মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে (UAE) পৌঁছেই দু’টি বড় চুক্তি করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জ্বালানি সঙ্কট মোকাবিলায় এলপিজি সরবরাহ এবং পেট্রোলিয়াম মজুত নিয়ে মউ সই করেছে দুই দেশ। একই সঙ্গে চুক্তি হয়েছে প্রতিরক্ষা খাতেও। পশ্চিম এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সফরে গিয়ে দেশের জন্য একাধিক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সাফল্য হাসিল করলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি (Narendra Modi)। এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাইলফলক বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত, তেলের দামের অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারত ও ইউএই স্থিতিশীলতা, সংযোগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও জোরদার করার বার্তা দিয়েছে। শুক্রবার আবু ধাবিতে মোদির সংক্ষিপ্ত সফরেই প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, পরিকাঠামো এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ভারত ও ইউএই-র মধ্যে।
মোদিকে রাজকীয় ‘গার্ড অফ অনার’
শুক্রবার দুপুর ১২টা নাগাদ আবু ধাবি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর প্রধানমন্ত্রী মোদিকে (Modi UAE Visit) রাজকীয় ‘গার্ড অফ অনার’ দেওয়া হয়। এরপরই তিনি আমিরশাহীর প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন। ২০১৪ থেকে এই নিয়ে সাতবার আমিরশাহীতে যাত্রা করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, অন্যদিকে একই সময়ের মধ্যে পাঁচবার ভারতে এসেছেন মহম্মদ বিন জায়ের। গত জানুয়ারি মাসে পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে এসেছিলেন আমিরশাহীর প্রেসিডেন্ট। সেই সময় বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে কথা হয় উভয়পক্ষের। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান অস্থিরতার মধ্যেও সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য জ্বালানি অংশীদার।
এলপিজি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি
এই বৈঠকেই ভারতের রান্নার গ্যাসের সংকট মেটাতে দীর্ঘমেয়াদি এলপিজি (LPG) সরবরাহের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্ববাজারে ভারত দ্বিতীয় বৃহত্তম এলপিজি আমদানিকারক দেশ হওয়ায়, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভারতের হেঁশেল সচল রাখাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (IOCL) এবং এএনডিওসি (ADNOC)-এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি এলপিজি সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে ভারত স্থিতিশীল ও অগ্রাধিকারভিত্তিক এলপিজি সরবরাহ পাবে, যা আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে সাহায্য করবে। বর্তমানে ভারতের মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশই ইউএই থেকে পূরণ হয়।
ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় পদক্ষেপ
রান্নার গ্যাসের পাশাপাশি ভারতের ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ বা জরুরি তেল মজুত ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে একটি মউ (MoU) সই হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্তরে হঠাৎ তেলের দাম বৃদ্ধি বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশের তেলের জোগান স্বাভাবিক রাখতে এই চুক্তি ভারতের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। জরুরি অবস্থায় ভারতকে তেলের জোগান সচল রাখতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে আমিরশাহী। বর্তমানে আবু ধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি ই একমাত্র বিদেশি সংস্থা, যারা ভারতের ভূগর্ভস্থ তেল ভান্ডারে অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণ করে। নতুন চুক্তির ফলে সেই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে।
কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বে চুক্তি
জ্বালানি খাতের পাশাপাশি এই সফরে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও বড় অগ্রগতি হয়েছে। সফরের অন্যতম বড় সাফল্য হল ভারত ও ইউএই-র মধ্যে “স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স পার্টনারশিপ”-এর কাঠামোগত চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে শুধু যৌথ সামরিক মহড়াই নয়, উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির যৌথ উৎপাদন, গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাও আরও গভীর হবে।
গুজরাটে গড়ে উঠবে শিপ রিপেয়ার ক্লাস্টার
গুজরাটের ভাদিনারে একটি অত্যাধুনিক শিপ রিপেয়ার ক্লাস্টার গড়ে তোলার জন্যও সমঝোতা হয়েছে। এই প্রকল্প ভারতের সামুদ্রিক পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে। এখানে বাণিজ্যিক ও বড় তেলবাহী জাহাজ মেরামত করা সম্ভব হবে।
৫০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঘোষণা
সফরে ইউএই ভারতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা করেছে। এই বিনিয়োগ পরিকাঠামো প্রকল্প, আরবিএল-এর ঋণ সম্প্রসারণ এবং হাউজিং ফিনান্স সংস্থা সামান ক্যাপিটাল-এ আর্থিক সহায়তার জন্য ব্যবহার করা হবে। উল্লেখ্য, “কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট” স্বাক্ষরের পর ভারত ও ইউএই-র দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ইতিমধ্যেই ১০ হাজার কোটি ডলার অতিক্রম করেছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সেই বাণিজ্য ২০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়েছে দুই দেশ।
পাঁচ দেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফর প্রমাণ করল যে ভারত-ইউএই সম্পর্ক এখন শুধু বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিরক্ষা, আর্থিক পরিষেবা, সামুদ্রিক অবকাঠামো এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বেও দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত গভীর হচ্ছে। দেশের বাজারে পেট্রোল-ডিজেল ও সিএনজির দাম বৃদ্ধির পর দেশবাসীর উদ্বেগের মাঝেই, মোদির এই মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতি ভারতের অর্থনীতিকে স্বস্তি দেবে, বলে অনুমান বিশেষজ্ঞদের। পাঁচ দেশে সফরে শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এখান থেকে ইউরোপের চার দেশ যথাক্রমে নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন এবং ইটালিতেও যাবেন তিনি। মনে করা হচ্ছে, ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি সংকট এবং ভেঙে পড়া বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলা নিয়ে পাঁচ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে কথা হবে মোদির।
