Tag: World Food Day 2026

  • World Food Day 2026: খাদ্যে স্বনির্ভরতা থেকে পুষ্টি সুরক্ষা, কৃষিক্ষেত্রে মোদি সরকারের একাধিক উদ্যোগ

    World Food Day 2026: খাদ্যে স্বনির্ভরতা থেকে পুষ্টি সুরক্ষা, কৃষিক্ষেত্রে মোদি সরকারের একাধিক উদ্যোগ

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আজ বিশ্ব খাদ্য দিবস। ২০২৬ সালের জন্য রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-র নির্ধারিত থিম ‘ইনোভেট টুডে, নারিশ টুমরো’—অর্থাৎ, ‘আজ উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি সুনিশ্চিতকরণ’। এই প্রেক্ষাপটে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা এবং পুষ্টি সুরক্ষার ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একসময় খাদ্যসংকট মোকাবিলায় বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভর করতে হত ভারতকে। ১৯৬০-এর দশকে ‘শিপ-টু-মাউথ’ পরিস্থিতিতে বিদেশ থেকে আসা খাদ্যশস্যের উপর নির্ভরশীল ছিল দেশ। সেখান থেকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আজ ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কৃষি বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার গত এক দশকে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচের সম্প্রসারণ, উন্নত বীজের ব্যবহার এবং খাদ্যবণ্টন ব্যবস্থার উন্নয়নে একাধিক পদক্ষেপ করেছে।

    ৮১ কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্য সুরক্ষা

    কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রকের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন বেড়ে ৩৭৬.৫৬ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে। চাল উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি দুধ ও মিলেট উৎপাদনে ভারত বিশ্বে প্রথম এবং মাছ, ফল ও সবজি উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রের অন্যতম বড় কর্মসূচি প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা (PMGKAY)। জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন (NFSA)-এর আওতায় প্রায় ৮১.৩৫ কোটি উপভোক্তা এই ব্যবস্থার সুবিধা পাচ্ছেন। কোভিড অতিমারির সময় চালু হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় বিনামূল্যে খাদ্যশস্য সরবরাহের মেয়াদ ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আরও পাঁচ বছর, অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্রের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারগুলির খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের আর্থিক চাপও কমানো সম্ভব হয়েছে। প্রকল্পটির জন্য মোট ১১.৮০ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি হিসেবে এই প্রকল্প দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

    পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল ও অপুষ্টি মোকাবিলায় উদ্যোগ

    শুধু পেট ভরলেই খাদ্য নিরাপত্তা সম্পূর্ণ হয় না। শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের অভাব বা ‘হিডেন হাঙ্গার’ দূর করাও সমান জরুরি। বিশেষত মহিলা ও শিশুদের মধ্যে রক্তাল্পতা এবং অন্যান্য পুষ্টির ঘাটতি মোকাবিলায় চালের পুষ্টিগুণ বৃদ্ধির উপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্র। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশজুড়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল সরবরাহের কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই চালের সঙ্গে আয়রন, ফলিক অ্যাসিড ও ভিটামিন বি১২ যুক্ত করা হচ্ছে। গণবণ্টন ব্যবস্থা (PDS) এবং পিএম-পোষণ প্রকল্পের আওতায় এই চাল সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির জন্য মোট ১৭,০৮২ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদ (ICAR) ১০০টিরও বেশি পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসলের নতুন জাত তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই উদ্যোগগুলির লক্ষ্য, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় পুষ্টির পরিমাণ বাড়ানো।

    ‘শ্রী অন্ন’-এর প্রচার, মিলেটে বিশ্ববাজারের নজর

    জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং জলের ক্রমবর্ধমান চাহিদার মধ্যে মিলেট বা বাজরা-জাতীয় শস্যের গুরুত্ব বাড়ছে। তুলনামূলকভাবে কম জলে এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় এই শস্য চাষ করা সম্ভব হওয়ায় কৃষকদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। ভারতের উদ্যোগে রাষ্ট্রসংঘ ২০২৩ সালকে আন্তর্জাতিক মিলেট বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। দেশীয় এই শস্যকে ‘শ্রী অন্ন’ নামে প্রচারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা চলছে। মিলেট প্রক্রিয়াকরণ, কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপ এবং রফতানি বৃদ্ধির উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই শস্যের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন কৃষকদের আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে তেমনই জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় কৃষিক্ষেত্রের সহনশীলতাও বাড়তে পারে।

    ডাল ও ভোজ্যতেলে স্বনির্ভরতার লক্ষ্য

    খাদ্যশস্য উৎপাদনে ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও ডাল ও ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। সেই নির্ভরতা কমাতে কেন্দ্র ডাল উৎপাদন বৃদ্ধি এবং তৈলবীজ চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫-২৬ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবর্ষ পর্যন্ত জাতীয় ডাল স্বনির্ভরতা মিশনের জন্য ১১,৪৪০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে ডালের চাহিদা মেটাতে দেশীয় উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। অন্যদিকে, দেশের মোট ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নির্ভরতা কমাতে জাতীয় ভোজ্যতেল মিশন—অয়েল পাম প্রকল্পের অধীনে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্য এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পাম তেলের চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিদেশি মুদ্রার সাশ্রয় এবং দেশীয় কৃষকদের আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

    ডিজিটাল কৃষি ও কৃষকদের আর্থিক সহায়তা

    কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতেও একাধিক প্রকল্প চালু করেছে কেন্দ্র। ডিজিটাল এগ্রিকালচার মিশন বা এগ্রিস্ট্যাকের জন্য ২,৮১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর আওতায় কৃষকদের জমির ডিজিটাল তথ্যভান্ডার, কৃষিকাজে ড্রোনের ব্যবহার এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো প্রযুক্তির উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পাঠানো হচ্ছে। সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই প্রকল্পে ১১ কোটিরও বেশি কৃষকের অ্যাকাউন্টে সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর বা DBT-র মাধ্যমে ৩ লক্ষ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাঠানো হয়েছে। কৃষকদের বীজ, সার এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণ কেনার ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা জোগানোই এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য। এর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কৃষিকাজের খরচ নিয়ন্ত্রণেও সুবিধা হতে পারে।

    কৃষি রফতানি ও বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তায় ভারতের ভূমিকা

    দেশীয় খাদ্য চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও ভারতের কৃষিপণ্যের গুরুত্ব বাড়ছে। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের মোট কৃষিপণ্য রফতানির পরিমাণ ৫৩.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। নন-বাসমতি চাল রফতানির উপর ন্যূনতম রফতানি মূল্য ও অন্যান্য বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় চালের সরবরাহ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে খাদ্যশস্য সরবরাহের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটের সময় খাদ্য সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভারতের ভূমিকা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’—অর্থাৎ, ‘সমগ্র বিশ্ব এক পরিবার’—দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তায় ভারতের অবদান তুলে ধরছে কেন্দ্র।

    খাদ্য নিরাপত্তা থেকে পুষ্টি সুরক্ষা—নতুন চ্যালেঞ্জ

    বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬-এ ভারতের কৃষিক্ষেত্রের অগ্রগতি যেমন সামনে এসেছে, তেমনই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, বিনামূল্যে রেশন, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা এবং কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার—এই সমস্ত উদ্যোগের লক্ষ্য দেশের খাদ্য ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা। তবে উৎপাদনের সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টি সুরক্ষায় রূপান্তরিত করতে হলে অপুষ্টি মোকাবিলা, কৃষকদের ন্যায্য আয়, জলসম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপরও গুরুত্ব দিতে হবে। বিদেশি সাহায্যনির্ভরতা থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খাদ্য উৎপাদক দেশে পরিণত হওয়ার যাত্রায় ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন সেই অগ্রগতির পরবর্তী লক্ষ্য—প্রতিটি মানুষের কাছে পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য পৌঁছে দেওয়া এবং একই সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রকে আরও স্বনির্ভর ও টেকসই করে তোলা।

LinkedIn
Share