মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতীয় নৌসেনার শক্তি আরও এক ধাপ বাড়িয়ে বুধবার (২২ জুলাই) আনুষ্ঠানিকভাবে বাহিনীতে কমিশন বা অন্তর্ভুক্ত হল ‘আইএনএস মালভান’ (INS Malvan)। এটি মাহে-ক্লাসের (Mahe-class) অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার শ্যালো ওাটার ক্র্যাফট (ASW-SWC) সিরিজের দ্বিতীয় স্টেলথ যুদ্ধজাহাজ। শত্রুপক্ষের সাবমেরিন খুঁজে বের করে ধ্বংস করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি এই যুদ্ধজাহাজে রয়েছে ৮০ শতাংশেরও বেশি দেশীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম, যা আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ভারতীয় বায়ুসেনার প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিং-এর উপস্থিতিতে জাহাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম নৌ-কমান্ডের ফ্ল্যাগ অফিসার কমান্ডিং-ইন-চিফ ভাইস অ্যাডমিরাল সঞ্জয় বাত্সায়নও।
কেন বিশেষ আইএনএস মালভান?
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মতে, ‘সাবমেরিন হান্টার’ আইএনএস মালভান আকারে ছোট হলেও যুদ্ধক্ষমতায় অত্যন্ত শক্তিশালী। উপকূলীয় ও অগভীর জলসীমায় দ্রুত অভিযান চালানো, শত্রুর সাবমেরিন শনাক্ত করা এবং দীর্ঘ সময় নজরদারি চালানোর জন্যই এটি বিশেষভাবে তৈরি। মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, জাহাজটি ‘‘ক্ষিপ্র, নিখুঁত এবং দীর্ঘস্থায়ী অভিযানের উপযোগী’’, যা অগভীর জলসীমায় ভারতের আধিপত্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
শত্রুর সাবমেরিনের জন্য কেন ভয়ঙ্কর?
আইএনএস মালভান-এর প্রধান কাজ অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার (ASW)। উপকূলীয় অঞ্চলে লুকিয়ে থাকা শত্রুর সাবমেরিন শনাক্ত করে দ্রুত আক্রমণ চালানোর জন্য এতে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সেন্সর বসানো হয়েছে।
জাহাজের প্রধান অস্ত্রসম্ভার—
- ● আরবিইউ-৬০০০ (RBU-6000) অ্যান্টি-সাবমেরিন রকেট লঞ্চার
- ● দুই পাশে ৩২৪ মিমি ট্রিপল লাইটওয়েট টর্পিডো টিউব
- ● অ্যান্টি-সাবমেরিন মাইন বসানোর ব্যবস্থা
- ● টর্পিডো ডিকয় লঞ্চারসহ ইন্টিগ্রেটেড অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার ডিফেন্স স্যুট
- ● ৩০ মিমি নৌ-কামান
- ● দুটি ১২.৭ মিমি স্ট্যাবিলাইজড রিমোট-কন্ট্রোলড গান
এছাড়াও জাহাজটি লো-ইন্টেনসিটি মেরিটাইম অপারেশনস্ বা সংক্ষেপে লিমো (LIMO) এবং মাইন ওয়ারফেয়ার-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অভিযানে অংশ নিতে সক্ষম।
উপকূলীয় যুদ্ধে বিশেষভাবে কার্যকর
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলের অগভীর জলসীমায় শত্রুপক্ষের সাবমেরিন সহজে লুকিয়ে থাকতে পারে। সেই ধরনের লিটোরাল (Littoral) বা অগভীর অঞ্চলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে ছোট, দ্রুতগামী এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধজাহাজের প্রয়োজন হয়। আইএনএস মালভান ঠিক সেই উদ্দেশ্যেই তৈরি।
আইএনএস মালভান-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য
মাহে-ক্লাস যুদ্ধজাহাজে আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি স্টেলথ ডিজাইনও ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রধান বৈশিষ্ট্য—
- ● দৈর্ঘ্য: প্রায় ৭৮–৮০ মিটার
- ● ওজন (ডিসপ্লেসমেন্ট): প্রায় ৯০০–১,১০০ টন
- ● সর্বোচ্চ গতি: ২৫ নট
- ● অপারেশনাল রেঞ্জ: ১,৮০০ নটিক্যাল মাইল (১৪ নট গতিতে)
- ● সমুদ্রে টানা থাকার ক্ষমতা: ১৪ দিন
- ● ইঞ্জিন: তিনটি ৬ মেগাওয়াট মেরিন ডিজেল ইঞ্জিন
- ● প্রোপালশন: ওয়াটার জেট/পাম্প-জেট প্রোপালশন, যা ভারতীয় যুদ্ধজাহাজের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রয়োগগুলির একটি
জাহাজটিতে স্টেলথ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে এর রেডার, শব্দ এবং ইনফ্রারেড সিগনেচার অনেক কম থাকে। ফলে শত্রুর পক্ষে এটি শনাক্ত করা কঠিন।
দেশীয় প্রযুক্তির বড় সাফল্য
আইএনএস মালভানে ৮০ শতাংশেরও বেশি দেশীয় উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। জাহাজটির নির্মাণ প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড (BEL), মহীন্দ্রা ডিফেন্স সিস্টেমস এবং লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো (L&T)-সহ একাধিক ভারতীয় সংস্থা। কোচিন শিপইয়ার্ডে নির্মিত মাহে-ক্লাসের মোট আটটি যুদ্ধজাহাজ ধাপে ধাপে অগাস্ট ২০২৫ থেকে জুন ২০২৮-এর মধ্যে ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে।
নামের পিছনে রয়েছে ঐতিহাসিক তাৎপর্য
‘মালভান’ নামটি নেওয়া হয়েছে মহারাষ্ট্রের ঐতিহাসিক উপকূলীয় শহর মালভান থেকে, যার সঙ্গে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের সমুদ্র প্রতিরক্ষার ঐতিহ্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি, ২০০৩ সাল পর্যন্ত নৌবাহিনীতে কর্মরত পুরনো আইএনএস মালভান-এর ঐতিহ্যও এই নতুন যুদ্ধজাহাজ বহন করবে। কমিশনিংয়ের আগে ভারতীয় নৌবাহিনী সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ জাহাজটির ক্রেস্টও প্রকাশ করেছে। সেখানে শিবাজির বিখ্যাত ‘বাঘ নখ’ (Bagh Nakha)-কে সাহস, ক্ষিপ্রতা এবং দুর্ধর্ষ মনোভাবের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ক্রেস্টে রয়েছে ‘Silent Claws’ মন্ত্র, আর নৌবাহিনীর বার্তা— ‘Silent. Swift. Lethal.’ ভারতীয় নৌবাহিনীর নতুন এই ‘সাবমেরিন হান্টার’ শুধু একটি যুদ্ধজাহাজ নয়, বরং দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, স্টেলথ সক্ষমতা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় ভারতের ক্রমবর্ধমান আত্মনির্ভরতারও শক্তিশালী প্রতীক।
