মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: রাজ্যের লক্ষ্মীদের ভালো রাখতে বদ্ধ পরিকর সরকার। লক্ষ্মীপুজোর সন্ধ্যায় মহানায়ক উত্তম কুমারের বাড়ির পুজোয় গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখান থেকে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন তিনি। এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর কথায় উঠে এল নাবালিকা বিবাহ (prevention of child marriage) থেকে নেশার কবলের মতো সমাজের সংক্রামক ব্যাধি নির্মূলের প্রসঙ্গও। সে বিষয়ে শুধু একা সরকার নয়, মানুষের সাহায্যও চাইলেন তিনি।
নাবালিকাদের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ
রাজ্যের নাবালিকা বিবাহ এবং সন্তান প্রসবে নাবালিকাদের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ দিন স্বাস্থ্য দফতরের পরিসংখ্যান দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে নাবালিকাদের সন্তান প্রসবের ঘটনা রীতিমতো উদ্বেগের। তিনি এদিন পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, গত ছয় মাসে মুর্শিদাবাদে মোট ১২,৮৫৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকায় ১২,৫৮৫ এবং শহরাঞ্চলে ২৬৫টি ঘটনা বলে জানানো হয়েছে। বয়সের নিরিখে ১০–১৩ বছর বয়সিদের মধ্যে ২৮টি, ১৩–১৫ বছর বয়সিদের মধ্যে ৮১৭টি এবং ১৫–১৮ বছর বয়সিদের মধ্যে ৬,৫২৭টি ঘটনা রয়েছে। ১৮ বছর বয়সে নথিভুক্ত ঘটনা ৫,৪৮৩টি। তালিকায় পরবর্তী স্থানে রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা। সেখানে মোট ৪,১৭৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকায় ৪,০৬৩ এবং শহরাঞ্চলে ১১৫টি। বয়সভিত্তিক হিসাবে ১০–১৩ বছর বয়সিদের মধ্যে ৫টি, ১৩–১৫ বছর বয়সিদের মধ্যে ২৪৪টি, ১৫–১৮ বছর বয়সিদের মধ্যে ১,৯৬৯টি এবং ১৮ বছর বয়সিদের মধ্যে ১,৯৬০টি ঘটনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য দফতরের সংরক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতেই এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে সমস্ত ঘটনাই হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব (institutional delivery) হওয়ায় নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে এই পরিসংখ্যানের বাইরে থাকা ঘটনা থাকলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে।
নাবালিকা বিবাহ রুখতে পদক্ষেপ
স্বাস্থ্য ভবন সূত্র বলছে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রাজ্যে প্রায় ৬৭ হাজার নাবালিকা গর্ভধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। এই তালিকায় ১২,৮৪৭টি ঘটনা নিয়ে শীর্ষে রয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলা। এর মধ্যে বড় অংশই ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরী, এমনকি ১০ থেকে ১৩ বছর বয়সের প্রসূতিও রয়েছে সেখানে। তালিকায় পরবর্তী স্থানে রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা (৪,১৭৮) ও পূর্ব বর্ধমান (৩,৭৭৭)। এর পর পর্যায়ক্রমে মালদহ, পশ্চিম মেদিনীপুর ও উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলি রয়েছে। ধর্মীয় পরিসংখ্যান বলছে, ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ এক বিশেষ সম্প্রদায়ের হলেও, আইন ও অপরাধের বিচার সব নাগরিকের জন্য সমান। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সন্তান প্রসবকারী নাবালিকাদের স্বামীদের স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষ থেকে শোকজ নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এক মাসের মধ্যে তাঁদের স্ত্রীদের বয়স ১৮ বছর এবং পুরুষের বয়স ২১ বছর হওয়ার আইনি যোগ্যতা ও বয়সের প্রমাণ পেশ করতে বলা হবে বলে জানানো হয়েছে। বয়সের প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, নাবালিকা বিবাহ এবং নাবালিকাদের সন্তান প্রসব—দুই ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
গ্রেফতার এবং ধারাবাহিক পুলিশি অভিযান
সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, বাল্যবিবাহের ঘটনা নজরে এলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনের নির্দিষ্ট ধারায় মামলা করা হবে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইনের বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য, শুধু সচেতনতা বা সতর্কবার্তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। তাই বাল্যবিবাহ এবং নাবালিকা প্রসবের ঘটনাগুলি চিহ্নিত করে মামলা, গ্রেফতার এবং ধারাবাহিক পুলিশি অভিযান চালানো হবে। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী জানান, যাঁরা নাবালিকা বিবাহ করেছেন তাঁদের স্বামীদের বয়স ২১ পেরিয়ে যাওয়ার কারণে এবং ইনস্টিটিউশনাল ডেলিভারি হওয়ায় স্বাস্থ্য দফতর থেকে এই সব ব্যক্তিদের কাছে নোটিশ যাবে। শুধু তাই নয়, এই সব পরিবারের লোকজন বিয়ে দিয়ে থাকলে সব রকম সরকারি প্রকল্প থেকেও বঞ্চিত থাকবেন বলে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন।
বাংলার প্রতিটি পরিবারের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা
বাংলার প্রতিটি পরিবারের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, ‘অভিভাবক, অভিভাবিকাদের বলব, ১৮ বছরের নীচে মেয়েদের বিয়ে দেবেন না। এই কারণে বহু প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব হচ্ছে। ১৫-১৪ বছরের বাচ্চা মেয়েদের তো এখনও বিয়ের বয়স হয়নি। কিন্তু তাদেরও ১৮-র নীচে বিয়ে হচ্ছে এবং সন্তান প্রসব হচ্ছে হাসপাতালে। এ এক ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি। এইটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’ তাঁর কথায় উঠে এল বাল্যবিবাহ এখনও গ্রামীণ বাংলার একটা বড় সমস্যা। এখানে শুধু বাংলার মহিলাদের সামাজিক সুরক্ষাই নয়, তাঁদের জীবন-মরণের মতো বড় একটা সমস্যার শিকড়ও জুড়ে রয়েছে। সরকারের কাজ কী? শুধু তো ভাতা দেওয়া বা রাস্তা তৈরি করা নয়। সরকারের কাজ সমাজের মধ্যে সংস্কার আনা। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, সংস্কার আনার ক্ষেত্রে মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, বিধায়করা শুধু নয়, জনগণকে যুক্ত করে করতে হবে এবং সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
নেশামুক্ত সমাজ, পুলিশের কড়া পদক্ষেপ
প্রশাসনের ভূমিকা তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলায় লক্ষ্মীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের আরও পুলিশের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আরও শক্ত হাতে আইন কার্যকর করতে হবে।’কিন্তু এখানে আইনের কার্যকর হওয়ারও একটা বড় গুরুত্ব রয়েছে। তা মনে করিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘১৮ জনের মতো ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট হয়ে আছে, তার মধ্যে ছটা পকসো (POCSO) মামলা। তাদের ডেথ পানিশমেন্ট হয়ে আছে। তাদের যে শাস্তি কার্যকর হচ্ছে না, এর ফলে বেপরোয়া ধরনের ঘটনা প্রতিদিনই কিছু না কিছু ঘটছে। এই জায়গা থেকে আমাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে এক নম্বর।’ শুধু আইন নয়, বাংলায় মহিলাদের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নেশার মতো ভয়ানক সামাজিক ব্যাধির কোপও। তা নিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘নেশামুক্তি না ঘটলে বাংলার আমাদের মা-বোন, দিদি-কন্যারা সুরক্ষিত থাকবে না। আমি মনে করি, এই বিকৃত মানসিকতার মূলে রয়েছে নেশা। এই জায়গা থেকে বাংলাকে, ভারতবর্ষকে যেমন নেশামুক্ত করতে বলছে বলা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গকেও নেশামুক্ত করতে হবে।’
