Nil Puja 2026: গ্রাম বাংলায় সনাতনী হিন্দুদের এক লোক আধার নীল উৎসব! ঘরে ঘরে আরাধনা, তবুও হারাচ্ছে জৌলুস

nil puja 2026 why sasthi know the rituals of this festival in rural bengal

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ষষ্ঠী তিথি নয়। এই পুজোয় (Nil Puja 2026) মা ষষ্ঠী পূজিতা হন না, পুজো করা হয় দেবাদিদেব মহাদেবকে। তবু বাংলার ঘরে ঘরে এদিন নীলষষ্ঠী। চৈত্র সংক্রান্তির এক দিন আগে হিন্দু বাঙালি মায়েরা উপবাস রেখে সন্তানের মঙ্গলকামনায় যে ব্রত করেন, তা-ই নীলষষ্ঠী বা নীলপুজো হিসেবে পরিচিত। মহাশিবরাত্রির পরে মায়েরা অপেক্ষায় থাকেন নীলষষ্ঠীর (Nil Sasthi)। গোটা এপ্রিল মাস জুড়ে রয়েছে বাঙালির একাধিক পুজো-পার্বণ। যার মধ্যে অন্যতম নীলষষ্ঠী বা নীলপুজো।

কেন বলা হয় নীল ষষ্ঠী

ষষ্ঠী তিথি না হলেও একে নীলষষ্ঠী বলা হয়ে থাকে। পুরাণ অনুযায়ী, মহাদেবের অপমান সইতে না পেরে প্রাণত্যাগ করেন দেবী সতী। এর পর তিনি রাজা নীলধ্বজের কন্যা নীলাবতী হিসেবে পুনর্জন্ম গ্রহণ করেন। বিবাহ হয় মহাদেবের সঙ্গে। প্রচলিত বিশ্বাস, দেবী নীলচণ্ডী বা নীলাবতী এবং নীলকণ্ঠ শিবের পরিণয় সম্পন্ন হয়েছিল চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন। এই বিশেষ তিথিতে নিষ্ঠা করে পুজো করলে নীলকণ্ঠ মহাদেব ও দেবী নীলচণ্ডিকা এবং মা ষষ্ঠীর কৃপা লাভ হয়। তাই এই তিথি নীল ষষ্ঠী। মায়েরা সন্তানের কল্যাণ কিংবা সন্তান লাভের বাধা থেকে মুক্তি পেতে এই ব্রত পালন করেন। এদিন শিব মন্দিরগুলিতে ভিড় জমান ভক্তেরা। যাদের বাড়িতে শিবলিঙ্গ আছে, তারা বাড়িতেই আয়োজন করেন পুজোর।

সনাতন বঙ্গীয়দের লোক-উৎসব নীল-পুজো

নীল পুজো শিবের গাজনেরও অঙ্গ। গ্রাম বাংলায় সনাতনী হিন্দুদের এক লোক আধার নীল উৎসব (Nil Puja 2026)। নিম বা বেল কাঠ থেকে নীলের মূর্তি তৈরি হয়। চৈত্রসংক্রান্তির বেশ আগেই নীলকে মণ্ডপ থেকে নিচে নামানো হয়। নীলপূজার আগের দিন অধিবাস। অনেক রাতে হয় হাজরা পূজো অর্থাৎ বিয়ে উপলক্ষে সকল দেবতাকে আমন্ত্রণ করা হয়। হাজরা পূজায় শিবের চেলা বা ভূত-প্রেতের দেবতাকে পোড়া শোল মাছের ভোগ দেওয়া হয়। পরদিন নীল পূজোর সময় নীলকে গঙ্গাজলে স্নান করিয়ে নতুন লালশালু কাপড় পরিয়ে অন্ততপক্ষে সাতটি বাড়িতে নীলকে ঘোরানো হয়। নীলসন্ন্যাসীরা একইরকম লাল কাপড় পরে পাগড়ি মাথায়, গলায় রুদ্রাক্ষমালা ও হাতে ত্রিশূল নিয়ে নীলকে সঙ্গে করে এই মিছিল করেন। এদের দলপতিকে বলা হয় বালা। সাথে থাকে ঢাক-ঢোল, বাঁশী বাজনদারের দল এবং কাল্পনিক শিব-দুর্গা।

নীলের গান

গ্রাম-বাংলায় নীল-সন্ন্যাসীদের দল বাড়িতে এলে গৃহস্থ মহিলারা উঠোনে আলপনা দিয়ে নীলকে আহ্বান করে বরাসনে বসিয়ে তার মাথায় তেল সিঁদুর পরিয়ে দেন। এরপর নীলের গান শুরু হয়:
“শুন সবে মন দিয়ে হইবে শিবের বিয়ে
কৈলাসেতে হবে অধিবাস…।”
বিয়ের পর নীলের গানে থাকে সংসারী হর-পার্বতীর কথা, শিবের কৃষিকাজ, গৌরীর শাঁখা পরা প্রভৃতি এবং ভিখারি শিবের সঙ্গে অন্নপূর্ণা শিবানীর দ্বান্দ্বিক সহাবস্থানের কাহিনি। গানের প্রথম অংশ দলপতি বালারা এবং পরবর্তী অংশ অন্য নীলসন্ন্যাসীরা গেয়ে থাকেন। গানের শেষে গৃহস্থরা সন্ন্যাসীদের চাল-পয়সা, ফল প্রভৃতি ভিক্ষাস্বরূপ দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাম বাংলায় সনাতনী এই রীতি প্রায় হারিয়ে যেতে চলেছে।

নীলষষ্ঠীর ব্রত পালনের শুভ সময়

সাধারণত চৈত্র সংক্রান্তির আগে অর্থাৎ চড়ক উৎসবের আগের দিন নীলপুজো পালিত হয়। এই বছর ২০২৬ সালে ১৩ এপ্রিল অর্থাৎ ২৯ চৈত্র পড়েছে নীল পুজো। এই পুজোর কোন বিশেষ মুহূর্ত আলাদা করে থাকে না। তবে নীলপুজোর দিন সন্ধ্যেবেলা শিবলিঙ্গে জল ঢেলে, সন্তানের নামে প্রদীপ বা মোম জ্বালানো সবচেয়ে শুভ।

নীলষষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে লোক কথা

সন্তানের মঙ্গলকামনায় এই বিশেষ তিথিতে পুজো করার কারণ হিসাবে জানা যায় গ্রামবাংলায় প্রচলিত এক লোককাহিনি। এক অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণ দম্পতির সব সন্তান একে একে মারা যায়। সেই বেদনা সহ্য করতে না পেরে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে কাশীতে বাস করা শুরু করেন। একদিন গঙ্গাস্নানের পর ব্রাহ্মণী ঘাটে বসে চোখের জল ফেলছিলেন। এক বৃদ্ধা তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলে ব্রাহ্মণী সন্তানদের অকালমৃত্যু সম্পর্কে জানান। এত পুজোআচ্চা, বারব্রত পালনের পরেও তাঁর এই দুর্দশা, এ কথা বলে দুঃখ করতে থাকেন। সেই বৃদ্ধা ছিলেন ছদ্মবেশী মা ষষ্ঠী। দেবী তখন তাঁকে চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন উপোস করে শিবপুজো করতে বলেন এবং সে ব্রতের অন্যান্য নিয়মও শিখিয়ে দেন। সেইমতো ব্রতপালনের ফলে ব্রাহ্মণীর কোলে আবার সন্তান আসে এবং সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকে। নীলকণ্ঠ শিবকে পুজো করার কথা বলেন মা ষষ্ঠী, হয়তো সেই কারণেই এই ব্রতের নাম নীলষষ্ঠী (Nil Sasthi)।

নীলপুজোর রীতি-নীতি

অভিষেকের নিয়ম: বিশেষ এই দিনে শিবকে কেবল জল দিয়ে অভিষেক করলে চলবে না। বদলে দুধ, দই, ঘি, মধু, চন্দন এবং গঙ্গাজল মিশিয়ে মিশ্রণ তৈরি করে তা দিয়ে শিবের অভিষেক করুন। মন চাইলে ডাবের জলও দিতে পারেন।

ঘি-এর প্রদীপ: সন্ধ্যায় শিবের কাছে প্রদীপ জ্বালিয়ে নীলষষ্ঠীর ব্রত সম্পন্ন করার রেওয়াজ রয়েছে। সেই প্রদীপ তেলের বদলে ঘি দিয়ে জ্বালতে পারলে খুব ভাল হয়।

মরসুমি ফল দান: নৈবেদ্য হিসাবে শিবকে এই দিন অবশ্যই মরসুমি ফল দিন। তরমুজ, কাঁচা আম, বেল, ডাব, শসা প্রভৃতি দিতে পারলে খুব ভাল হয়।

যে ফুলে তুষ্ট মহাদেব: এই দিন শিবকে বেলপাতা, আকন্দ ফুল, ধুতরা ফুল এবং নীলকণ্ঠ বা নীল অপরাজিতা ফুল অর্পণ করুন। তবে এগুলি সব দিতে না পারলেও বেলপাতার সঙ্গে উল্লিখিত যে কোনও একটি ফুল অবশ্যই দিতে হবে।

নির্জলা উপবাস: সারা দিন নির্জলা উপবাস যদি না-ও রাখতে পারেন সমস্যা নেই। কিন্তু অন্ন জাতীয় খাবার খাওয়া যাবে না। ভাজাভুজি খাওয়াও এড়িয়ে চলতে হবে। এই দিন যতটা সম্ভব ঠান্ডা খাবার খান। উপোস ভাঙার পরও এদিন ফল,সাবু ইত্যাদি ছাড়া ময়দার তৈরি খাবারই খেতে হয়। এমনকী, সন্দক লবণ দিয়ে খাবার খেতে হয়। মনে করা হয় ব্রতের দিন উপোস করে নিষ্ঠা করে কিছু নিয়ম মানলে ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন ভগবান শিব।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share