মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আইপ্যাক মামলায় (IPAC Raid Case) সুপ্রিম দুয়ারে অ্যাডভান্টেজ ইডি। ইডির বিরুদ্ধে পুলিশের দায়ের করা এফআইআরের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করল সুপ্রিম কোর্ট। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি, পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত পুলিশি তদন্তের উপরেও স্থগিতাদেশ দিল শীর্ষ আদালত। মামলায় সব পক্ষকে (ইডির বিরুদ্ধে মামলাকারী সব পক্ষ) নোটিস জারি করেছে দুই বিচারপতির বেঞ্চ। দু’সপ্তাহের মধ্যে তাদের আদালতে হলফনামা জমা দিতে হবে। যে দুই এলাকায় ইডি তল্লাশি চালিয়েছে, সেখানে এবং তার আশপাশের এলাকার সব সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
পুলিশের এফআইআর-এ স্থগিতাদেশ
কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবিই বৈধতা পেল দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। শেক্সপিয়র সরণী এবং সল্টলেকের ইলেকট্রনিক্স কমপ্লেক্স থানায় ইডি-র (IPAC Raid Case) বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া চারটি এফআইআর-এই স্থগিতাদেশ দিল আদালত। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বজায় থাকবে। অর্থাৎ ওই সময়কাল পর্যন্ত পুলিশের দায়ের করা এফআইআর-এর ভিত্তিতে কোনও তদন্ত হবে না। আদালত জানিয়েছে, উপযুক্ত অনুমতি এবং নথি নিয়ে কেউ তদন্ত করতে চায়, তাহলে তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্নের জায়গা থাকে না। এই ঘটনার শুরু থেকেই ইডি (IPAC Raid Case) দাবি করছিল, যেভাবে তদন্তকারী অফিসারদের বিরুদ্ধে কলকাতা পুলিশ এবং বিধাননগর পুলিশের এফআইআর দায়ের করেছে, তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নিয়ম মেনেই তদন্ত করতে গিয়েছিলেন ইডি-র অফিসাররা। তথ্য নষ্ট করতে, ইডি-র অফিসারদের হেনস্থা করতেই পুলিশ এফআইআর দায়ের করেছে। তাই পুলিশের দায়ের করা এফআইআরগুলির উপর স্থগিতাদেশ দিতে এদিন আদালতে আর্জি জানায় ইডি। সেই মতোই চারটি এফআইর-এ স্থগিতাদেশ জারি করল আদালত।
মমতার নিয়ে যাওয়া নথি সংরক্ষণের নির্দেশ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তল্লাশির মাঝে সেদিন প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে যে সমস্ত জিনিস, ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস নিয়ে গিয়েছিলেন, তা সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তা যাতে কোনওভাবে বিকৃত করা না হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে তদন্তকারীকে। পাশাপাশি এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র ও বিচারপতি বিপুল মনুভাই পাঞ্চোলির বড় পর্যবেক্ষণ, কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার যেমন নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপ কাম্য নয়, তেমনই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী এজেন্সি যদি স্থানীয় থানার অনুমোদনপত্র হাতে নিয়ে বৈধ তদন্ত করে, তাহলেও তা আইনসিদ্ধ।
ইডি-র তদন্ত আইনসিদ্ধ
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ইডি (ED At Supreme Court) তাদের নির্বাচনী তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে গোড়া থেকে দাবি করে আসছিল তৃণমূল। যদিও ইডি-র দাবি ছিল, রাজনীতির সঙ্গে তাদের তদন্তের কোনও সংযোগ নেই। কয়লাপাচার নিয়ে তদন্ত চলছে। সেই নিয়ে এদিন শীর্ষ আদালত জানায়, উপযুক্ত অনুমতি এবং নথি নিয়ে তদন্ত করতে গেলে, সেই সংস্থার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থাকে না। অর্থাৎ ইডি যদি উপযুক্ত তথ্য়ের ভিত্তিতে, আইন মেনে তদন্ত চালায়, তাহলে তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না।
রাজ্যের হস্তক্ষেপ গুরুতর বিষয়
সুপ্রিম কোর্ট এদিন জানিয়েছে, ইডি (ED At Supreme Court) বা কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির কাজে রাজ্যের সংস্থার হস্তক্ষেপ গুরুতর বিষয়। প্রত্যেক সংস্থা যাতে স্বতন্ত্রভাবে তদন্ত করতে পারে, তা দেখতে হবে। দেশে আইনের শাসন বজায় রাখা এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সংস্থা যাতে স্বাধীন ভাবে নিজের কাজ করতে পারে, তার জন্য এই বিষয়টি খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি। এটা দেখা দরকার— যাতে কোনও অপরাধী রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার আড়ালে লুকিয়ে রক্ষা না পেয়ে যান। এই মামলায় বহু বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। এই প্রশ্নগুলোর যদি মীমাংসা না হয়, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এবং দেশের এক বা একাধিক রাজ্যে আইন না মানার অবস্থা তৈরি হতে পারে। কারণ, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দল সরকার চালাচ্ছে।
ইডি সৎ উদ্দেশ্যেই কাজ করেছে
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, এটা ঠিক যে, কোনও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থারই কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কাজে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। আবার একই সঙ্গে আদালতের প্রশ্ন, যদি কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থা সৎ উদ্দেশ্যে কোনও গুরুতর অপরাধের তদন্ত করে, তাহলে কি শুধুমাত্র এটা দলের কাজ এই অজুহাতে তাদের তদন্ত চালানোর ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা যেতে পারে? পিএমএলএ আইনের ৬৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী যদি ইডি অফিসারেরা অনুমোদনপত্র নিয়ে তল্লাশি চালিয়ে থাকেন, তা হলে ধরে নেওয়া যায় যে তাঁরা সৎ উদ্দেশ্যে কাজ করছিলেন।
সব পক্ষকেই নোটিস
এই মামলায় সব পক্ষকেই নোটিস দিয়েছে আদালত। পশ্চিমবঙ্গ সরকার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গের ডিজিপি রাজীব কুমার, কলকাতা পুলিশের কমিশনার মনোজ ভার্মা, দক্ষিণ কলকাতার ডেপুটি কমিশনার প্রিয়ব্রত রায়ের আইনজীবীকেও নোটিস দেওয়া হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা জমা দিতে হবে সকলকে। পাশাপাশি, প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতর এবং তার আশেপাশের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সমস্ত নথিপত্রও সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। সব পক্ষের বক্তব্য শুনে চূড়ান্ত রায়দান করবে আদালত।
মমতার প্যাটার্ন
বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র স্পষ্ট করে বলে দেন, এই মামলা অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইডি- বা কোনও তদন্তকারী সংস্থার হাতে যদি ‘অথরাইজেশন লেটার’ থাকে, তাহলে তদন্ত চালিয়ে যেতে পারবেন। অর্থাৎ প্রতীক জৈন কিংবা এই তদন্ত যাঁদের বিরুদ্ধে হচ্ছে, তাঁদের কোনও নিরাপত্তার মোড়ক দেওয়া হয়নি। অর্ডার দেওয়ার আগে বিচারপতি এও তুলে ধরেন, কীভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর আগেও কেন্দ্রীয় এজেন্সির কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন। কার্যত এটা একটা প্যাটার্নে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিচারপতি। একই সঙ্গে কলকাতায় ইডি-সিবিআই অফিসারদের তদন্তের বিরুদ্ধে যেভাবে ধরনা হয়েছে, বিক্ষোভ হয়েছে, সেটাও অর্ডার দেওয়ার আগে বিচারপতি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি, হাইকোর্টে কেন শুনানি শুনানি হবে না, সেই প্রশ্ন তোলা হয় রাজ্যের তরফে। তবে আদালত জানিয়েছে, বৃহত্তর প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। তাই সুপ্রিম কোর্টেই শুনানি হবে। মামলার পরবর্তী শুনানি ৩ ফেব্রুয়ারি।