Tag: Trump Iran War

  • Trump Iran War: ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা! ইরান যুদ্ধ থামাতে সেনেটে ঐতিহাসিক ভোট, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বাড়ছে রিপাবলিকান অস্বস্তি

    Trump Iran War: ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা! ইরান যুদ্ধ থামাতে সেনেটে ঐতিহাসিক ভোট, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বাড়ছে রিপাবলিকান অস্বস্তি

    সুশান্ত দাস

    ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অন্যতম বড় রাজনৈতিক ধাক্কা দিল মার্কিন সেনেট। ৫০-৪৮ ভোটে সেনেট একটি ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’ (War Powers Resolution) অনুমোদন করেছে, যার লক্ষ্য কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান চালানো বন্ধ করা। ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক বলে মনে করছেন মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, ১৯৭৩ সালে ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট কার্যকর হওয়ার পর এই প্রথম মার্কিন কংগ্রেসের নিম্ন কক্ষ— হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস (House of Representatives) বা প্রতিনিধি পরিষদ এবং উচ্চকক্ষ সেনেট— কোনও প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব পাস করল। যদিও এই প্রস্তাব অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে না, তবুও এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক গুরুতর রাজনৈতিক সতর্কবার্তা বলে মনে করা হচ্ছে।

    কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই ভোট?

    মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। কিন্তু গত কয়েক দশকে একাধিক প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন সামরিক অভিযান চালিয়েছেন সরাসরি কংগ্রেসের পূর্ণ অনুমোদন ছাড়াই। ইরানের বিরুদ্ধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ উঠেছে। বিরোধীদের দাবি, ট্রাম্প কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছেন। সেই কারণেই ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কয়েকজন রিপাবলিকান সেনেটরও এবার ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এই ভোট কেবল ইরান যুদ্ধ নিয়ে নয়; এটি মূলত প্রেসিডেন্ট বনাম কংগ্রেস— কার হাতে যুদ্ধ সংক্রান্ত চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকবে, সেই সাংবিধানিক প্রশ্নকেও সামনে এনে দিয়েছে।

    ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া: ‘অর্থহীন ও ভুল সময়ের সিদ্ধান্ত’

    সেনেটে ভোটাভুটির পর ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশাল-এ (Truth Social) তিনি এই প্রস্তাবকে “ভুল সময়ের এবং অর্থহীন” বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও দাবি করেন, এই ধরনের পদক্ষেপ ইরানকে “সাহায্য ও মানসিক সমর্থন” জোগাচ্ছে এবং রিপাবলিকান দলের কয়েকজন সদস্য তাঁর কাজকে আরও কঠিন করে তুলছেন। ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া থেকেই স্পষ্ট, তিনি এই ভোটকে কেবল প্রতীকী ঘটনা হিসেবে দেখছেন না; বরং এটিকে নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছেন।

    রিপাবলিকান শিবিরেই ফাটল

    সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, চারজন রিপাবলিকান সেনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। তাঁরা হলেন— লিসা মার্কাওস্কি, সুজান কলিন্স, র‌্যান্ড পল, বিল ক্যাসিডি। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট সেনেটর জন ফেটারম্যান John Fetterman ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থন করে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিভাজন দেখিয়ে দিচ্ছে যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরে ক্রমশ অসন্তোষ বাড়ছে।

    যুদ্ধের খরচ নিয়ে উদ্বেগ

    ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে আরেকটি বড় সমস্যা হল যুদ্ধের বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বাজেটের আবেদন জানিয়েছেন। পেন্টাগনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই খরচ হয়েছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার।

    এর ফলে রিপাবলিকানদের মধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—

    • ● যুদ্ধ কতদিন চলবে?
    • ● শেষ লক্ষ্য কী?
    • ● মার্কিন করদাতাদের অর্থ কতটা ব্যয় হবে?
    • ● আর এই সংঘর্ষ কি আরেকটি “অনন্ত যুদ্ধ”-এ পরিণত হতে চলেছে?

    ট্রাম্পের নতুন ইরান চুক্তি নিয়েও ক্ষোভ

    যুদ্ধের পাশাপাশি ট্রাম্পের প্রস্তাবিত নতুন ইরান চুক্তিও বিতর্কের কেন্দ্রে।খবরে বলা হয়েছে, চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল নিয়ে আলোচনা চলছে। রিপাবলিকান দলের রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী অংশের মতে, যুদ্ধ করে আবার ইরানকে অর্থ সাহায্য দেওয়ার যুক্তি ভোটারদের কাছে ব্যাখ্যা করা কঠিন হবে।

    ফলে ট্রাম্প এখন দুই দিক থেকেই চাপের মুখে—

    • ● যুদ্ধপন্থীরা চুক্তি নিয়ে অসন্তুষ্ট।
    • ● যুদ্ধবিরোধীরা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অসন্তুষ্ট।

    মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্য কতটা বিপজ্জনক?

    রাজনৈতিকভাবে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন (Midterm Elections) যত এগিয়ে আসছে, ততই রিপাবলিকান প্রার্থীরা নিজেদের আসন নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। ইতিহাস বলছে, দীর্ঘস্থায়ী বিদেশি যুদ্ধ প্রায়শই ক্ষমতাসীন দলের জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

    ১. স্বাধীন ভোটারদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে

    মার্কিন নির্বাচনে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ বা নির্দলীয় ভোটারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি তাঁদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয় যে ট্রাম্প কংগ্রেসকে উপেক্ষা করে দেশকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছেন, তাহলে বহু সুইং স্টেটে রিপাবলিকান প্রার্থীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

    ২. ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংঘর্ষ

    ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম ভিত্তি ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। তিনি বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে আমেরিকাকে আর বিদেশি যুদ্ধের জালে জড়াবেন না। কিন্তু ইরান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিরোধীরা সহজেই প্রশ্ন তুলতে পারবে— “যে নেতা অন্তহীন যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনিই কি নতুন যুদ্ধ শুরু করলেন?” এই প্রশ্ন রিপাবলিকান ভোটব্যাঙ্কের একটি অংশকে বিচলিত করতে পারে।

    ৩. রিপাবলিকান ঘাঁটিতেই বিভাজন

    র‌্যান্ড পলের মতো নেতারা প্রকাশ্যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন সামনে এসেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই বিভাজন যদি আরও বাড়ে, তাহলে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।

    ৪. যুদ্ধের ব্যয় বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে

    মুদ্রাস্ফীতি, ঋণ এবং বাজেট ঘাটতির মতো অর্থনৈতিক ইস্যুগুলি ইতিমধ্যেই ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে আরও ৮০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধ ব্যয় অনুমোদনের প্রশ্ন উঠলে ডেমোক্র্যাটরা এটিকে বড় নির্বাচনী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

    কংগ্রেস কি সত্যিই ট্রাম্পকে থামাতে পারবে?

    বাস্তবিক অর্থে এখনই নয়। এই প্রস্তাব মূলত রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। প্রেসিডেন্ট চাইলে এটিকে উপেক্ষা করতে পারেন অথবা ভেটো দিতে পারেন।

    তবে কংগ্রেসের হাতে আরও শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে—

    • ● যুদ্ধের অর্থ বরাদ্দ আটকে দেওয়া,
    • ● প্রতিরক্ষা বাজেটে শর্ত আরোপ করা,
    • ● নতুন আইন পাস করার চেষ্টা করা।

    ফলে যুদ্ধ বন্ধ না হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তা স্পষ্ট।

    ট্রাম্পে বাড়ছে অনাস্থা!

    সেনেটের ৫০-৪৮ ভোট শুধু একটি প্রতীকী প্রস্তাব নয়। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রকাশ্য অনাস্থার বার্তা। ১৯৭৩ সালের পর এই প্রথম কংগ্রেসের দুই কক্ষ একসঙ্গে কোনও প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সেনা সরানোর আহ্বান জানাল। তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ থামবে না, কিন্তু রাজনৈতিক অভিঘাত গভীর। রিপাবলিকান শিবিরে ফাটল, যুদ্ধের বাড়তি খরচ, ইরান চুক্তি নিয়ে অসন্তোষ এবং সাংবিধানিক প্রশ্ন— সব মিলিয়ে ট্রাম্প এমন এক বিতর্কের মুখে পড়েছেন যা আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দলের জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন একটাই— ইরান যুদ্ধ কি ট্রাম্পের জন্য নতুন বিদেশনীতি সংকট, নাকি সেটাই ২০২৬ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুর্বলতা হয়ে উঠবে?

LinkedIn
Share