Tag: University of Wisconsin-Madison

  • Nobel Prize: মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে কাজ, পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেলেন ফ্রান্সিস হালজেন

    Nobel Prize: মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে কাজ, পদার্থবিদ্যায় নোবেল পেলেন ফ্রান্সিস হালজেন

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মহাবিশ্বের বিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে এমন বিরল এক ধরনের মহাজাগতিক কণা নিউট্রিনোর রহস্য উন্মোচনে অসামান্য অবদানের জন্য পদার্থবিদ্যায় এ বছর নোবেল পুরস্কার (Nobel Prize) পেলেন বেলজিয়ান বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন। মঙ্গলবার তাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়।

    নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ (Nobel Prize)

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ ৮২ বছরের হালজেন জানান, ২০১৩ সালে মহাজাগতিক নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশের পর থেকেই তাঁকে নোবেল পুরস্কারের অন্যতম সম্ভাব্য প্রাপক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। প্রতি বছর তাঁর মনে হতো, নোবেল পাওয়ার সম্ভাবনা ২০ ভাগের মধ্যে এক ভাগ।

    সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমাকে শুধু এত দিন বেঁচে থাকতে হতো। আর তাই আমি এখানে।” হালজেন জানান, এই গবেষণা ছিল বিপুল সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টার ফল। নোবেল কমিটির তরফে ফোন আসার সময় তিনি নতুন একটি গবেষণা প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছিলেন। ইতালি থেকে ফোনে নোবেল কমিটির সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, “আমি আশা করি, এই পুরস্কারটি প্রস্তাবটি অনুমোদন পেতে সাহায্য করবে।” পুরস্কার ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে সেই ফোনালাপ সম্প্রচার করা হয়। তাঁর মন্তব্যে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে হাসির রোল ওঠে।

    নিউট্রিনো গবেষণায় নতুন জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ

    নিউট্রিনো হল অতি ক্ষুদ্র মহাজাগতিক কণা। এদের কোনও বৈদ্যুতিক আধান নেই এবং ভর অত্যন্ত সামান্য। ফলে সরাসরি শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু এই কণা সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। সূর্যের মতো নক্ষত্র থেকে নিউট্রিনো নির্গত হয় এবং প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি নিউট্রিনো আমাদের শরীরের মধ্য দিয়েও চলে যায়।

    বিজ্ঞানীরা সরাসরি এই রহস্যময় কণাগুলিকে দেখতে পারেন না। তাই অন্য পদার্থের কণার সঙ্গে নিউট্রিনোর সংঘর্ষের সময় কী ঘটে, তা পরিমাপ করে তাঁদের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়। নিউট্রিনো খুব কম ক্ষেত্রেই অন্য কণার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তাই সংঘর্ষ শনাক্ত করার সম্ভাবনা বাড়াতে বিজ্ঞানীরা বিশাল আকারের শনাক্তকারী যন্ত্র তৈরি করেন।

    হালজেনের ধারণা ছিল, অ্যান্টার্কটিকার বিস্তীর্ণ বরফকেই এমন একটি শনাক্তকারী হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। নোবেল কমিটির মতে, তাঁর গবেষণা অ্যান্টার্কটিকায় ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকেই দূরবর্তী ছায়াপথ থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোর প্রথম সন্ধান পাওয়া যায়।

    আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্সের চিফ এক্সিকিউটিভ মাইকেল মোলোনি বলেন, “অ্যান্টার্কটিকার এই পরীক্ষা মহাবিশ্বকে বোঝার এক বিপ্লবী পদ্ধতি, যা এর আগে আমাদের হাতে ছিল না।”

    বরফের নীচে বিশাল পর্যবেক্ষণকেন্দ্র

    পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের বরফের সঙ্গে কোনও নিউট্রিনোর সংঘর্ষ হলে সেখানে আলোর ঝলক তৈরি হয়। বিশেষ সেন্সর সেই আলোর সংকেত ধরে ফেলে। স্বচ্ছ বরফের কারণে অত্যন্ত ক্ষীণ সংকেতও শনাক্ত করা সহজ হয়। মহাজাগতিক রশ্মি ও বিকিরণের হস্তক্ষেপ থেকে যন্ত্রপাতিকে সুরক্ষিত রাখতে সেন্সরগুলি প্রায় ৮,২০০ ফুট বা ২,৫০০ মিটার গভীরে বরফের নীচে স্থাপন করা হয়েছে।

    নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হালজেন বলেন, “মানুষ সব সময় ভাবত, এটি একটি চমৎকার ধারণা, ঠিকই, কিন্তু এটি কখনও কাজ করবে না। সবচেয়ে বড় বিস্ময় হল, আমরা সত্যিই এটিকে কার্যকর করতে পেরেছি।”

    হালজেনের গবেষণা বিজ্ঞানীদের এমন এক রহস্যময় নিউট্রিনো জগতের পর্দা সরাতে সাহায্য করেছে, যা অন্যান্য ছায়াপথ এবং সামগ্রিকভাবে মহাবিশ্বের বিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।

    তবে এই গবেষণার কাজ ছিল অত্যন্ত ধীর ও শ্রমসাপেক্ষ। কারণ গবেষকদের মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা নিউট্রিনো এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে নির্গত নিউট্রিনোর মধ্যে পার্থক্য করতে হয়েছিল (Nobel Prize)।

    হালজেন বলেন, “আমরা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩,০০০ আধানযুক্ত কণা শনাক্ত করি। প্রতি সেকেন্ডের সেই ৩,০০০ কণার মধ্যে আমাদের এমন একটি কণা খুঁজে বের করতে হয়, যা প্রতিদিন মাত্র একবার পাওয়া যায়। আর মাসে এমন একটি কণা পাওয়া যায়, যার বিষয়ে আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারি। এটাই সমস্যাটির গাণিতিক বাস্তবতা।”

    তিনি বলেন, “এই গবেষণা দেখিয়েছে যে নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্ভব—এটি বাস্তব এবং এটি করা যায়। এটি আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, তা আমরা ভবিষ্যতেই দেখতে পাব। তবে মহাবিশ্বের দিকে তাকানোর কোনও নতুন জানালাই কখনও হতাশ করেনি।”

    অ্যান্টার্কটিকার এই পর্যবেক্ষণকেন্দ্রকে তিনি তুলনা করেছেন বরফ দিয়ে তৈরি একটি বিশাল চোখের সঙ্গে, যা আলোর বদলে নিউট্রিনোর মাধ্যমে মহাবিশ্বকে দেখতে পারে।

    ১৪ দেশের ৪০০-রও বেশি বিজ্ঞানীর সম্মিলিত গবেষণা

    আমেরিকার জাতীয় বিজ্ঞান ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এবং উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় আইসকিউব নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের গবেষণায় ১৪টি দেশের ৪০০-রও বেশি বিজ্ঞানী যুক্ত রয়েছেন।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য এরিকএম উইলকটস এক বিবৃতিতে বলেন, “আইসকিউব বিশ্বের অন্য কোনও দূরবীক্ষণযন্ত্রের মতো নয়। আর ফ্রান্সিস হালজেনের মতো বিজ্ঞানীও আর কেউ নেই। প্রায় এক মাইল বরফের নীচে নিউট্রিনো শনাক্তকারী যন্ত্র তৈরির তাঁর ধারণা এক অসাধারণ আন্তর্জাতিক ও বহু-প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার জন্ম দিয়েছে এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনায় মৌলিক পরিবর্তন এনেছে।”

    বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্টডে ভেভার সোশ্যাল মিডিয়ায় জানান, হালজেন হলেন নোবেল পুরস্কারজয়ী ১১তম বেলজিয়ান। তিনি এই পুরস্কারকে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম উপাদানগুলির মাধ্যমে তার বৃহত্তম রহস্যগুলির ওপর আলো ফেলার কাজে উৎসর্গ করা একটি জীবনের স্বীকৃতি বলে অভিহিত করেন।

    স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের মহাসচিব এলেন মুনস পুরস্কার ঘোষণা করেন। তিনিই এই মর্যাদাপূর্ণ অ্যাকাডেমির নেতৃত্ব দেওয়া এবং নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা প্রথম (Nobel Prize) মহিলা।

    নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য

    এ বছর নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। এই অর্থ কোনও একক পুরস্কারপ্রাপক, একাধিক পুরস্কারপ্রাপকের ছোট দল অথবা কোনও প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হতে পারে। গত বছর পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তিন বিজ্ঞানী। অতিপারমাণবিক কণার অদ্ভুত আচরণ এবং কোয়ান্টাম টানেলিং নিয়ে তাঁদের গবেষণা অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিমাপের পথ খুলে দেয়, যা চৌম্বকীয় অনুরণন চিত্রগ্রহণ প্রযুক্তিতে কাজে লাগে। একই গবেষণা উন্নত মোবাইল ফোন এবং আরও দ্রুতগতির কম্পিউটার তৈরির ভিত্তিও তৈরি করে। এ বছরের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরু হয় সোমবার চিকিৎসাবিজ্ঞানের পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার ক্ষেত্রে আলো ব্যবহারকারী একটি প্রযুক্তি তৈরিতে অবদানের জন্য তিন বিজ্ঞানীকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল দেওয়া হয়েছে। বুধবার রসায়ন এবং বৃহস্পতিবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। শুক্রবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর সোমবার ঘোষণা করা হবে অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার (Nobel Prize) প্রাপকের নাম।

     

LinkedIn
Share