মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশে (Bangladesh) হিন্দুদের (Hindu Community) উপর আক্রমণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। নৈরাজ্যের বাংলাদেশে আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনার খবর সামনে এসেছে। মঙ্গলবার বিকেলে চোর সন্দেহে একদল মানুষের তাড়া খেয়ে প্রাণ বাঁচাতে খালে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৫ বছর বয়সি এক হিন্দু যুবকের (Hindu Young Man)। মৃতের নাম মিঠুন সরকার। তিনি বাংলাদেশের ভান্ডারপুর গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশ খাল থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার করে। অভিযোগ, চোর সন্দেহে একদল উন্মুক্ত জনতা তাঁকে তাড়া করে। ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করেনি বাংলাদেশ পুলিশ প্রশাসন। এমনকী মিঠুনের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ নিয়েও কিছু জানাতে ব্যর্থ বাংলাদেশ পুলিশ। তাহলে কী সত্যিই সে চোর নাকি শুধু হিন্দু হওয়ার অপরাধেই ফের অকালে ঝড়ে গেল আরও একটি প্রাণ?
কী ঘটেছিল মিঠুনের সঙ্গে
পুলিশ এবং প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, চোর সন্দেহে মঙ্গলবার দুপুরে হাট চকগৌরি বাজার এলাকায় বেশ কিছু যুবক মিঠুনকে ধাওয়া করে। প্রাণে বাঁচতে দৌড় শুরু করেন মিঠুন। জনতার হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে রাস্তার পাশে একটি খালে ঝাঁপ দেন। এরপর থেকেই আর মিঠুনের খোঁজ মিলছিল না। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পরেও তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। শেষমেশ রাজশাহী এলাকা থেকে ডুবুরি আনিয়ে শুরু হয় খোঁজ। জানা যায়, বিকেলের দিকে ভেসে ওঠে মিঠুনের নিথর দেহ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। মহাদেবপুর উপজেলার নওহাটা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ গোলাম মোস্তাফা জানিয়েছেন, দেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে চুরির যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে তদন্ত চলছে বলে জানান ওই পুলিশ আধিকারিক।
বাংলাদেশে হিন্দুদের উপরে নির্যাতনের ছবি ক্রমশ ভয়ংকর
বছরের শেষদিনে খোকন দাস নামের এক হিন্দু ব্যক্তিকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে উন্মত্ত জনতা। প্রাণে বাঁচতে পুকুরে ঝাঁপা দেন। কিন্তু মার খেয়ে আধ-মরা হয়ে যান খোকন। দিনদুয়েক পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। এরও আগে ময়মনসিংহের ভালুকায় খুন হন বজেন্দ্র বিশ্বাস। সহকর্মীর গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়। সোমবার যশোর জেলায় অজ্ঞাত হামলাকারীরা এক হিন্দু ব্যবসায়ী ও একটি খবরের কাগজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে মাথায় গুলি করে হত্যা করে। একই দিনে নরসিংদী শহরে ৪০ বছরের এক হিন্দু মুদি দোকানদারকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে খুন করা হয়। সবমিলিয়ে গত তিন সপ্তাহে বাংলাদেশে হিংসার শিকার হয়েছেন একাধিক সংখ্যালঘু হিন্দু। বাদ পড়ছেন না মহিলারাও। সম্প্রতি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এক বিধবা হিন্দু মহিলাকে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এমনকী নারকীয় নির্যাতনের ভিডিও করে তা সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয় দুই অভিযুক্ত। সামগ্রিক ভাবেই সংখ্যালঘুদের উপরে নির্যাতনের ছবিটা ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে ইউনূসের ‘নতুন’ বাংলাদেশে।
মিথ্যা অপবাদ, অসহায় মৃত্যু
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, চোর সন্দেহে তাড়া করা হয়েছিল মিঠুন সরকারকে। মারমুখি মানুষের হাত থেকে রক্ষা পেতে পালাচ্ছিলেন তিনি। শেষে বাঁচার তাগিদে খালের জলে ঝাঁপ মেরেছিলেন ২৫ বছর বয়সি যুবক। সেই অবস্থায় প্রবল ঠান্ডায় জলে ডুবে মৃত্যু হয় তাঁর। ঘটনাটি ঘটেছে নওগাঁয়ের মহাদেবপুরে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। তবে তিনি চুরি করেছিলেন কি না এই বিষয়ে কোনও প্রমাণ পুলিশ পায়নি বলে জানানো হয়েছে। ফলে এই ঘটনায় ফের একবার প্রশ্নের মুখে ইউনুস সরকার।
ভোটের আগে সংখ্যালঘুদের আতঙ্কিত করাই উদ্দেশ্যে
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান একতা পরিষদ জানিয়েছে, শুধুমাত্র ডিসেম্বর মাসেই অন্তত ৫১টি লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছে ১০টি হত্যাকাণ্ড। এছাড়াও অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও লুটপাটের ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। ইউনিটি কাউন্সিল একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, এর মধ্যে ১০টি খুন, চুরি ও ডাকাতির ১০টি ঘটনা, বাড়িঘর বা কোনও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান জবরদখল করার পাশাপাশি মন্দির ও জমি লুটের ২৩টি ঘটনা ঘটেছে ৷ ধর্মের নামে ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর চর হওয়ার মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার ও অত্যাচারের ঘটনা ঘটেছে ৪টি ৷ শুধু তাই নয়, একটি ধর্ষণের চেষ্টা এবং তিনটি শারীরিক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৷ হিংসার এই ধারাবাহিকতা জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেও বজায় রয়েছে ৷পরিষদের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই সহিংসতা সম্ভবত ফেব্রুয়ারি ১২-এর ভোটের আগে সংখ্যালঘুদের আতঙ্কিত করার উদ্দেশ্যে সংগঠিত। পরিষদের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, “বাংলাদেশ আগেও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছে, তবে এই মুহূর্তের পরিস্থিতি বিপজ্জনক, সংস্থা-নির্ভরতা দুর্বল এবং সংখ্যালঘুদের ওপর আঘাতের ঝুঁকি বেড়েছে।”
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ
একটি প্রতিবেদনে ঐক্য পরিষদ উল্লেখ করেছে, “বাংলাদেশ অতীতেও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সাম্প্রদায়িক আতঙ্ক একসঙ্গে বিপজ্জনক রূপ নিচ্ছে।” মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্র নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতা সেটাই বারে বারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে সেই উত্তর নেই কারও কাছে।
