মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষায় ফের পাশ-ফেল (WB Schools Pass Fail) প্রথা চালু করার পক্ষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সিলেবাস কমিটির সুপারিশ এবং জাতীয় শিক্ষানীতির দিকনির্দেশনা খতিয়ে দেখার কথাও জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, স্কুলে মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ইতিহাসের পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক শিক্ষার প্রসার এবং ব্রতচারী, এনসিসি ও এনএসএসের মতো কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার পক্ষেও সওয়াল করেছেন মুখ্যমন্ত্রী (Suvendu Adhikari)। তাঁর বক্তব্য, আগামী শিক্ষাবর্ষে রাজ্যের স্কুলশিক্ষায় একাধিক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে শিক্ষা দফতর ও সিলেবাস কমিটির মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাঁর কথায়, “সিলেবাস কমিটির সুপারিশ আমরা মেনে চলব। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিও রয়েছে। তাই রিপোর্ট আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। শিক্ষা দফতরের দায়িত্বে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ। এই বিষয়ে তাঁদেরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া যুক্তিযুক্ত। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, স্কুলে পাশ-ফেল প্রথা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।”
পাশ-ফেল ফেরানোর ভাবনা (WB Schools Pass Fail)
বর্তমানে রাজ্যের সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলে প্রাথমিক স্তর থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রচলিত পাশ-ফেল ব্যবস্থা নেই। তবে এই ব্যবস্থা ফেরানোর সম্ভাবনা নিয়ে শিক্ষা মহলে আলোচনা চলছে। সূত্রের খবর, সিলেবাস কমিটির বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, প্রাথমিক স্তরকে বাদ রেখে পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পাশ-ফেল চালু করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
পাশ-ফেল প্রথা ফিরলে কোনও পড়ুয়া পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে তার জন্য অতিরিক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফল প্রকাশের পরে সংশ্লিষ্ট পড়ুয়াদের জন্য ১৫ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত বিশেষ বা রেমেডিয়াল ক্লাসের ব্যবস্থা করা হতে পারে। এরপর ফের পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার ভাবনাও রয়েছে। দ্বিতীয়বারেও উত্তীর্ণ হতে না পারলে সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে ওই পড়ুয়ার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হতে পারে।
সিলেবাস কমিটির এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য, একদিকে শিক্ষার মান বজায় রাখা, অন্যদিকে পরীক্ষায় ব্যর্থ পড়ুয়াদের উন্নতির সুযোগ দেওয়া। তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও ঘোষিত হয়নি।
পাশ-ফেল তুলে দেওয়ার পিছনে ছিল স্কুলছুট কমানোর যুক্তি
রাজ্যে পাশ-ফেল প্রথা তুলে দেওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ১৯৮২ সালে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রাথমিক স্তরে, অর্থাৎ চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পাশ-ফেল তুলে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে ২০০৯ সালে শিক্ষার অধিকার আইন কার্যকর হওয়ার পর দেশজুড়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের আটকে না রাখার নীতি চালু হয়।
২০১৮ সালে শিক্ষার অধিকার আইনে সংশোধনের মাধ্যমে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পাশ-ফেল ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলিকে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছিল। তবে পশ্চিমবঙ্গে এখনও সেই ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
পাশ-ফেল তুলে দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল স্কুলছুটের হার কমানো এবং পড়ুয়াদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। অন্যদিকে, শিক্ষামহলের একাংশের বক্তব্য, নিয়মিত মূল্যায়ন ও শ্রেণিভিত্তিক দক্ষতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার না হলে পড়ুয়াদের শিক্ষাগত ভিত দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই নতুন ব্যবস্থা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
দেশপ্রেম ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ উদ্যোগ
স্কুলশিক্ষায় পরিবর্তনের প্রসঙ্গে পড়ুয়াদের মধ্যে দেশপ্রেম, সামাজিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা গড়ে তোলার ওপরও জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর প্রস্তাব, প্রতি বছর অন্তত তিন দিন স্কুলে বিতর্ক, কুইজ এবং তাৎক্ষণিক বক্তৃতার মতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হোক। তাঁর মতে, এই ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশ ও সমাজ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে বিরোধী মত ও রাজনৈতিক বিতর্কের আবহেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মতপ্রকাশ, আলোচনা এবং সমালোচনামূলক চিন্তার সুযোগ বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন শিক্ষামহলের একাংশ (WB Schools Pass Fail)।
ইতিহাসের পাঠ্যক্রমে বদল, ফিরতে পারে ব্রতচারী ও এনসিসি
পশ্চিমবঙ্গের স্কুলপাঠ্যে ভারত ও রাজ্যের ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন শুভেন্দু। তাঁর মতে, ছাত্রছাত্রীদের কাছে ইতিহাসের উপস্থাপনা আরও আধুনিক ও তথ্যভিত্তিক হওয়া দরকার।
পাশাপাশি, পড়ুয়াদের শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের লক্ষ্যে ব্রতচারী, এনএসএস এবং এনসিসির মতো কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার পক্ষেও মত প্রকাশ করেন তিনি। স্কুলের প্রাথমিক স্তর থেকেই তবলা, হারমোনিয়াম, গিটার, সেতার, মৃদঙ্গ ও খঞ্জনির মতো বাদ্যযন্ত্র শেখানোর ব্যবস্থা করার কথাও বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, পড়ুয়াদের সাংস্কৃতিক প্রতিভার বিকাশও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ (Suvendu Adhikari)।
মোবাইলের বদলে শিক্ষামূলক ট্যাব দেওয়ার প্রস্তাব
স্কুল পড়ুয়াদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। আগের সরকারের আমলে একাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের মোবাইল কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষার কাজে উপযোগী ইলেকট্রনিক ট্যাব দেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।
শুভেন্দুর কথায়, “আমি ইতিমধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা দফতরের সচিবকে জানিয়েছি, প্রয়োজন হলে বেশি অর্থ বরাদ্দ করা হোক, কিন্তু শিক্ষার কাজে লাগবে এমন ট্যাব দেওয়া হোক। পড়ুয়ারা যাতে মোবাইল ফোন কিনতে না পারে, তার ব্যবস্থাও করতে হবে।”
তবে স্কুলে মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের নিয়ম কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত নির্দেশিকা এখনও সামনে আসেনি (WB Schools Pass Fail)।
মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের জবাব বিরোধীদের
শিক্ষা ও রাজ্যের পূর্ববর্তী সরকারগুলিকে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিরোধী শিবির। সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, “সব সময়ে মুখ্যমন্ত্রীর কথায় সব কিছু চলবে না। প্রতিবাদী মানুষ থাকবেই। প্রতিবাদীদের উপরে সরকার অত্যাচার করলে, আইনের পাশাপাশি মানুষ রাস্তাতেও আন্দোলন করবে।”
সব মিলিয়ে, পাশ-ফেল প্রথা ফেরানো থেকে শুরু করে পাঠ্যক্রম, সাংস্কৃতিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার—একাধিক বিষয়ে রাজ্যের স্কুলশিক্ষায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী (Suvendu Adhikari)। তবে প্রস্তাবগুলির মধ্যে কোনগুলি কার্যকর হবে এবং সেগুলি কবে থেকে চালু হবে, তা নির্ভর করছে শিক্ষা দফতরের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও সিলেবাস কমিটির সুপারিশের ওপর (WB Schools Pass Fail)।
