তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
ফের চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গি! তবে একা ডেঙ্গি নয়! কলকাতা ও তার আশপাশের জেলায় মশাবাহিত জোড়া রোগ, ডেঙ্গি এবং ম্যালেরিয়ায় আক্রমণে প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়ছে। তাই বাড়তি সক্রিয়তার পথে হাঁটছে প্রশাসন। আজ, মঙ্গলবার, প্রশাসনের শীর্ষ মহলের জরুরি বৈঠক হতে চলেছে! মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে পরামর্শ করে এবার ডেঙ্গি ও ম্যালেরিয়া রুখতে কয়েকটি বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে স্বাস্থ্য দফতর।
কেন প্রশাসনের উদ্বেগ?
বছরের এই মরশুমে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবর মাসেই রাজ্যে ভেক্টর বোর্ন ডিজিজের প্রকোপ বাড়ে। অর্থাৎ, বিভিন্ন পতঙ্গ বাহিত রোগের দাপট বাড়ে। বিশেষত মশাবাহিত রোগের প্রকোপে জেরবার হয় বঙ্গবাসী। চলতি বছরেও তার ব্যতিক্রম নয়। অগাস্টের শেষ সপ্তাহে স্বাস্থ্য ভবনের রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, কলকাতা, হাওড়া, উত্তর চব্বিশ পরগনা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, নদিয়া এবং মুর্শিদাবাদের মতো জেলায় ডেঙ্গির প্রকোপ বাড়ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ম্যালেরিয়া। তাই সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই প্রশাসন কড়া হাতে ডেঙ্গি ও ম্যালেরিয়া মোকাবিলার প্রক্রিয়া শুরু করতে চায়। অক্টোবর মাসে ডেঙ্গির দাপট সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। প্রশাসনের একাংশ জানাচ্ছেন, মশাবাহিত রোগের প্রকোপ কমাতে তাই সবরকম প্রশাসনিক পরিকল্পনা জরুরি। সেটা আগাম না করলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। তাই ডেঙ্গি রুখতে বিশেষ বৈঠক হবে।
কী বলছে স্বাস্থ্য দফতরের রিপোর্ট?
স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, অগাস্ট মাসে রাজ্যে নতুন করে ১০০০ জন ডেঙ্গি আক্রান্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গির প্রকোপ দেখা গিয়েছে কলকাতা, হাওড়া, মুর্শিদাবাদ এবং দুই চব্বিশ পরগনায়। ইতিমধ্যে ৭ জন ডেঙ্গি আক্রান্তের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যু তালিকায় রয়েছে ১১ বছরের স্কুল পড়ুয়া থেকে প্রৌঢ়! আর এই মৃত্যু মিছিল রুখতেই প্রশাসনের বাড়তি সক্রিয়তা। ডেঙ্গির পাশপাশি কলকাতার কসবা, যাদবপুর, শোভাবাজার, গিরিশ পার্ক, কলেজ স্ট্রিট সহ একাধিক এলাকায় ম্যালেরিয়ার দাপট উদ্বেগজনক। আবার হাওড়াতেও ম্যালেরিয়ার প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য ভবনের এক কর্তা জানান, কলকাতায় একসঙ্গে ডেঙ্গি ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত একাধিক কেস পাওয়া যাচ্ছে। এক ব্যক্তি একসঙ্গে এই দুই মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হলে অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক হয়ে যায়। তখন পরিস্থিতি মোকাবিলা কঠিন হয়ে যায়।
ডেঙ্গি রুখতে কী নয়া পদক্ষেপ নিতে চলেছে সরকার?
ডেঙ্গি রিভিউ মিটিংয়ে সমন্বয়ে জোর দেওয়া হতে পারে!
স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বাস্থ্য দফতরের কর্তাদের সঙ্গে ডেঙ্গি নিয়ে রিভিউ মিটিং করবেন। বিশেষত কলকাতা এবং হাওড়া পুরসভার এলাকাগুলো নিয়ে বাড়তি জোর দেওয়া হবে। কারণ এই দুই এলাকাতেই গত এক মাসে ডেঙ্গি এবং ম্যালেরিয়ায় জোড়া দাপট বেশি দেখা গিয়েছে। স্বাস্থ্য কর্তাদের পাশপাশি বৈঠকে অন্যান্য বিভাগের কর্তারাও উপস্থিত থাকবেন। যাতে ডেঙ্গি রুখতে সমস্ত বিভাগের মধ্যে ঠিকঠাক সমন্বয় থাকে। কোনো রকম জটিলতা তৈরি না হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনেই পরিকল্পনা!
চলতি বছরে ডেঙ্গি কতখানি ভয়ানক হতে পারে সে নিয়েও এদিনের বৈঠকে আলোচনা হতে পারে বলে জানাচ্ছেন প্রশাসনের একাংশ। এক কর্তা জানান, ২০২৩ সালে এই দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ডেঙ্গি পরিস্থিতি হয়েছিল। চলতি বছরে এই মশাবাহিত রোগ কতটা দাপট বাড়াতে পারে, সে সম্পর্কে আগাম ধারনা করা জরুরি। তাই এই বৈঠকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও থাকবেন। তাঁরা রোগ ও আক্রান্তের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে প্রশাসনকে রোগের দাপট সম্পর্কে একটা ধারনা দেবেন। তাহলে পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা আরও বাস্তবসম্মত হবে।
বাড়ি-বাড়ি নজরদারিতে বাড়তি গুরুত্ব!
স্বাস্থ্য দফতরের এক কর্তা জানান, ডেঙ্গি ও ম্যালেরিয়া রুখতে বাড়ি বাড়ি নজরদারির উপরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এলাকার কোথায় জল জমেছে, কোথায় মশাবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে, সে সম্পর্কে সমস্ত তথ্য থাকা জরুরি। তবেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
এলাকায় ডেঙ্গি বা ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগে কে কে আক্রান্ত হচ্ছেন, সে সম্পর্কে প্রশাসনের কাছে সম্পূর্ণ তথ্য থাকা প্রয়োজন। সেদিকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাই পুর কর্মীরা নিজেদের এলাকা নিয়মিত পরিদর্শন করবেন এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। যাতে জ্বর হলে তাঁদের কাছে তথ্য থাকে। ডেঙ্গি সংক্রমণের খবর থাকলে, সেই এলাকায় বাড়তি নজর দেওয়া হবে। যাতে রোগ ছড়িয়ে না পড়ে। সংক্রমণ দ্রুত আটকানো সম্ভব হয়।
স্বাস্থ্য ভবনের এক শীর্ষ কর্তা জানান, ডেঙ্গি টিকা এলেও চলতি বছরে নানান আইনি জটিলতার জন্য সেই টিকা করণ সম্ভব হচ্ছে না। তাই প্রচলিত পদ্ধতিতেই ডেঙ্গি মোকাবিলা হবে। প্রশাসন সক্রিয় থাকবে। এলাকার পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়া হবে আবার জনসচেতনতাতেও বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে।









