মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: নাগরিকত্ব আইন বরাবরই পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। গত ১১ মার্চ থেকে কার্যকর হয়েছে সিএএ। নাগরিকত্ব আইনের (CAA) বাস্তবায়নের প্রয়োজন ঠিক কতটা— এনিয়ে একাধিক সমীক্ষা করা হয় কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিজেপির পক্ষ থেকে। প্রতিটি সমীক্ষাতেই উঠে আসে নাগরিক আইনের বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা। সম্প্রতি, একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তরফে একটি সমীক্ষা চালানো হয়। তাতে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। সমীক্ষা অনুযায়ী, কেন্দ্রের মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের ৮ লোকসভা আসনে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে এবং তা বিজেপিকে বিপুল অক্সিজেন জোগাবে।
কেন সিএএ-র প্রয়োজন ছিল?
এই আইনকে বাস্তবায়নের প্রয়োজন কেন হল? তার কারণ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বিভিন্ন সমীক্ষা চালায় পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে। ওই সমীক্ষায় উঠে আসে বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয়ভাবে অত্যাচারিত হয়ে আসা সেদেশের সংখ্যালঘু শরণার্থীরা অসম এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করছেন। তাঁদের কাছে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পায় নিজেদের নাগরিকত্বের বিষয়টি। মতুয়া-নমঃশূদ্র-রাজবংশী, মূলত এই তিন উদ্বাস্তু সমাজের কাছে জীবন-জীবিকার মতোই গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকত্ব (CAA)।
মতুয়া-নমঃশূদ্র-রাজবংশীরা সমর্থন করবে বিজেপিকে
গেরুয়া শিবিরের আভ্যন্তরীণ সমীক্ষা অনুযায়ী, নদিয়া এবং উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে প্রভাব ফেলবে মোদি সরকারের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের ২টি লোকসভার আসনে বিপুল প্রভাব পড়বে এই আইনের বাস্তবায়ন। এর প্রতিফলন ভোট বাক্সে যে দেখা যাবে তাও ওই অভ্যন্তরীণ সমীক্ষায় উঠে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী মতুয়া-নমঃশূদ্র-রাজবংশীরা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে দু’হাত তুলে ভোট দেবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ১০ থেকে ১৫ শতাংশই মতুয়া
দেশভাগের সময় থেকে ধর্মীয়ভাবে অত্যাচারিত হয়ে দলে দলে মতুয়া সমাজ এবং নমঃশূদ্র সমাজ পশ্চিমবঙ্গে আসতে শুরু করে। ভিটেমাটি ছেড়ে আসা মানুষগুলোর জন্য বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর তৈরি করেন ঠাকুরনগর। সে সময় উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষজনদেরকে সীমান্ত অঞ্চলগুলিতে থাকার জায়গার বন্দোবস্ত করতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন (CAA) প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনও তথ্য এখনও পর্যন্ত নেই যে কত সংখ্যায় মতুয়া ও নমঃশূদ্ররা পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান জনসংখ্যার ১০ থেকে ১৫ শতাংশই হল মতুয়া সমাজের। ৫টি লোকসভা আসনে মতুয়া ভোট নির্ণায়ক শক্তি বলে মনে করা হয়। এর প্রত্যেকটিই দক্ষিণবঙ্গে অবস্থিত। যার মধ্যে ২০১৯ সালে রাণাঘাট ও বনগাঁ আসন ২টি জিততে সমর্থ হয় বিজেপি। অন্যদিকে, মতুয়াদের সাপেক্ষে কম সংখ্যায় বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে এসেছিলেন রাজবংশী এবং নমঃশূদ্র সমাজ। বিগত নির্বাচনগুলিতে এই দুই সমাজও বিজেপিকে দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করেছে। মূলত শরণার্থীদের সমর্থনে ভর করেই উত্তরবঙ্গের তিনটি মতুয়া-নমঃশূদ্র-রাজবংশী অধুষ্যিত লোকসভা আসন জেতে বিজেপি। জলপাইগুড়ি, কোচবিহার এবং বালুরঘাট এই তিন লোকসভা কেন্দ্রে উদ্বাস্তুদের মোট জনসংখ্যা হল ৪০ লাখ।
২০২৪ সালে বাংলার উদ্বাস্তু ভোট যাবে বিজেপির ঝুলিতে
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাব থাকা সত্ত্বেও লোকসভা ভোটে উত্তর ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ব্যাপক ফলাফল করে বিজেপি। এবং যার কারণ একটাই ছিল, নাগরিকত্ব আইনের প্রতিশ্রুতি। দক্ষিণবঙ্গের নদিয়া জেলাতেও মতুয়া ভোট (CAA) হল বড় ফ্যাক্টর। তৃণমূল কংগ্রেস এই জেলার ১৭টি বিধানসভা আসনের মধ্যে মাত্র ৬টিতে এগিয়ে থাকতে পেরেছিল। অন্যদিকে, বিজেপি বাকিগুলিতে এগিয়ে যায়। এর পাশাপাশি মতুয়ারা উত্তর চব্বিশ পরগনার এবং নদিয়া মিলিয়ে মোট ছ’টি লোকসভা আসনে নির্ণায়ক শক্তি। মনে করা হচ্ছে, ২০২৪ সালের বেশিরভাগ মতুয়া ভোট বিজেপির ঝুলিতেই যেতে চলেছে।
কী বলছেন কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ আধিকারিক
এই ৩ উদ্বাস্তু সমাজই দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের নাগরিকত্বের দাবি তুলে আসছিল। বলে রাখা প্রয়োজন, ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে কে নাগরিক তা ঠিক করা হয় ভারতের সংবিধান এবং ১৯৫৫ সালের নাগরিক আইন অনুসারে। ভোটার কার্ড, আধার কার্ড কিংবা রেশন কার্ড- এর কোনওটাই নাগরিকত্বের পরিচয় বহন করে না। একজন শীর্ষ বিজেপি নেতা উদ্বাস্তু অধ্যুষ্যিত (CAA) এই আসনগুলিতে সমীক্ষা চালান। তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গের ৩০ থেকে ৩৩টি বিধানসভার এমন আসন রয়েছে, যেগুলোতে মতুয়া ভোট ৪০ শতাংশের উপরে রয়েছে। এর বেশিরভাগটাই উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদিয়াতে। এই বিধানসভার আসনগুলিকে যোগ করলে মোট পাঁচ থেকে ছয়টি লোকসভার আসন হয়। কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের এক শীর্ষ আধিকারিকের মতে, ‘‘মাঝখানে অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে কিন্তু তবুও নির্বাচনী ইস্তাহারে বিজেপি সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ২০১৯ সালে, তা বাস্তবায়ন করেছে।’’
করোনা মহামারীর কারণে বাস্তবায়নে দেরী
প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসেই সংসদের উভয়কক্ষে পাশ হয় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ ওই আইনে স্বাক্ষরও করেন। কিন্তু তার পরবর্তীকালে করোনা মহামারী চলে আসে। এ কারণে বাস্তবায়ন হতে বেশ কিছুটা বিলম্ব হয় এই আইনের। চলতি সপ্তাহের সোমবারই নাগরিকত্ব আইনকে কার্যকর করা হয়েছে। প্রত্যাশা মতোই এই আইন বাস্তবায়িত হতেই বিরোধিতা শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং উত্তরপ্রদেশের বিজেপি বিরোধী শক্তি। নাগরিক আইনের সঙ্গে নাগরিকত্ব হারানোর কোনও সম্পর্ক না থাকলেও, সেকথাই বারবার উঠে আসছে বিরোধীদের ভাষণে। যদিও আইন (CAA) অনুযায়ী, ৩ প্রতিবেশী দেশ – আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয়ভাবে অত্যারিত হয়ে আসা ৬ সংখ্যালঘু (হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি এবং খ্রিস্টান) সম্প্রদায়কে নাগরিকত্ব প্রদানের কথা বলা হয়েছে এখানে।
২০১৯ সালে বিজেপির নির্বাচনী ইস্তাহারে ছিল নাগরিকত্ব আইন
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে ভারতীয় জনতা পার্টি নাগরিকত্ব আইন চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। মনে করা হচ্ছে সেই প্রতিশ্রুতিতেই ভর করে পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া-নমঃশূদ্র-রাজবংশী অধ্যুষিত আসনগুলিতে বিজেপি ব্যাপক ভোট পায়। প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় তৎকালীন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। সেই প্রতিশ্রুতিই পূরণ হল নাগরিকত্ব আইন কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে। ২০১৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ‘পাসপোর্ট আইন’ ও ‘বিদেশি আইন’ সংশোধন করে। এর ফলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় কারণে উদ্বাস্তু হয়ে আসা সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব লাভের পথ অনেকটাই প্রশস্ত হয়ে যায়। উদ্বাস্তু মানুষরা যাতে ভারতের নাগরিকত্ব পেতে পারেন তার প্রচেষ্টা করে বিজেপি।
২০১৬ সালে সংসদে পেশ হয় সিএএ
২০১৬ সালের ১৯ জুলাই ভারতের সংসদে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৬’ পেশ করে মোদি সরকার। লোকসভায় এই বিল পাশ হলেও তা রাজ্যসভায় আটকে যায়। এরই মাঝে বিজেপি সরকার আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আগত ৬ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদান করার সুবিধার্থে একটি ‘অধ্যাদেশ’ জারি করে। যদিও ছয় মাস পরে নিয়ম অনুসারে ওই ‘অধ্যাদেশ’-এর কার্যকাল শেষ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে বিলটিকে আলোচনার জন্য সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হয়। ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি সংসদে কমিটির রিপোর্ট জমা পড়ে। পরে ২০১৯ সালের ৮ জানুয়ারি লোকসভায় ফের পাশ হয় ওই বিল। কিন্তু তা থমকে যায় রাজ্যসভায়। এরই মাঝে ১৬তম লোকসভা ভেঙে যায় এবং দেশে নির্বাচন ঘোষণা হয়। নির্বাচনে ফের ক্ষমতায় আসে বিজেপি সরকার এবং পাশ করে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। অর্থাৎ ২০১৯ সালের নির্বাচনে লড়তে যাওয়ার আগে বিজেপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা নির্বাচনে জেতার পরেই পূরণ করতে সক্ষম হয় মোদি সরকার। প্রয়োজন ছিল নাগরিকত্ব আইনের বাস্তবায়নের এবং ঠিক সেই মতো ২০২৪ সালের লোকসভা ভোট ঘোষণার আগেই তা কার্যকর করল বিজেপি সরকার (CAA)।
দেশের খবর, দশের খবর, সব খবর, সবার আগে পেতে ফলো করুন আমাদের Facebook, Twitter এবং Google News পেজ।