Tag: The Timothy Initiative

  • FCRA 2026: বিদেশি অনুদানে ধর্মান্তরণে নিষেধাজ্ঞা, এনজিওগুলির উপর নজরদারি আরও কড়া করল কেন্দ্র

    FCRA 2026: বিদেশি অনুদানে ধর্মান্তরণে নিষেধাজ্ঞা, এনজিওগুলির উপর নজরদারি আরও কড়া করল কেন্দ্র

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বিদেশি অনুদানের ব্যবহার নিয়ে নজরদারি আরও কঠোর করতে বিদেশি অনুদান (নিয়ন্ত্রণ) আইন (FCRA)-এর অধীনে নতুন সংশোধিত বিধি জারি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জারি করা এই নতুন নিয়মে প্রথমবার স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিদেশি অনুদান কোনওভাবেই ধর্মান্তরণ-সংক্রান্ত কার্যকলাপে ব্যবহার করা যাবে না। সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য বিদেশি অনুদানের ব্যবহারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জাতীয় নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা। দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছিল, কিছু বিদেশি অর্থপুষ্ট বেসরকারি সংস্থা (NGO), ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং মিশনারি সংগঠন সমাজসেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার আড়ালে ধর্মান্তরণের কাজে বিদেশি অনুদান ব্যবহার করছে। বিভিন্ন তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের পর কেন্দ্র এফসিআরএ-র নিয়ম আরও কঠোর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

    এফসিআরএ (FCRA)-র ইতিহাস

    বিদেশি অনুদান (নিয়ন্ত্রণ) আইন (Foreign Contribution (Regulation) Act) প্রথম চালু হয় ১৯৭৬ সালে। উদ্দেশ্য ছিল, বিদেশি অর্থ যাতে দেশের রাজনীতি, সামাজিক কাঠামো বা জাতীয় স্বার্থকে প্রভাবিত করতে না পারে। ২০১০ সালে আইনটি সংশোধিত হয়। এরপর ২০২০ এবং ২০২৬ সালে আরও গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনা হয়েছে। বর্তমানে বিদেশি অনুদান গ্রহণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে নিবন্ধন করতে হয়। এই নিবন্ধনের মেয়াদ পাঁচ বছর এবং পরে তা নবীকরণ করতে হয়।

    নিবন্ধনের সময় জানাতে হবে উদ্দেশ্য ও কাজের ক্ষেত্র

    সেবা ইন্টারন্যাশনালের জাতীয় কোষাধ্যক্ষ রাকেশ মিত্তলের দাবি, নতুন সংশোধনের ফলে বিদেশি অনুদান গ্রহণকারী সংস্থাগুলির কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ হবে। এখন থেকে নিবন্ধন বা নবীকরণের আবেদন করার সময় সংস্থাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে কোন উদ্দেশ্যে বিদেশি অনুদান নেওয়া হচ্ছে এবং কোন রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে সেই অর্থ ব্যয় করা হবে। যেসব সংস্থার ইতিমধ্যেই এফসিআরএ নিবন্ধন রয়েছে, তাদেরও এক বছরের মধ্যে নিজেদের ঘোষিত উদ্দেশ্য নতুন নিয়ম অনুযায়ী হালনাগাদ করে কেন্দ্রকে জানাতে হবে।

    পাঁচটি প্রধান বিভাগে ভাগ করা হয়েছে কার্যক্রম

    সংশোধিত নিয়মে বিদেশি অনুদানে পরিচালিত কার্যক্রমকে পাঁচটি প্রধান বিভাগে ভাগ করা হয়েছে— ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, শিক্ষামূলক, অর্থনৈতিক। এর অধীনে একাধিক উপ-বিভাগও নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষামূলক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ২২টি উপ-শ্রেণি রাখা হয়েছে। তবে সংবিধান, মৌলিক অধিকার, মৌলিক কর্তব্য ও নাগরিক সচেতনতা সংক্রান্ত কর্মসূচি পরিচালনা করতে হলে তা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক হতে হবে। সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ১৮টি উপ-শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারতীয় ঐতিহ্যভিত্তিক সমকালীন শিল্পকলার প্রসারের অনুমতি থাকলেও রাজনৈতিক বা মতাদর্শভিত্তিক বিষয়বস্তু নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

    ধর্মীয় কার্যক্রমে ধর্মান্তরণে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা

    নতুন সংশোধনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ধর্মীয় কার্যক্রমের স্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ। ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, সৎসঙ্গ, ধর্মীয় আলোচনা, ধ্যান শিবির, ধর্মীয় সাহিত্য প্রকাশ, উপাসনালয় নির্মাণ এবং তীর্থযাত্রীদের সুবিধা প্রদানের মতো কার্যক্রমের অনুমতি থাকলেও, নিয়মে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ধর্মান্তরণ-সংক্রান্ত কোনও কার্যকলাপ বিদেশি অনুদানে করা যাবে না।

    বিদেশি নাগরিক থাকলে নিবন্ধনে কড়াকড়ি

    নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনও সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে বিদেশি নাগরিক থাকলে সাধারণভাবে সেই সংস্থাকে এফসিআরএ নিবন্ধন দেওয়া হবে না। এছাড়া বিদেশি অনুদানের পরবর্তী কিস্তি পাওয়ার আগে আগের প্রাপ্ত অর্থের অন্তত ৭৫ শতাংশ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যয় হয়েছে বলে দেখাতে হবে। সংস্থাগুলিকে তাদের ওয়েবসাইট, সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, প্রকাশনা এবং ট্রাস্টি, পরিচালক, অংশীদার ও অন্যান্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের তথ্যও সরকারকে জানাতে হবে। ফলে পরিচালনাকারী ব্যক্তিদের আইনগত জবাবদিহিও বাড়বে।

    সরকারের লক্ষ্য কী?

    সেবা ভারতীর জাতীয় সম্পাদক রমেন্দ্র সিংয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন নিয়মের উদ্দেশ্য বিদেশি অনুদানের ব্যবহারে আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা। সরকারের মতে, বিদেশি অনুদান শুধুমাত্র যে উদ্দেশ্যে অনুমোদিত হয়েছে, সেই কাজেই ব্যবহার করা উচিত।

    কত সংস্থার লাইসেন্স বাতিল হয়েছে?

    স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে বিভিন্ন নিয়ম লঙ্ঘন এবং বাধ্যতামূলক বার্ষিক রিপোর্ট জমা না দেওয়ার অভিযোগে প্রায় ২১,৯৩৩টি এনজিওর এফসিআরএ লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে অথবা তাদের নবীকরণের আবেদন খারিজ হয়েছে। ফলে এসব সংস্থা আর বিদেশি অনুদান গ্রহণ করতে পারে না।

    একাধিক সংস্থা তদন্তের মুখে

    গত কয়েক বছরে বিদেশি অনুদান ব্যবহারের অভিযোগে একাধিক সংস্থা তদন্তের মুখে পড়েছে। ২০১৬-১৭ সালে মার্কিন সংস্থা কমপ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল (Compassion International)-এর সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের এফসিআরএ নবীকরণ আটকে দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ভিসন ইন্ডিয়া (World Vision India) এবং গসপেল ফর এশিয়া (Gospel for Asia)-সহ একাধিক বিদেশি অর্থপুষ্ট সংস্থার আর্থিক লেনদেনও তদন্তের আওতায় আসে। ২০২১ সালে মাদার টেরেসা প্রতিষ্ঠিত Missionaries of Charity-র FCRA নবীকরণও সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল। পরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পর বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়। সম্প্রতি, ২০২৬ সালের জুনে বেঙ্গালুরু পুলিশ মার্কিন মিশনারি সংস্থা দ্য টিমোথি ইনিসিয়েটিভ (The Timothy Initiative)-র বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, বৈধ এফসিআরএ নিবন্ধন ছাড়াই বিদেশি অনুদান গ্রহণ এবং মিশনারি কার্যক্রমে তা ব্যবহারের অভিযোগে ৯২ কোটিরও বেশি টাকার লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

    আরও কঠোর নজরদারির পথে কেন্দ্র

    বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের সংশোধিত এফসিআরএ বিধি ভারতের বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে চলেছে। প্রথমবার ধর্মান্তরণকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ কার্যকলাপ হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিদেশি অনুদানের উদ্দেশ্য, ব্যবহার, কার্যপরিধি এবং সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহি সম্পর্কেও বিস্তারিত নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। এর ফলে বিদেশি অনুদান গ্রহণকারী সংস্থাগুলিকে ভবিষ্যতে আরও কঠোর নিয়মের আওতায় কাজ করতে হবে।

LinkedIn
Share