অস্ত্র কেনার পর কাঁকুলিয়া রোড এলাকায় অশান্তির ঘটনাও ঘটে
ইডি আদালতে আরও জানায়, জোর করে জমি দখল করে বাজারমূল্যের অনেক কম দামে সম্পত্তি কিনে নেওয়া হত। তদন্তে উঠে এসেছে, প্রায় ৫ কোটি টাকার সম্পত্তি ১ কোটি টাকায় এবং কসবায় প্রায় ৭ কোটি টাকার সম্পত্তি মাত্র দেড় কোটি টাকায় কেনার অভিযোগ রয়েছে।
কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, সোনা পাপ্পু তদন্তে বারবার অসহযোগিতা করেছে। সমন পাঠানো হলেও হাজিরা এড়িয়ে যায় বলে অভিযোগ। ইডির তদন্তে উঠে এসেছে একাধিক সংস্থার মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের তথ্য।
তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী—
- ● এসপি কনস্ট্রাকশন নামে সংস্থায় জমা পড়ে প্রায় ১৫ কোটি টাকা
- ● হেভেন ভ্যালি নামে অন্য একটি সংস্থায় জমা পড়ে প্রায় ৬.৮৩ কোটি টাকা
- ● মোট ২১.৮৩ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য মিলেছে সোনা পাপ্পু ও তাঁর স্ত্রীর সংস্থাগুলিতে
- ● ৩০টিরও বেশি সংস্থা খোলা হয়েছিল টাকা ঘোরানোর উদ্দেশ্যে
ইডির দাবি, এসপি কনস্ট্রাকশন, কেপি কনস্ট্রাকশন, সুকৃতি ডেভলপার, একে কনস্ট্রাকশন-সহ একাধিক রিয়েল এস্টেট সংস্থার মাধ্যমে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় ছোট ও মাঝারি নির্মাণ ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করা হত বলে দাবি ইডির।
‘হ্যাভিচুয়াল অফেন্ডার’ আখ্যা ইডির
আদালতে ইডি সোনা পাপ্পুকে “হ্যাভিচুয়াল অফেন্ডার” বলে উল্লেখ করে। তদন্তকারী সংস্থা জানায়, ২০২২ সালের ২১ নভেম্বর ১৮ কাঠা জমির একটি সম্পত্তি মাত্র ১.২৯ কোটি টাকায় কেনা হয়, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৫.৪২ কোটি টাকা।
এছাড়া ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর কসবা এলাকায় ৩৬ ডেসিমেল জমি এবং ২০০০ বর্গফুট নির্মাণ-সহ একটি সম্পত্তি, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৭.৭৭ কোটি টাকা, সেটিও মাত্র ১.২০ কোটি টাকায় দখল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ইডির দাবি, সম্পত্তির মালিককে ভয় দেখিয়ে এই দখলদারি চালানো হয়েছিল।
বেআইনি নির্মাণ ও এলাকা দখলের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কসবা, ঢাকুরিয়া এবং রামলাল বাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছিলেন সোনা পাপ্পু। অভিযোগ রয়েছে, কলকাতা পুরনিগমের ৬৭ এবং ৯১ নম্বর ওয়ার্ডে বহু বেআইনি নির্মাণের পিছনে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।
স্থানীয়দের দাবি—
- ● প্রায় ৫০-৫৫টি বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ জমা পড়েছিল কলকাতা পুরনিগমে
- ● বিল্ডিং বিভাগের আধিকারিকরা বিষয়টি জানলেও ব্যবস্থা নিতে পারেননি
- ● তৎকালীন শাসকদলের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণেই প্রশাসনিক পদক্ষেপ হয়নি
- ● বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, ভোটের সময় বিরোধীদের ভয় দেখানো এবং এলাকা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও পালন করতেন সোনা পাপ্পু।
তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
সোশ্যাল মিডিয়ায় সোনা পাপ্পুর সঙ্গে তৃণমূলের একাধিক নেতার ছবি ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কসবার বিধায়ক জাভেদ খান এবং প্রাক্তন বিধায়ক তথা দক্ষিণ কলকাতা জেলা তৃণমূল সভাপতি দেবাশিস কুমারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁকে দেখা গিয়েছে বলে অভিযোগ। এছাড়াও কাউন্সিলর বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রীর উপস্থিতিতে সোনা পাপ্পুর পারিবারিক অনুষ্ঠানের ছবিও প্রকাশ্যে এসেছে।
‘তৃণমূলের ভোট ম্যানেজার’ সোনা পাপ্পু
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না, স্থানীয় মহলে সোনা পাপ্পুকে ‘তৃণমূলের ভোট ম্যানেজার’ বলেই পরিচিত করা হত বলে দাবি এলাকাবাসীর। অভিযোগ, জয় কামদার এবং শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের সঙ্গে জোট বেঁধে জমি দখল, বেআইনি নির্মাণ এবং তোলাবাজির নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি। বর্তমানে সেই সোনা পাপ্পুই ইডির জালে। তদন্তকারী সংস্থা এখন খতিয়ে দেখছে, এই চক্রের সঙ্গে আরও কারা যুক্ত ছিলেন এবং কোটি কোটি টাকার লেনদেনের উৎস কোথায়।
