মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পুজোর মুখে রাজ্যে ফিরে এল সেই ভাগাড়ের পচা মাংসের আতঙ্ক! খাদ্য সুরক্ষা দফতর, পুরসভা এবং এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের যৌথ অভিযানে পর পর অভিযানে মিলল চোখ কপালে ওঠা ছবির হদিশ। শুভেন্দু প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপেই ফাঁস হয়ে গেল পচা মাংসের রমরমা কারবারের পর্দা। তাতেই উঠে এল ভয়াবহ ছবি। কয়েকদিন আগে মহারাষ্ট্রেও এমন অভিযানে দেশজুড়ে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। এবার শুরু হয়ে গেল এরাজ্যেও। কলকাতা থেকে শুরু করে একাধিক জেলায় নামী রেস্তরাঁ, খাবারের (Food Safety Raids) দোকান ও মিষ্টির দোকানে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার হয়েছে কেজি কেজি পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত মাংস (Rotten Meat), মাছ, মেয়াদ উত্তীর্ণ পনির, আইসক্রিম ও ঠান্ডা পানীয়। কোথাও ফ্রিজে ঠাসা ছিল পুরনো মাংস-মাছ, কোথাও আবার খাবারে ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছিল হোলির রং। পর্যটনকেন্দ্র দিঘার একাধিক হোটেল ও রেস্তরাঁয় নিম্নমানের বিরিয়ানি বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। সব মিলিয়ে পুজোর আগে রাজ্যে খাবারের মান ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ল।
ভাগাড়ের মাংসকাণ্ড (Food Safety Raids)
২০১৮ সালে ভাগাড়ের মাংস কাণ্ডে কার্যত তোলপাড় হয়েছিল কলকাতা-সহ গোটা রাজ্য। অভিযোগ উঠেছিল, ভাগাড়ে পড়ে থাকা মৃত পশুর মাংস সংগ্রহ করে রাস্তার ধারের খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে-সহ বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হচ্ছিল। সেই মাংস দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে নানা রাসায়নিক ব্যবহার করা হত বলেও অভিযোগ সামনে এসেছিল। পরে ওই মাংস মাছের স্তূপের আড়ালে করে অন্য রাজ্যেও পাচার করার অভিযোগ ওঠে। বসিরহাটের বাদুড়িয়ায় এই চক্রের বড়সড় হদিশ মেলার পর রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছিল ধরপাকড় ও নজরদারি।
এবার ২০২৬ সালে পুজোর ঠিক আগে ফের সেই বাদুড়িয়াতেই উদ্ধার হল বিপুল পরিমাণ পচা মাংস ও মাছ। খাদ্য দফতর, পুরসভা এবং এনফোর্সমেন্ট শাখার যৌথ অভিযানে একটি নামী রেস্তরাঁ থেকে প্রায় ৪০ কেজি পচা মাংস উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে মুরগি ও খাসির মাংস ছিল বলে জানা গিয়েছে। বিপুল পরিমাণ পাঁঠার মাংস পচে যাওয়ার পরেও, তা ফ্রিজে মজুত করে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। ওই মাংস রান্না করে সাধারণ মানুষকে পরিবেশন করা হচ্ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট রেস্তরাঁ কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
কলকাতা থেকে মধ্যমগ্রাম, একই ছবি
শুধু বাদুড়িয়াতেই নয়, কলকাতা, সল্টলেক, মধ্যমগ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর এবং পূর্ব বর্ধমানের একাধিক নামী রেস্তরাঁতেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও ফ্রিজ খুলতেই তীব্র দুর্গন্ধ বেরিয়েছে। কোথাও মাংসে ছত্রাক ধরেছে। আবার কোনও কোনও জায়গায় দীর্ঘদিনের পুরনো চিংড়ি মাছ ফ্রিজে মজুত করে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
কলকাতার ট্যাংরার চায়না টাউনে চাইনিজ খাবারের জন্য প্রতিদিনই বহু মানুষ যাতায়াত করেন। সেই ট্যাংরার একটি পরিচিত রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫০০ কেজি মাছ-মাংস উদ্ধার করেছে কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য দফতর। উদ্ধার হওয়া কোনও প্যাকেটেই তারিখ উল্লেখ ছিল না বলে জানা গিয়েছে। পরে সেগুলি বাজেয়াপ্ত করে ধাপায় নিয়ে গিয়ে নষ্ট করে ফেলা হয়।
রেস্তরাঁটির মালিক অবশ্য দাবি করেছেন, মাংসগুলি দীর্ঘদিনের পুরনো নয়। তাঁর বক্তব্য, তাঁদের রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন প্রায় ৮০ কেজি মাংসের প্রয়োজন হয় এবং উদ্ধার হওয়া মজুত তিন দিনের মতো ছিল।
মধ্যমগ্রামে ফ্রিজ খুলতেই দুর্গন্ধ
উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের যশোর রোডের ধারে একটি শপিং মলের খাবারের জায়গায় খাদ্য দফতর, পুরসভা ও এনফোর্সমেন্ট শাখার যৌথ অভিযান চালানো হয়। সেখানে একটি নামী খাবারের দোকানের ফ্রিজ ও রান্নাঘরে ঢুকতেই খাদ্য দফতরের আধিকারিকদের নজরে আসে পচা মাংস এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার (Food Safety Raids)।
অভিযোগ, সেখানে ছত্রাক ধরা পচা মাংস, মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া খাবারের প্যাকেট এবং পানীয় জলের বোতল পাওয়া যায়। পরিস্থিতি দেখে ঘটনাস্থলেই সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হয়। আধিকারিকরা পৌঁছনোর পর কর্মীরা পচা খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সল্টলেকের তথ্যপ্রযুক্তি এলাকাতেও পচা মাংস
সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে একটি রেস্তরাঁয় অভিযান চালিয়েও মিলেছে পচা মাংস। আরডিবি ভবনের কাছে ওই রেস্তরাঁর সংরক্ষণাগারে কাঁচা মাংস ভর্তি ছিল। সেখান থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বেরোচ্ছিল বলে জানা গিয়েছে। খাবারের বিষয়ে কৈফিয়ৎ চাওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। এরপর তাঁর দোকানের লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া মাংসের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে আসার পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ করা হবে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর (Rotten Meat)।
দিঘায় বিরিয়ানি নিয়েও উঠল অভিযোগ
পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র দিঘাতেও খাবারের মান নিয়ে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রায় সারা বছরই এখানে হাজার হাজার পর্যটক আসেন। সেই দিঘার ২০টি হোটেল ও রেস্তরাঁয় অভিযান চালিয়ে নিম্নমানের বিরিয়ানি বিক্রির অভিযোগ পেয়েছে খাদ্য সুরক্ষা দফতর।
অভিযোগ, বিরিয়ানিতে খাবারের উপযোগী রঙের পরিবর্তে রাসায়নিক মেশানো বিষাক্ত রং ব্যবহার করা হচ্ছিল। অনেক ক্ষেত্রে বেশ কয়েক দিন আগে রান্না করা মাংস ফের গরম করে বিক্রি করা হচ্ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নন্দীগ্রাম স্বাস্থ্য জেলার খাদ্য সুরক্ষা দফতরের আধিকারিক বিশ্বজিৎ মান্না বলেন, “দিঘার ২০টি হোটেল-রেস্তরাঁয় অভিযান চালিয়ে ১৫টি থেকে খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে মান যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। ১২টি হোটেলকে আইনি নোটিশ ধরানো হয়েছে (Rotten Meat)।”
হুগলিতে মিষ্টিতে হোলির রং, বেকারিতে পোকা ধরা ময়দা
বাঙালির অন্যতম প্রিয় খাবার মিষ্টি নিয়েও এবার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হুগলির আরামবাগে কয়েকটি মিষ্টির দোকানে খাবারে ব্যবহারের জন্য রাখা রঙের মধ্যে হোলিতে খেলার রং পাওয়া গিয়েছে বলে অভিযোগ। যদিও দোকানদারদের দাবি, দোলের সময় ব্যবহারের পর ওই রঙের কৌটো রান্নাঘরে থেকে গিয়েছিল। মিষ্টি তৈরিতে সেই রং ব্যবহার করা হয় না বলেই তাঁদের দাবি।
আরামবাগের খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিক যদুনাথ হেমব্রম বলেন, “মিষ্টিতে রং মেশানো হচ্ছে। আর সেই রং হল হোলির রং। এই রং দিয়ে হোলি খেলা হয়। দোকানের তরফ থেকে দাবি করা হচ্ছে, হোলির সময় থেকে রঙের কৌটোটা কোনও ভাবে ওখানে রয়ে গিয়েছে। কিন্তু যেখানে মিষ্টি তৈরি হয়, সেই জায়গা থেকেই এই রং উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে সাজানো ছিল। অন্যান্য রঙের সঙ্গেই এই হোলির রংটা রাখা ছিল।”
হুগলির ভদ্রেশ্বরেও একটি বেকারিতে অভিযান চালিয়ে কেক, বিস্কুট ও পাউরুটি তৈরির উপকরণে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। পোকা ধরা ময়দা ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে (Rotten Meat)।
বর্ধমানে পচা মাংস, মেয়াদ উত্তীর্ণ পনির
পূর্ব বর্ধমানেও খাবারের মান নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। বর্ধমান শহরের কয়েকটি মিষ্টির দোকানে মেয়াদ উত্তীর্ণ পনির পাওয়া যায়। খাদ্য দফতরের আধিকারিকরা সেই পনির নষ্ট করে দেন। পাশাপাশি মেয়াদ উত্তীর্ণ আইসক্রিম ও ঠান্ডা পানীয়ও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে (Food Safety Raids)।
শুধু শহরেই নয়, বর্ধমানের শক্তিগড়ের বিখ্যাত ল্যাংচা এলাকাতেও অভিযান চালানো হয়। খাবারের গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
পুজোর আগে একের পর এক এমন ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, মানুষের খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি কতটা কার্যকর। বিশেষ করে উৎসবের মরসুমে রেস্তরাঁ ও খাবারের দোকানে ক্রেতার সংখ্যা যখন কয়েক গুণ বেড়ে যায়, তখন পচা, বাসি কিংবা মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার বিক্রির মতো অভিযোগ আরও উদ্বেগজনক। প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকলেও, পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর সাধারণ মানুষের (Rotten Meat)।
