মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বাংলায় একটি কথা আছে চিরদিন কাহার সমান না যায়, ক্ষমতার দম্ভ মানুষকে অহংকারী করে তোলে। তৃণমূলের সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে। দেড় দশক পর অবশেষে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে বাংলায়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর শাসনক্ষমতা হারানোর পরপরই আরও এক বড়সড় ধাক্কার সম্মুখীন হল ঘাসফুল শিবির। এবার খোদ দলের অস্থায়ী প্রধান কার্যালয় তথা ‘তৃণমূল ভবন’ (Trinamool Bhavan) ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ পেলেন শীর্ষ নেতৃত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerje)। উল্লেখ্য এই ভবন থেকেই অভিষেক রাজ্যের শাসক দলকে নিজের হাতের মুঠোয় করে দল চালাতেন বলে অভিযোগ তৃণমূলেরই একাংশের।
ইএম বাইপাস সংলগ্ন মেট্রোপলিটন এলাকায় ভাড়া নেওয়া যে বহুতল ভবনটি এতদিন ধরে তৃণমূলের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, তার মালিক ইতিমধ্যেই জায়গা খালি করার নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর ওই ভবনের বাইরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়, মূলত নিরাপত্তার স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
দু’মাসের মধ্যেই ভবনটি সম্পূর্ণ খালি হবে ভবন (Trinamool Bhavan)
সূত্রের খবর, এই বিলাসবহুল বহুতলটির মালিক রাজ্যের অন্যতম খ্যাতনামা ডেকরেটার্স সংস্থা ‘মডার্ন ডেকরেটার্স’-এর কর্ণধার মন্টু সাহা। তিনি নিজেই তৃণমূল নেতৃত্বকে মৌখিকভাবে ভবনটি ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন এবং তা খালি করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন। মন্টুবাবু নিজে এই নোটিস দেওয়ার কথা স্বীকার করে নিয়ে বলেছেন, তৃণমূল নেতৃত্বের (Mamata Banerje) সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং দলের পক্ষ থেকে তাঁকে স্পষ্ট আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে আগামী দু’মাসের মধ্যেই ভবনটি সম্পূর্ণ খালি করে দেওয়া হবে।
কোনও রাজনীতি নেই
রাজ্যে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের পর ক্ষমতাচ্যুত তৃণমূলকে কেন এমন নোটিশ দেওয়া হল, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তবে সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে মন্টু সাহা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এর নেপথ্যে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, চাপ বা অন্য কোনও সমীকরণ নেই। তিনি বলেন, ‘‘গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই ওই ভবনের (Trinamool Bhavan) বাইরে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। সম্পত্তির কোনও ক্ষতি হলে তো লোকসান আমারই। এর মধ্যে অন্য কোনও রাজনীতি নেই।”
কোনও ক্ষোভ নেই
মূলত নিজের সম্পত্তির নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই তিনি তৃণমূলকে এই ভবনটি (Trinamool Bhavan) ছাড়তে বলেছেন। পাশাপাশি তিনি এও নিশ্চিত করেছেন যে, চুক্তি অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া বাবদ যাবতীয় বকেয়া তৃণমূল নেতৃত্ব সর্বদা নিয়ম মেনে মিটিয়ে দিয়েছে এবং দলের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত কোনও ক্ষোভ নেই। তবে এই বিষয়ে তৃণমূল শিবিরের পক্ষ থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি৷
দু’বছরের চুক্তিতে এটি নেওয়া
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব তপসিয়ায় অবস্থিত দলের পুরনো ও মূল কার্যালয়টি সংস্কার করার সিদ্ধান্ত নেয়। পুরনো ভবনটি (Trinamool Bhavan) ভেঙে সেখানে কর্পোরেট ধাঁচের একটি আধুনিক বহুতল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সেই কারণেই বিকল্প কার্যালয় হিসেবে ২০২২ সালে ইএম বাইপাসের মেট্রোপলিটন এলাকার এই ভবনটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে মাত্র দু’বছরের চুক্তিতে এটি নেওয়া হলেও, তপসিয়ার মূল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় পরবর্তীতে চুক্তির মেয়াদ আরও দু’বছর বাড়ানো হয়।
সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু
ফলে বিগত চার বছর ধরে এই মেট্রোপলিটন ভবনটিই ছিল তৃণমূলের সমস্ত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এই অস্থায়ী তৃণমূল ভবনেই (Trinamool Bhavan) দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য পৃথক সুসজ্জিত কক্ষের ব্যবস্থা ছিল। দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বৈঠক, নির্বাচনী রণকৌশল নির্ধারণ এবং সাংবাদিক সম্মেলন—সবই পরিচালিত হতো এখান থেকে। প্রতিদিন দলের প্রথম সারির নেতা, বিধায়ক ও মন্ত্রীরা এখানে সমবেত হতেন। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়টি পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানের মূল দায়িত্বে ছিলেন দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি এবং সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার। এখন চরম সঙ্কটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerje)।
চরম অস্বস্তিতে পড়েছে নেতৃত্ব
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। শাসনক্ষমতা হারানোর পর এমনিতেই ব্যাকফুটে রয়েছে শাসকদল। তার ওপর দলের মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষ তথা এই অস্থায়ী ভবনটি (Trinamool Bhavan) ছেড়ে দিতে হওয়ায় চরম অস্বস্তিতে পড়েছে নেতৃত্ব। যেহেতু তপসিয়ার মূল ভবনের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি, তাই মেট্রোপলিটনের এই কার্যালয় ছাড়তে হওয়ায় আগামী দিনে তৃণমূলের সাংগঠনিক কাজকর্ম কোথা থেকে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। আগামী দু’মাসের মধ্যে নতুন কোনও উপযুক্ত অস্থায়ী আস্তানা খুঁজে না পেলে ঘাসফুল শিবিরের দৈনন্দিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড়সড় ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
