মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ইতিহাসের সাক্ষী থাকল ভারতের সংসদ। বাদল অধিবেশনের শেষ দিনে বৃহস্পতিবার প্রথম ‘বন্দে মাতরম্’ গান (Vande Mataram in Lok Sabha) পরিবেশনের মাধ্যমে লোকসভার কার্যক্রম শুরু হল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী-সহ লোকসভার প্রায় পূর্ণাঙ্গ উপস্থিতির মধ্যেই জাতীয় গান পরিবেশিত হয়। ‘বন্দে মাতরম্’-এর ছয়টি স্তবক পরিবেশনের পর লোকসভার অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতুবি (sine die) করে দেওয়া হয়। একইভাবে জাতীয় গানের পর এদিনই রাজ্যসভার কার্যক্রমও শেষ হয়। তবে ঐতিহাসিক সূচনার মধ্যেও রাজনৈতিক উত্তেজনা কমেনি। ২০ জুলাই অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকেই একাধিক ইস্যুতে বারবার অচল হয়েছে সংসদের কাজ। শেষ দিনেও বিরোধীরা বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।
‘বন্দে মাতরম্’-কে আইনি সুরক্ষা
সংসদে এই প্রথম অধিবেশনের শেষ দিন ছয়টি স্তবক ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হল। কয়েক দিন আগে এই জাতীয় স্তোত্রকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিলে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সম্মতি দিয়েছেন। এক্ষেত্রে গানের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও প্রোটোকল নিয়েও কেন্দ্র আগে নির্দেশিকা জারি করেছিল। নতুন আইনে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া আটকানো বা ব্যাহত করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে ‘বন্দে মাতরম্’ জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে তুলনীয় আইনি সুরক্ষা পেল। এর আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সরকারি অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশনের জন্য নির্দিষ্ট প্রোটোকলও জারি করেছিল। ২৮ জানুয়ারির নির্দেশিকায় রাষ্ট্রপতির আগমন, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং রাজ্যপালদের ভাষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে গানটির ছয়টি স্তবক পরিবেশনের কথা বলা হয়।
রাজনৈতিক টানাপড়েনে ভরা
শেষ দিনের সূচনাটা যতটা তাৎপর্যপূর্ণ, অধিবেশনের শেষটা ততটাই রাজনৈতিক টানাপড়েনে ভরা। সকাল থেকেই বিরোধী সাংসদদের স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ চত্বর। লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা এ বার তাঁর স্বাভাবিক বিদায়ী ভাষণও দেননি। অধিবেশনে সংসদের কাজকর্ম এবং উৎপাদনশীলতার হিসেব তুলে ধরার রীতিও তাই এ বার দেখা গেল না। ২০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বাদল অধিবেশনের অধিকাংশ দিনই বারবার থমকে গিয়েছে। দিল্লিতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে পড়ুয়াদের আন্দোলনে পুলিশের পদক্ষেপ এবং অযোধ্যার রাম মন্দিরের অনুদান সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে বিরোধীরা আলোচনার দাবি জানিয়ে সরব ছিলেন। সরকারের সঙ্গে বিরোধীদের এই টানাপড়েনে সংসদের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রস্তুত, বিরোধীরা অপ্রস্তুত
বুধবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আলোচনায় বসার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন। বিরোধীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি। ছাত্রদের ইস্যুতে আলোচনার জন্য বিরোধীদের সঙ্গে পরামর্শ করে সময় বরাদ্দের জন্য তিনি স্পিকারকে অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু শেষ দিনেও সেই আলোচনার পথ মসৃণ হল না। সংসদ চত্বরের মকর দ্বারে এ দিন বিজেপি এবং বিরোধীদের পৃথক কর্মসূচি দেখা যায়। রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে স্লোগান তোলে বিজেপি। অন্য দিকে নিজেদের দাবিতে সরব থাকে বিরোধী দলগুলি। ওঠে দলিত প্রসঙ্গ। ফলে রাজনৈতিক সংঘাতের আবহেই শেষ হয় বাদল অধিবেশন। গোটা বাদল অধিবেশনে বিরোধীদের বিক্ষোভের জেরে দফায় দফায় মুলতুবি হয়ে গিয়েছে লোকসভা এবং রাজ্যসভার অধিবেশন। শাহের বিবৃতির দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়েছিল বিরোধী দলগুলি। এই আবহে বুধবার শাহ বলেন, “আমি সংসদীয় মন্ত্রী হিসাবে গোড়া থেকেই আলোচনা শুরুর জন্য বিরোধীদের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু বিরোধীরা পালাচ্ছেন। তাঁরা আসলে আলোচনা চান না।’’ শাহের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে রাহুল বলেন, “ছাত্রদের উপর কে গুলি চালাল? পেরেক লাগানো লাঠি দিয়ে ছাত্রদের মারার নির্দেশ কে দিল? যদি অমিত শাহ এই নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তা হলে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত। আমরা তাঁর বক্তৃতা শুনতে আগ্রহী নই।”
১২টি বিল পাশের দাবি সরকারের
বাদল অধিবেশনের বড় অংশই অচলাবস্থার কারণে নষ্ট হলেও সরকারের দাবি, এই সময়ের মধ্যে সংসদে মোট ১২টি বিল পাশ হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধীদের লাগাতার বিক্ষোভকেই সংসদের কাজ ব্যাহত হওয়ার জন্য দায়ী করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনায় বসা বা সংসদে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে সরকারের কোনও অনীহা ছিল না। তবে বিরোধীদের লাগাতার প্রতিবাদ ও হট্টগোলের কারণে সংসদের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়েছে। শেষ দিনেও সেই রাজনৈতিক অচলাবস্থার কোনও ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে সরব হন। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রাহুল গান্ধী যথাযথভাবে আলোচনায় অংশ নেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিজেপির অন্যান্য নেতারাও সংসদে বিরোধীদের আচরণ নিয়ে সরব হন। পাশাপাশি পাঞ্জাব ও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও বিরোধীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানান তাঁরা। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ একাধিক জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে সংসদে পর্যাপ্ত আলোচনা ও সরকারের জবাব পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
