মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দেশের নিরাপত্তায় শিলিগুড়ি করিডরের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই চিকেনস নেকের (Amit Shah on Chicken’s Neck) নিরাপত্তায় ত্রিকোণ সুরক্ষা গ্রিড বানিয়েছে ভারত সরকার। শুক্রবার শিলিগুড়ির রানিডাঙ্গায় সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি)-এর উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার হেডকোয়ার্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই কথা জানান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ৩ দিনের পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসেছেন তিনি। প্রথম দিন রয়েছেন শিলিগুড়িতে। সেখানে দাঁড়িয়েই বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার চিকেনস নেকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অনেক ব্যবস্থা নিচ্ছে, বলে বার্তা দেন শাহ। শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, প্রশাসনিক পরিকাঠামো থেকে দিল্লির সঙ্গে দ্রুত রেল যোগাযোগ, শিলিগুড়িকে ঘিরে একাধিক পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি ।
চিকেনস নেকের সুরক্ষায় ত্রি-কোণ গ্রিড
দেশের মানচিত্রে উত্তরবঙ্গ একটি সরু ফালি। অথচ কৌশলগত গুরুত্বে গোটা দেশের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ভারতীয় ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সেতু শিলিগুড়ি করিডর, ‘চিকেনস নেক’। শুক্রবার শিলিগুড়িতে এসে সেই করিডরের ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা নিয়েই বড় বার্তা দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি জানান ৮ রাজ্যকে যোগ করা অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা এটি। নেপাল, ভূটান এবং বাংলাদেশ সীমান্ত এর সঙ্গে জড়িত। এটা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার সঙ্গে জড়িত। তাঁর ঘোষণা, “শিলিগুড়ি করিডর সুরক্ষিত রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।” শাহ জানান, শিলিগুড়ি করিডর ও সমগ্র দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক একটি বিশেষ ‘ত্রিকোণীয় নিরাপত্তা গ্রিড’ তৈরি করেছে। চোপড়া, কিষাণগঞ্জ ও ধুবড়ি- এই তিন ঘাঁটি থেকে সমগ্র করিডরে নজরদারি, সামরিক উপস্থিতি ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই ক্রিকোণীয় সুরক্ষা গ্রিড চিকেন্স নেকের সিকিউরিটির দিক থেকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমেই পুরো এলাকার উপর কন্ট্রোল রাখা সম্ভব হচ্ছে। নিয়মিত ‘তিস্তা প্রহার’ এর মতো সামরিক অনুশীলনের মাধ্যমে এই অঞ্চলকে সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে।
মমতা-সরকারকে নিশানা
নিজের বক্তব্যের সময় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একাধিকবার আক্রমণ করেন অমিত শাহ। তিনি জানান, আগে একাধিকবার এই ধরনের অনুষ্ঠানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আসার জন্য অনুরোধ জানান হয়েছে। পালাবদলের পরে প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু এসেছেন জানিয়ে অমিত শাহ বলেন, ‘শুভেন্দুজি বলছিলেন, এই প্রথম কোনও মুখ্যমন্ত্রী এসএসবির অনুষ্ঠানে এলেন। কিন্তু আগেও আমন্ত্রণ জানানো হতো। তিনি আসতেন না।’ সীমান্ত পরিকাঠামো উন্নয়ন ও জমি সংক্রান্ত বিষয়ে অমিত শাহ পূর্বতন সরকারের সমালোচনা এবং বর্তমান সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
শুভেন্দু-সরকারের প্রশাংসা
শাহ মনে করিয়ে দেন, অনুপ্রবেশকারীদের আটকাতে সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া দরকার। কিন্তু সেই কাজটাই এত দিন আটকে ছিল জমি না পাওয়ার জন্য। তৃণমূল নেত্রীকে আক্রমণ শানিয়ে বলেন, ‘২০১৪ থেকে ১১২৯ একর জমি চাইছি। তাঁর হাতে-পায়ে ধরে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু জমি দেননি।’ অমিত শাহ সোজাসুজি বলে দিলেন, ‘এখন ফোন করলেই কাজ হয়ে যায়, চিঠি পরে পাঠানো হয়।’ শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার প্রথম দিন থেকেই সীমান্ত সুরক্ষায় জোর দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। শিলিগুড়ি করিডরের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে অমিত শাহ বলেন, ‘চিকেনস নেককে সুরক্ষিত করতে ৫৬০ একর জমির প্রয়োজন ছিল। শুভেন্দুজি মুখ্যমন্ত্রী হয়েই সেই অনুমোদন দিয়েছলেন।’
দিল্লি-শিলিগুড়ি রেল করিডর
তিনি আরও জানান, শুধু সেনা বা এজেন্সির মাধ্যমে কোনও জায়গার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং তার জন্য় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ খুবই জরুরি। তাই ২০২৬-২৭ বাজেটে দিল্লি-শিলিগুড়ি রেল করিডর তৈরি করার কথা বলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এদিনের অনুষ্ঠানে প্রায় ১৮৯ কোটি টাকার একাধিক নতুন প্রশাসনিক ও আবাসিক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরও উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গৌরব মোহন, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর অধিকর্তা মহেশ দীক্ষিত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ডঃ রাজেন্দ্র কুমার, এসএসবি-র ডিজি সঞ্জয় সিংঘল এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অন্যান্য শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা।
‘বন্দে মাতরমের’ প্রসঙ্গ
সীমান্ত সুরক্ষা ও দেশের নিরাপত্তার কথা বলতে গিয়ে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরমের’ প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। অমিত শাহের কথায়, ‘স্বাধীনতার পরেও পুরো বন্দে মাতরম গাওয়া হতো না। আমার দুঃখ হতো। নতুন নিয়মে জাতীয় গানকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।’ এই পদক্ষেপকে ঐতিহাসিক বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর কথা আরও ভালো ভাবে জানতে পারবে বলে মনে করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এদিন এসএসবি-র জওয়ানদের ভূয়সী প্রশংসা করে শাহ বলেন, ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর মণিপুর, জম্মু-কাশ্মীর, ত্রিপুরা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এসএসবি জওয়ানরা অসামান্য সেবা দিয়েছেন। কারগিল যুদ্ধের পর ‘ওয়ান বর্ডার, ওয়ান ফোর্স’ নীতি অনুযায়ী ২০০১ সাল থেকে ১,৭৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-নেপাল সীমান্ত এবং ২০০৪ সাল থেকে ৭০০ কিলোমিটার (প্রকৃতপক্ষে ৬৯৯ কিমি) দীর্ঘ ভারত-ভূটান সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে এসএসবি। কাঁটাতারহীন উন্মুক্ত সীমান্তে বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রীতি বজায় রেখে দিবারাত্রি কাজ করা অত্যন্ত কঠিন, যা এসএসবি জওয়ানরা নিষ্ঠার সঙ্গে করে যাচ্ছেন।
বিকশিত ভারতে পশ্চিমবঙ্গের অবদান
অমিত শাহের পরে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এসএসবি-র গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁকে আমন্ত্রণ করার জন্য কৃতজ্ঞতাও জানান। অমিত শাহকে চাণক্যর সঙ্গে তুলনা করে শুভেন্দু বলেন, ‘তিনি চাণক্য। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিজির নেতৃত্বে অমিত শাহজি সীমান্ত সুরক্ষিত করেছেন।’ ২০৪৭-এ বিকশিত ভারতে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বেশি অবদান থাকবে বলে আশা শুভেন্দুর।
