মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পারস্য উপসাগর এলাকায় আবারও ভেঙে পড়ল মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান (US Iran Conflict)। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শুক্রবার একটি মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ভেঙে পড়ে। সেই বিমানের দুই পাইলট ঝাঁপ দেন। এর পরেই মার্কিন বায়ুসেনার এ-১০ ওয়ারথগ (Fairchild Republic A-10 Thunderbolt II/ A-10 Warthog) বিমানও দুর্ঘটনার শিকার হয়। বিমানে থাকা দুই পাইলটকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। সূত্রের খবর, বিমানটি হরমুজ প্রণালীর (Strait of Hormuz) কাছাকাছি এলাকায় ভেঙে পড়ে। তবে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। শুধু তাই নয়। দুর্ঘটনাগ্রস্ত এফ-১৫ই বিমানের নিখোঁজ পাইলটকে খুঁজতে বের হওয়া দুই ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারও ইরানের হামলার মুখে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি তেহরানের।
দুর্ঘটনা না ধ্বংস!
আল জাজিরা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর নিকটবর্তী এলাকায় একটি মার্কিন এ-১০ বিমান ধ্বংস করার দাবি করেছে ইরান (US Iran Conflict)। জানা গিয়েছে, ঘটনাটি কৌশলগত সামুদ্রিক করিডরের কাছে ঘটেছে। বর্তমানে আঞ্চলিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই হরমুজ প্রণালী। উল্লেখ্য, এই এ-১০ ওয়ারথগ বিমান জমিতে লড়াইয়ের সময় সাহায্যের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা “শত্রু” এ-১০ বিমানকে লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছে। তাতেই ভেঙে পড়ে মার্কিন বিমান (US Jet Crash)। তবে, বিমানটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, নাকি গুলি করে নামানো হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এফ-১৫ ভেঙে পড়েছিল আগেই
এই ঘটনার আগে ইরানের আকাশসীমায় একটি এফ-১৫ (F-15E Strike Eagle) যুদ্ধবিমান ভেঙে পড়ে। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে আমেরিকার একটি যুদ্ধবিমানকে গুলি করে নামিয়েছিল তেহরান। তাতে দু’জন পাইলট ছিলেন। এক জনকে উদ্ধার করা গেলেও আর এক জনের খোঁজ এখনও পায়নি মার্কিন সেনা। তাঁদের খোঁজে তল্লাশি চলছে। এই পরিস্থিতিতে ইরান জুড়ে ‘শত্রু’ পাইলটকে জীবন্ত ধরে আনার ডাক দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ইরানি সংবাদমাধ্যম এই কাজে পুরস্কারও ঘোষণা করেছে। বলা হচ্ছে, মার্কিন যুদ্ধবিমানের (US Jet Crash) ওই পাইলটকে যদি জীবন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে ইরানি সেনার হাতে তুলে দেওয়া যায়, সেনা উপযুক্ত সম্মান এবং পুরস্কার দেবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং নিউ ইয়র্ক টাইম্স জানিয়েছে, ইরানে ভেঙে পড়া বিমানটি এফ-১৫ই। এতে এক জন পাইলট থাকেন। পিছনের আসনে থাকেন এক জন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকারী অফিসার। সংবাদসংস্থা এপি-র রিপোর্ট বলছে, দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে মার্কিন যুদ্ধবিমানটি ভেঙে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে পাইলট বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তবে তিনি কী অবস্থায় আছেন, এখনও স্পষ্ট নয়। ওই বিমানের আর এক অফিসারকে উদ্ধার করেছে মার্কিন সেনা। দ্বিতীয় জনের খোঁজ চলছে। কিছু প্রতিবেদনে আবার বলা হচ্ছে তিনি ইরানের হেফাজতে।
পাইলট ধরতে পুরস্কার ঘোষণা
ইরানের (US Iran Conflict) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক প্রাদেশিক গভর্নর দাবি করেছেন, যে কেউ মার্কিন পাইলটকে ধরতে বা হত্যা করতে পারবে, তাকে পুরস্কৃত করা হবে। এমনকি স্থানীয় মানুষদের পাইলট খোঁজার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে বলেও খবর। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের কোহ্গিলুয়ে এবং বয়ের-আহমাদ প্রদেশে মার্কিন যুদ্ধবিমানটি ভেঙে পড়ে। এটি দুর্গম পার্বত্য এলাকা। ইরানের সংবাদমাধ্যম এবং টিভি চ্যানেলে এই সমস্ত এলাকার মানুষদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে, ‘‘আমেরিকান পাইলটকে খুঁজতে আমাদের সেনাবাহিনী তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে। আপনারা যদি শত্রু দেশের ওই পাইলটকে ধরতে পারেন এবং সেনার হাতে তুলে দেন, অনেক পুরস্কার ও বোনাস পাবেন।’’ কোনও কোনও সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, মার্কিন পাইলটকে খুঁজে পেলেই গুলি করে দেওয়া হোক। তবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বিবৃতি দিয়ে অনুরোধ করেছে, আমেরিকান পাইলটকে খুঁজে পেলে কেউ যেন তাঁর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না-করেন। তাঁকে যেন সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। সংবাদমাধ্যমে আরও দাবি, মার্কিন পাইলটকে খুঁজতে ইরানের ওই দুর্গম এলাকায় ভিড় জমতে শুরু করেছে। অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে সেখানে পৌঁছে গিয়েছেন।
ইরানের দাবি
শুক্রবারই ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর (IRGC)-এর তরফে আবার দাবি করা হয়েছিল, মধ্য ইরানে একটি মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে তারা। খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরের একজন মুখপাত্র ইরানের প্রেস টিভিকে জানান, বিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ার পর ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটে। ফলে পাইলটের জীবিত থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। মার্কিন বিমান ধ্বংসের পর ইরান গোটা ঘটনাকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেন। মুম্বইয়ে ইরানের দূতাবাসের তরফে এই বিষয়ে এক্স হ্যান্ডেলে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। একইসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্বিতীয় এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করা হল। ইরান একটি শক্তিশালী দেশ। কারও সামনে মাথানত করে না।’
ট্রাম্পের অসন্তোষ
ইরান যুদ্ধ (US Iran Conflict) শুরু হওয়ার পর থেকে এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। এখনও পুরোদমে লড়ছে ইরান। শুক্রবারই দুটি মার্কিন যুদ্ধ বিমান গুলি করে নামানোর দাবি করে ইরানি সেনা। তবে বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার রাতে প্রথমবার মুখ খুললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, এই ঘটনাগুলির কোনও প্রভাব ইরানের সঙ্গে চলা কূটনৈতিক আলোচনায় পড়বে না। এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “এই ঘটনাগুলির কূটনীতি বা আলোচনার উপর কোনও প্রভাব পড়বে না। এটা যুদ্ধ। আমরা যুদ্ধের মধ্যেই আছি।” এদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে ট্রাম্প দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানের সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অপারেশন নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি। তবে তাঁর কথায়, পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল। তবে, ইরানের দাবি, মার্কিন উদ্ধারকারী দলের ২ ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারকেও তারা গুলি করে নামিয়েছে।
ইসলামাবাদে আলোচনায় বসছে না ইরান
ট্রাম্পের দাবি সত্ত্বেও মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে দাবি করা হয়েছে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সংঘাত কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যাপক ভাবে ধাক্কা খেয়েছে। যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা আপাতত স্থগিত হয়ে রয়েছে বলেই জানা যাচ্ছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তান-সহ একাধিক দেশের মধ্যস্থতার পরেও আলোচনায় কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ইরান জানিয়ে দিয়েছে, তারা ইসলামাবাদে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি নয়।
ক্ষয়ক্ষতির হিসেব
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখনও পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩০০-র বেশি আহত হয়েছেন। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও মার্কিন সেনা ইরানের হাতে বন্দি হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য নেই। ক্রমাগত মার্কিন যুদ্ধবিমান ভেঙে পড়ার ঘটনা এবং ইরানের US Iran Conflict) পাল্টা দাবিতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য বড় সংঘর্ষের আশঙ্কা ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে বাড়ছে উদ্বেগ।