Category: পরম্পরা

Get updated History and Heritage and Culture and Religion related news from the Madhyom news portal madhyom.com, West Bengal leading news portal Madhyom.com

  • Guru Gobind Singh: দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে গুরু গোবিন্দ সিং জয়ন্তী, জানুন দিনটির তাৎপর্য  

    Guru Gobind Singh: দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে গুরু গোবিন্দ সিং জয়ন্তী, জানুন দিনটির তাৎপর্য  

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: গুরু গোবিন্দ সিং (Guru Gobind Singh) জয়ন্তী পরিচিত প্রকাশ পর্ব নামেও। প্রার্থনা ও স্মরণে দিনটি পালিত হলেও, এতে এক ধরনের গাম্ভীর্য রয়েছে। আর সেটাই একে একটি সাধারণ উৎসবের আনন্দ থেকে আলাদা করে তোলে (Prakash Purab)। অনেক শিখের কাছে এই দিনটি আচার পালনের চেয়েও ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি যেন এক মুহূর্তের বিরতি। এমন একটা সময়, যখন সেই ভাবনাগুলির কাছে ফিরে যাওয়া হয়, যেগুলি কখনও শুধু বইয়ের পাতায় বন্দি থাকার জন্য ছিল না। সাহস, সমতা, ন্যায়বিচার—এই মূল্যবোধগুলি আবার সামনে আসে, প্রতীকের কারণে নয়, বরং আজও এগুলি যে কতটা প্রয়োজনীয়, সেই কারণেই।

    গুরু গোবিন্দ সিং জয়ন্তী (Guru Gobind Singh)

    ২০২৫ সালে গুরু গোবিন্দ সিং জয়ন্তী পালিত হচ্ছে আজ ২৭ ডিসেম্বর। চন্দ্র তিথির ভিন্নতার কারণে কিছু পঞ্জিকা অনুযায়ী এটি উদযাপন হবে ২৮ ডিসেম্বর। এই দিনটি দশম শিখ গুরু, গুরু গোবিন্দ সিংয়ের জন্মবার্ষিকী স্মরণে পালিত হয়। শিখ চিন্তাধারা, পরিচয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করে এই দিনটি পালিত হয় মর্যাদা সহকারে।

    কে গুরু গোবিন্দ সিং?

    গুরু গোবিন্দ সিংয়ের জন্ম ১৬৬৬ সালে, বর্তমান বিহারের পাটনা সাহিবে। মাত্র ন’বছর বয়সে তিনি গুরু হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি ছিল এমন একটি সময়, যা রাজনৈতিক চাপ ও ধর্মীয় নিপীড়নের জন্য চিহ্নিত ছিল (Guru Gobind Singh)। ১৬৯৯ সালে তিনি খালসা পন্থ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে সমতা, সাহস ও সমষ্টিগত দায়িত্ববোধের নীতি স্থাপন করা হয়। মৃত্যুর পূর্বে তিনি গুরু গ্রন্থ সাহিবকে চিরন্তন গুরু হিসেবে ঘোষণা করেন, এর মধ্য দিয়ে মানব গুরুর ধারার সমাপ্তি ঘটে।

    প্রশ্ন হল, কেন গুরু গোবিন্দ সিং প্রকাশ পর্ব আধ্যাত্মিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ

    প্রকাশ পর্ব সাধারণ অর্থে জন্মদিন হিসেবে পালিত হয় না। আধ্যাত্মিকভাবে এই দিনটি মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বাসের সঙ্গে কর্মের সহাবস্থান জরুরি। গুরু গোবিন্দ সিংয়ের শিক্ষা ছিল সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং উচ্চ মূল্য দিতে হলেও মর্যাদার সঙ্গে জীবন যাপন করা (Guru Gobind Singh)। ভারতজুড়ে গুরুদ্বারগুলিতে এই দিনটি গুরবাণী কীর্তন, প্রার্থনা ও শিখ ধর্মগ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে পালিত হয়। রাস্তায় বের হয় নগর কীর্তন, লঙ্গর পরিবেশন করা হয়, এবং সমাজসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ঘরবাড়ি ও গুরুদ্বারে আলো জ্বালানো হয়, প্রদর্শনের জন্য নয়, শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে (Prakash Purab)। গুরু গোবিন্দ সিং জয়ন্তী জাঁকজমকের ওপর নির্ভর করে স্মরণীয় হয়ে ওঠে না। এটি আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ এর অন্তর্নিহিত মূল্যবোধগুলি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্লান হয় না (Guru Gobind Singh)।

  • Ramakrishna 542: “আমি বলি, চৈতন্যলাভের পর সংসারে গিয়ে থাক, অনেক পরিশ্রম করে যদি কেউ সোনা পায়”

    Ramakrishna 542: “আমি বলি, চৈতন্যলাভের পর সংসারে গিয়ে থাক, অনেক পরিশ্রম করে যদি কেউ সোনা পায়”

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৯ই অগস্ট
    দক্ষিণেশ্বরে রাখাল, মাস্টার, মহিমাচরণ প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে
    দ্বিজ, দ্বিজের পিতা ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ — মাতৃঋণ ও পিতৃঋণ 

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে সেই পূর্বপরিচিত ঘরে রাখাল, মাস্টার প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন। বেলা তিনটা-চারিটা।

    ঠাকুরের গলার অসুখের সূত্রপাত হইয়াছে। তথাপি সমস্ত দিন কেবল ভক্তদের মঙ্গলচিন্তা করিতেছেন—কিসে তাহারা সংসারে বদ্ধ না হয়,—কিসে তাহাদের জ্ঞান-ভক্তিলাভ হয়;—ঈশ্বরলাভ হয় (Kathamrita)।

    দশ-বারো দিন হইল, ২৮শে জুলাই মঙ্গলবার, তিনি কলিকাতায় শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসুর বাটীতে ঠাকুরদের ছবি দেখিতে আসিয়া বলরাম প্রভৃতি অন্যানা ভক্তদের বাড়ি শুভাগমন করিয়াছিলেন।

    শ্রীযুক্ত রাখাল বৃন্দাবন হইতে আসিয়া কিছুদিন বাড়িতে ছিলেন। আজকাল তিনি, লাটু, হরিশ ও রামলাল ঠাকুরের (Ramakrishna) কাছে আছেন।

    শ্রীশ্রীমা কয়েকমাস হইল, ঠাকুরের সেবার্থ দেশ হইতে শুভাগমন করিয়াছেন। তিনি নবতে আছেন। ‘শোকাতুরা ব্রাহ্মণী’ আসিয়া কয়েকদিন তাঁহার কাছে আছেন।

    ঠাকুরের কাছে দ্বিজ, দ্বিজর পিতা ও ভাইরা, মাস্টার প্রভৃতি বসিয়া আছেন। আজ ৯ই অগস্ট, ১৮৮৫ খ্রী: (২৫শে শ্রাবণ, ১২৯২, রবিবার, কৃষ্ণা চতুর্দশী)।

    দ্বিজর বয়স ষোল বছর হইবে। তাঁহার মাতার পরলোকপ্রাপ্তির পর পিতা দ্বিতীয় সংসার করিয়াছেন। দ্বিজ—মাস্টারের সহিত প্রায় ঠাকুরের কাছে আসেন,—কিন্তু তাঁহার পিতা তাহাতে বড় অসন্তুষ্ট।

    দ্বিজর পিতা অনেকদিন ধরিয়া ঠাকুরকে দর্শন করিতে আসিবেন বলিয়াছিলেন। তাই আজ আসিয়াছেন (Kathamrita)। কলিকাতায় সওদাগরী অফিসের তিনি একজন কর্মচারী—ম্যানেজার। হিন্দু কলেজে ডি. এল. রিচার্ডসনের কাছে পড়িয়াছিলেন ও হাইকোর্টের ওকালতি পাস করিয়াছিলেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) (দ্বিজর পিতার প্রতি)—আপনার ছেলেরা এখানে আসে, তাতে কিছু মনে করবে না।

    “আমি বলি, চৈতন্যলাভের পর সংসারে গিয়ে থাক। অনেক পরিশ্রম করে যদি কেউ সোনা পায়, সে মাটির ভিতর রাখতে পারে—বাক্সের ভিতরও রাখতে পারে, জলের ভিতরও রাখতে পারে—সোনার কিছু হয় না।

  • Christmas: খ্রিস্টমাসের কোনও অস্তিত্বই ছিল না! হিন্দুদের উৎসবই রং বদলে নয়া ফর্মে

    Christmas: খ্রিস্টমাসের কোনও অস্তিত্বই ছিল না! হিন্দুদের উৎসবই রং বদলে নয়া ফর্মে

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: “খ্রিস্টমাস (Christmas) আসলে খ্রিস্টীয় ছিল না। পৌত্তলিক উৎসবগুলিকে এতটাই সম্পূর্ণভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছিল যে মাত্র দু’প্রজন্মের মধ্যেই মানুষ ভুলে গিয়েছিল, এই উৎসবগুলির আদৌ কোনও অস্তিত্বই ছিল না। আর ৬০১ খ্রিস্টাব্দের একটি চিঠি আমাদের হাতে আছে, যা প্রমাণ করে যে এটি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। কিন্তু যেটি আমার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দিল, তা হল, আমি উপলব্ধি করলাম, আজও ঠিক এই একই কৌশলটি ব্যবহার করা হচ্ছে পৃথিবীতে টিকে থাকা শেষ প্রাচীন সভ্যতার ওপর। একবার আপনি এটি দেখতে পেলে, আর না দেখে থাকতে পারবেন না।” কথাগুলি বললেন শন বিন্ডা, যাঁর পূর্বপুরুষদের খ্রিস্টান ব্রিটিশরা দাস হিসেবে ক্যারিবীয় দেশগুলিতে নিয়ে গিয়েছিল।

    সনাতন হিন্দু ধর্ম (Christmas)

    সনাতন হিন্দু ধর্ম খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামের মতো ধর্মগুলির তুলনায় সর্বাধিক প্রাচীন। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র, ভারত-সহ মানুষ কর্মনির্ভর জীবনদর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন, প্রকৃতির পুজারি ছিলেন, মূর্তিপুজোর প্রচলন ছিল, বহু দেবতায় বিশ্বাসী ছিলেন, যাঁদের ‘পৌত্তলিক’ বলা হত। এছাড়াও, ঐতিহাসিকভাবে খ্রিস্টানরা ভারতের হিন্দুদের ‘পৌত্তলিক’, ‘মূর্তিপূজক’ ও ‘বহুদেবতাবাদী’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করে এসেছে। শন বলেন, “একটি আইটি প্রকল্পের কাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় আমি লক্ষ্য করেছি, সেখানে খ্রিস্টানরা কীভাবে ঘটা করে বড়দিন উদযাপন করে (Hindu Festivals)।”

    যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন

    খ্রিস্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন সারা বিশ্বে খ্রিস্টানরা যে প্রধান উৎসব হিসেবে পালন করেন, সেটিই বড়দিন (Christmas)। তবে বহু ইতিহাসবিদ ও গবেষকের মতে, এই উৎসবটির ধারণা এসেছে প্রাচীন পৌত্তলিক উৎসব থেকে, কিংবা বলা যায়, সেখান থেকেই তা সরাসরি অনুকরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে এটি রোমান সভ্যতার দুটি উৎসব -‘স্যাটারনালিয়া’ (Saturnalia) এবং ‘সল ইনভিক্টাস’ (Sol Invictus)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এই উৎসবগুলি শীতকালীন অয়নান্তকে কেন্দ্র করে পালিত হত, যা সূর্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা (Christmas)।

    ‘সল ইনভিক্টাস’ উৎসব

    খ্রিস্টমাসের তারিখ ২৫ ডিসেম্বর ‘সল ইনভিক্টাস’ উৎসবের তারিখের সঙ্গে মিলে যায়। ‘সল’ অর্থ সূর্য এবং ‘ইনভিক্টাস’ অর্থ অজেয়। উপহার দেওয়া, ভোজের আয়োজন, গাছ সাজানো, এসব বহু রীতিই ছিল প্রাচীন পৌত্তলিক উৎসবগুলির সঙ্গে যুক্ত। ভারতে হিন্দুরাও তুলসী, বট, অশ্বত্থ ও ডুমুর গাছকে পবিত্র বলে মনে করে সেগুলির পূজা করে। সংক্রান্তি এবং ছট পুজোও সূর্যকে কেন্দ্র করেই পালিত উৎসব। ভারতে সূর্যদেবের উদ্দেশে নিবেদিত বহু মন্দির রয়েছে, যেমন কোনার্ক, মোধেরা, মার্তণ্ড, মুলতান (পাকিস্তান), এছাড়াও মিশর, চিন, জাপান, পেরু প্রভৃতি দেশে সূর্য উপাসনার নিদর্শন দেখা যায়। হিন্দুরা সূর্যকে অর্ঘ্য দান করেন এবং সূর্য নমস্কার করেন (Hindu Festivals)।

    স্বর্ণযুগের স্মৃতি

    দীপাবলি, কার্তিক পূর্ণিমা, কার্তিগাই দীপম প্রভৃতি উৎসবে হিন্দুরা প্রদীপ ও দীপমালার মাধ্যমে নিজেদের ঘর আলোকিত করেন, দীপস্তম্ভেও প্রদীপ জ্বালানো হয়। খ্রিস্টধর্মের আগমনের পূর্বে ইউরোপের মানুষও একই অনুভূতি ও ভাবধারায় এসব উৎসব পালন করত। স্যাটারনালিয়া ছিল প্রাচীন রোমের একটি উৎসব, যা কৃষির দেবতা স্যাটার্নের সম্মানে পালিত হত। প্রথমে এটি ১৭ ডিসেম্বর একদিনের উৎসব ছিল, কিন্তু খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে তা বেড়ে সাত দিনের উৎসবে পরিণত হয় (Christmas)। এই সময় উৎসবের বৈশিষ্ট্য ছিল ঘর সাজানো, গাছ সাজানো, কৃষিশ্রমিকদের উপহার দেওয়া ভোজসভা এবং আনন্দঘন ‘ইও স্যাটারনালিয়া!’ ধ্বনি উচ্চারণ করা। জনসমাগমেও পালিত হত এই উৎসব। এই উৎসব সেই ‘স্বর্ণযুগে’র স্মৃতিকে উদযাপন করত, যখন দাসপ্রথা ছিল না।

    স্যাটার্নালিয়া উৎসবের রীতিনীতির ছাপ

    স্যাটার্নালিয়া উৎসবের রীতিনীতির ছাপ ক্রিসমাসে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সাজসজ্জা, উপহার আদান–প্রদান, ভোজসভা ইত্যাদি। এগুলি সরাসরি প্রভাবের ফল।
    চতুর্থ শতকে খ্রিস্টান চার্চ এই উৎসবগুলি গ্রহণ করে, মূলত পৌত্তলিক রোমানদের খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরিত করার উদ্দেশ্যে (Hindu Festivals)। স্যাটার্নালিয়া উৎসবটি সূর্যের দক্ষিণ অয়ন থেকে উত্তর অয়নে যাত্রার সঙ্গে যুক্ত। উত্তর অয়নের সময় দিন বড় হতে থাকে এবং সূর্যালোক বৃদ্ধি পায়। এই কারণেই খ্রিস্টানরা ক্রিসমাসকে ‘আলোর জন্মে’র সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে যিশুকে বলা হয় ‘বিশ্বের আলো’।

    সোল ইনভিক্টাস উৎসব

    সোল (সূর্য) ইনভিক্টাস (অজেয়) ছিল রোমান সাম্রাজ্যের সূর্যদেবতা। সম্রাট অরেলিয়ান ‘ডিয়েস নাতালিস সোলিস ইনভিক্টি’ (অজেয় সূর্যের জন্মদিন) নামে একটি উৎসব প্রবর্তন করেন, যা ২৫ ডিসেম্বর পালিত হত (Christmas)। এই উৎসব পালিত হত কারণ এই সময়ে সূর্যের শক্তি আবার বৃদ্ধি পায়, অর্থাৎ দিনের দৈর্ঘ্য বাড়তে শুরু করে। রথেরদৌড়, ভোজসভা এবং উপহার আদান–প্রদান ছিল এই উৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য। সম্রাট কনস্টানটাইনও সোল ইনভিক্টাসের প্রচার করেছিলেন এবং তাঁর মুদ্রায় সূর্যদেবতার প্রতিকৃতি আঁকা ছিল। অনেকের বিশ্বাস, ২৫ ডিসেম্বর তারিখটি সরাসরি সোল ইনভিক্টাস উৎসব থেকেই নেওয়া হয়েছে। চার্চ ইচ্ছাকৃতভাবে এই তারিখটিকেই যিশুর জন্মদিন হিসেবে নির্ধারণ করে, যাতে পৌত্তলিক উৎসবকে খ্রিস্টীয় উৎসবে রূপান্তর করা যায় (Hindu Festivals)।

    ‘ন্যায়ের সূর্য’

    প্রাচীন খ্রিস্টীয় গ্রন্থে যিশুকে ‘ন্যায়ের সূর্য’ বলা হয়েছে। সেন্ট অগাস্টিন জনগণকে আহ্বান জানান, ২৫ ডিসেম্বর সূর্য নয়, যিশুকেই উদযাপন করতেন মানুষ। এসব তথ্য স্পষ্ট করে যে খ্রিস্টানরা একটি পৌত্তলিক উৎসবকে খ্রিস্টীয় রূপ দিয়েছিল (Christmas)। সমাস ট্রি, ইউল লগ ও মিস্টলটো—এসবই পৌত্তলিক ঐতিহ্য থেকে এসেছে। উত্তর ইউরোপের জার্মানিক জনগোষ্ঠীর ইউল উৎসব শীতকালীন অয়নান্তকে কেন্দ্র করে পালিত হত। এই উৎসবে ইউল লগ পোড়ানো, সাজসজ্জা ও ভোজসভা অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেসব অঞ্চলের মানুষ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পর এই প্রাচীন পৌত্তলিক উৎসবগুলি ধীরে ধীরে ক্রিসমাসের অংশ হয়ে যায়। ইউল লগ পোড়ানো সূর্যের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক। আজও অনেক দেশে ক্রিসমাস কেক বা মিষ্টি কাঠের গুঁড়ির আদলে তৈরি করা হয়, যা সেই প্রাচীন ঐতিহ্যেরই স্মারক।

    প্রাচীন পৌত্তলিকত্বর ঐতিহ্য

    ক্রিসমাস ট্রি-র উৎস প্রাচীন পৌত্তলিকত্বর ঐতিহ্যের মধ্যেই নিহিত। প্রাচীন মিশরীয়, রোমান ও সেল্টরা চিরসবুজ গাছ ব্যবহার করত, যা চিরন্তন জীবনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হত। রোমানদের স্যাটার্নালিয়া উৎসবে চিরসবুজ ডালপালা সাজানো হতো। ষোড়শ শতকে জার্মানিতে প্রথম ক্রিসমাসট্রি সাজানোর প্রথা শুরু হয়। একটি কিংবদন্তি অনুযায়ী, মার্টিন লুথার নাকি গাছের ওপর আলো জ্বালিয়ে তারকার প্রতীক স্থাপন করেছিলেন (Hindu Festivals)। ঐতিহাসিক প্রমাণ ও প্রভাব অনুযায়ী, ইতিহাসবিদদের মতে চতুর্থ শতকে রোমান সম্রাট কনস্টান্টাইন খ্রিস্টধর্ম প্রচারের সময় বিভিন্ন পৌত্তলিক উৎসবকে তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেন। উদাহরণ হিসেবে, ‘ক্রোনোগ্রাফ অফ ৩৫৪’ গ্রন্থে ২৫ ডিসেম্বর তারিখে একসঙ্গে ‘সোল ইনভিক্টাস’ এবং ‘ক্রিসমাসে’ উল্লেখ পাওয়া যায় (Christmas)।

    খ্রিস্টান চার্চ

    অনেক গবেষকের মতে, খ্রিস্টান চার্চ ইচ্ছাকৃতভাবেই এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল পৌত্তলিকদের আকৃষ্ট করার জন্য। যেমন, সূর্যদেবতার সঙ্গে যিশুকে যুক্ত করা। উপহার দেওয়া, ভোজসভার আয়োজন এবং আনন্দোৎসবের ধারণা এসেছে স্যাটার্নালিয়া উৎসব থেকে। আর আলো ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সূর্যসংক্রান্ত উপাদান এসেছে সোল ইনভিক্টাস উৎসব থেকে। ইউরোপে ইউল  ও সেল্টিক ঐতিহ্যপূর্ণ গাছ। এগুলি সবুজ সাজসজ্জার প্রচলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে কিছু সমালোচক এই দাবিগুলি নাকচ করেন। তাঁদের মতে, ক্রিসমাসের তারিখ স্বতন্ত্রভাবেই নির্ধারিত হয়েছিল, ২৫ মার্চ থেকে ন’মাস হিসেব করেই ২৫ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়।

    ক্রিসমাস পৌত্তলিক উৎসবগুলির অনুকরণে গড়ে উঠেছে

    তা সত্ত্বেও, ঐতিহাসিক সমাপতন ও বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মিল স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, খ্রিস্টধর্ম প্রসারের সুবিধার্থে ক্রিসমাস অনেকাংশেই পৌত্তলিক (বহুদেববাদী হিন্দু) উৎসবগুলির অনুকরণে গড়ে উঠেছে (Christmas)। আজকের দিনে ক্রিসমাস একটি সুন্দর ও আনন্দঘন উৎসব হলেও, এর মূল শেকড় প্রাক্-খ্রিস্টীয় পৌত্তলিক উৎসবগুলির মধ্যেই নিহিত। স্যাটার্নালিয়া, সোল ইনভিক্টাস ও ইউল উৎসব থেকে উপহার দেওয়া, ভোজ, গাছ ব্যবহার এবং আলো দিয়ে সাজানোর মতো নানা উপাদান ক্রিসমাসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে খ্রিস্টানরা নিশ্চয়ই জানতে পেরে আনন্দিত হবেন যে, তাঁদের এই উৎসবের সঙ্গে গভীর যোগ রয়েছে প্রাচীন পৌত্তলিকতা বা সনাতন হিন্দু ধর্মের। এই ঘটনাপ্রবাহ দেখায় কীভাবে সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটে (Hindu Festivals)। আজও বিশ্বজুড়ে নানা উৎসব পালিত হয়, যদিও তাদের ঐতিহাসিক পটভূমি বিস্মৃত হওয়া (Christmas) উচিত নয়।

  • Ramakrishna 541: “তারে কেউ চিনলি না রে! ও সে পাগলের বেশে ফিরছে জীবের ঘরে ঘরে!”

    Ramakrishna 541: “তারে কেউ চিনলি না রে! ও সে পাগলের বেশে ফিরছে জীবের ঘরে ঘরে!”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই
    গুহ্যকথা—“তিনজনই এক”

    “তখন যীশু বললেন, তোমার দিদিই ধন্য, কেন না মানুষ জীবনের যা প্রয়োজন (অর্থাৎ ঈশ্বরকে ভালবাসা—প্রেম) তা ওঁর হয়েছে।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—আচ্ছা তোমার এ-সব দেখে কি বোধ হয়?

    মণি—আমার বোধ হয়, তিনজনেই এক বস্তু!—যীশুখ্রীষ্ট, চৈতন্যদেব আর আপনি—একব্যক্তি!

    শ্রীরামকৃষ্ণ—এক এক! এক বইকি। তিনি (ঈশ্বর),—দেখছ (Kathamrita) না,—যেন এর উপর এমন করে রয়েছে!

    এই বলিয়া ঠাকুর নিজের শরীরের উপর অঙ্গুলি নির্দেশ করিলেন যেন বলছেন, ঈশ্বর তাঁরই শরীরধারণ করে অবতীর্ণ হয়েই রয়েছেন।

    মণি—সেদিন আপনি এই অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারটি বেশ বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—কি বল দেখি।

    মণি—যেন দিগ্‌দিগন্তব্যাপী মাঠ পড়ে রয়েছে! ধু-ধু করছে! সম্মুখে পাঁচিল রয়েছে বলে আমি দেখতে পাচ্ছি না;—সেই পাঁচিলে কেবল একটি ফাঁক!—সেই ফাঁক দিয়ে অনন্ত মাঠের খানিকটা দেখা যায়!

    শ্রীরামকৃষ্ণ — বল দেখি সে ফাঁকটি কি?

    মণি—সে ফাঁকটি আপনি! আপনার ভিতর দিয়ে সব দেখা যায় (Kathamrita);—সেই দিগ্‌দিগন্তব্যাপী মাঠ দেখা যায়!

    শ্রীরামকৃষ্ণ অতিশয় সন্তুষ্ট, মণির গা চাপড়াতে লাগলেন। আর বললেন, “তুমি যে ওইটে বুঝে ফেলেছ।—বেশ হয়েছে।”

    মণি—ওইটি শক্ত কি না; পূর্ণব্রহ্ম হয়ে ওইটুকুর ভিতর কেমন করে থাকেন, ওইটা বুঝা যায় না।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—‘তারে কেউ চিনলি না রে! ও সে পাগলের বেশে (দীনহীন কাঙালের বেশে) ফিরছে জীবের ঘরে ঘরে!’

    মণি—আর আপনি বলেছিলেন যীশুর কথা।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) কি, কি?

    মণি—যদু মল্লিকের বাগানে যীশুর ছবি দেখে ভাবসমাধি হয়েছিল। আপনি দেখেছিলেন যে যীশুর মূর্তি ছবি থেকে এসে আপনার ভিতর মিশে গেল।

    ঠাকুর কিয়ৎকাল চুপ করিয়া আছেন। তারপর আবার মণিকে বলিতেছেন, “এই যে গলায় এইটে হয়েছে, ওর হয়তো মানে আছে—সব লোকের কাছে পাছে হালকামি করি।—না হলে যেখানে সেখানে নাচা-গাওয়া তো হয়ে যেত।”

    ঠাকুর দ্বিজর কথা কহিতেছেন। বলিতেছেন(Kathamrita), “দ্বিজ এল না?”

    মণি—বলেছিলাম আসতে। আজ আসবার কথা ছিল; কিন্তু কেন এল না, বলতে পারি না।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—তার খুব অনুরাগ। আচ্ছা, ও এখানকার একটা কেউ হবে (অর্থাৎ সাঙ্গোপাঙ্গের মধ্যে একজন হবে), না?

    মণি—আজ্ঞা হাঁ, তাই হবে, তা না হলে এত অনুরাগ।

    মণি মশারির ভিতর গিয়া ঠাকুরকে বাতাস করিতেছেন।

  • Swami Shraddhanand: বৈদিক মূল্যবোধ ও ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পুনরুজ্জীবনে নিজেকে উৎসর্গ করেন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ

    Swami Shraddhanand: বৈদিক মূল্যবোধ ও ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পুনরুজ্জীবনে নিজেকে উৎসর্গ করেন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগের ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ ও জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ। ২৩ ডিসেম্বর ১৯২৬ সালে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। শিক্ষা সংস্কার, সামাজিক ন্যায়, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং হিন্দু সমাজের পুনর্গঠনে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টার জন্য তিনি আজও স্মরণীয়। তাঁর শহিদ হওয়া ভারতের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

    প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা

    স্বামী শ্রদ্ধানন্দের জন্ম ২২ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৬, পাঞ্জাব প্রদেশের জলন্ধর জেলার তালওয়ান গ্রামে। তাঁর আসল নাম ছিল বৃহস্পতি বিজ, যিনি লালা মুন্সি রাম নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতা লালা নানক চাঁদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন। মুন্সি রাম তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন বারাণসীতে (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) এবং পরে লাহোরে আইন নিয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। তিনি প্রথমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন, কিন্তু পরে চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর ফিল্লৌর ও জলন্ধরে আইন পেশায় যুক্ত হয়ে তিনি একটি সফল পেশাগত জীবন গড়ে তোলেন। তিনি শিব দেবী–কে বিবাহ করেন। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে স্ত্রীর মৃত্যু তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁদের দুই পুত্র—হরিশচন্দ্র ও ইন্দ্র—এবং দুই কন্যা ছিল, যাদের মধ্যে একজনের নাম বেদ কুমারী। এই ব্যক্তিগত শোকই তাঁর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে রূপ দেয়।

    স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর সঙ্গে পরিচয়

    আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর সঙ্গে পরিচয় স্বামী শ্রদ্ধানন্দের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রথমে সংশয় থাকলেও, বেরেলিতে স্বামী দয়ানন্দের একটি বক্তৃতা শোনার পর তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। দয়ানন্দের যুক্তিবাদ, নির্ভীকতা ও সংস্কারমূলক চেতনা তাঁকে আকৃষ্ট করে। এরপর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আর্য সমাজে যোগ দেন এবং বৈদিক মূল্যবোধ ও ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পুনরুজ্জীবনে নিজেকে উৎসর্গ করেন।

    দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রদূত

    স্বামী শ্রদ্ধানন্দ ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে দেশীয় ঐতিহ্য ও জাতীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে তোলার অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন। উনিশ শতকের শেষভাগে আর্য সমাজ ডিএভি (দয়ানন্দ অ্যাংলো-বৈদিক) বিদ্যালয়গুলির মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ভারতীয় মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পশ্চিমি শিক্ষার ভূমিকা নিয়ে আর্য সমাজের অভ্যন্তরে মতভেদ দেখা দেয় এবং ১৮৯২ সালে বিভাজন ঘটে। শ্রদ্ধানন্দ গুরুকুল শিক্ষাপদ্ধতির পক্ষে অবস্থান নেন—যেখানে আবাসিক শিক্ষা, শৃঙ্খলা, আধ্যাত্মিকতা ও চরিত্র গঠনের উপর জোর দেওয়া হয়। তিনি গুরুকুলপন্থীদের নেতৃত্ব দেন এবং পাঞ্জাব আর্য প্রতিনিধি সভা গঠন করেন। ১৯০০ সালে, তিনি গুজরানওয়ালায় (বর্তমান পাকিস্তান) প্রথম গুরুকুল প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এটি হরিদ্বারের কাছে কাংরি অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয় এবং পরিচিত হয় গুরুকুল কাংরি নামে—ভারতের দেশীয় শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে। তিনি নিজে এর প্রথম আচার্য ছিলেন এবং তাঁর পুত্ররাও সেখানে শিক্ষা গ্রহণ করেন। গুরুকুল কাংরি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও বৌদ্ধিক জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে এখানে অবস্থান করেন এবং এখানেই তাঁকে প্রথম “মহাত্মা” সম্বোধনে ডাকা হয়। ১৯৬২ সালে, ভারত সরকার গুরুকুল কাংরিকে ডিমড বিশ্ববিদ্যালয়–এর মর্যাদা দেয়।

    আধ্যাত্মিক যাত্রা ও সন্ন্যাস গ্রহণ

    ৩৫ বছর বয়সে মুন্সি রাম বানপ্রস্থ আশ্রম গ্রহণ করেন এবং পরিচিত হন মহাত্মা মুন্সি রাম নামে। ১৯১৭ সালে, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তাঁর নাম হয় স্বামী শ্রদ্ধানন্দ। এরপর তিনি সম্পূর্ণরূপে বেদ প্রচার ও সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

    ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা

    স্বামী শ্রদ্ধানন্দ স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তিনি রাওলাট আইন–সহ ব্রিটিশদের দমনমূলক আইনগুলোর বিরোধিতা করেন এবং পাঞ্জাবে সামরিক শাসনের প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেন। ১৯১৯ সালে, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড–এর পর তিনি কংগ্রেসকে অমৃতসরে অধিবেশন করার আহ্বান জানান এবং অন্যরা পিছিয়ে গেলে নিজেই সভাপতিত্ব করেন। দিল্লিতে ব্রিটিশ দমননীতির বিরুদ্ধে বৃহৎ প্রতিবাদ মিছিলে তিনি নেতৃত্ব দেন। চাঁদনি চকে এক ঘটনায়, ব্রিটিশ সেনারা যখন গুলি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন তিনি প্রথমে নিজেকে সামনে এগিয়ে দেন যাতে সাধারণ মানুষ রক্ষা পায়। সেনারা তখন অস্ত্র নামিয়ে রাখে এবং মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে যায়।

    জামা মসজিদে ঐতিহাসিক ভাষণ

    ১৯২২ সালে, দিল্লির জামা মসজিদে তিনি একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেখানে বৈদিক মন্ত্র পাঠের পর তিনি প্রধানত মুসলিম শ্রোতাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন—যা তাঁর সংলাপ-বিশ্বাস, সাহস ও সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

    কংগ্রেস ত্যাগ ও হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ততা

    সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু স্বার্থ ও সামাজিক সংস্কারের প্রশ্নে কংগ্রেসের অবস্থানে তিনি হতাশ হন। পরে মদন মোহন মালব্য–সহ অন্যান্য নেতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি হিন্দু মহাসভা–র সঙ্গে কাজ করেন এবং হিন্দু সমাজের সংগঠনের পক্ষে সওয়াল করেন।

    অস্পৃশ্যতা বিরোধী আন্দোলন

    অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কল্যাণমূলক প্রকল্পে কংগ্রেস পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা না করায় তিনি কংগ্রেসের উপ-কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। ড. বি. আর. আম্বেদকর তাঁকে “অস্পৃশ্যদের সবচেয়ে বড় ও আন্তরিক সমর্থক” বলে উল্লেখ করেন। তিনি কেরালার ভাইকোম সত্যাগ্রহ-কেও সমর্থন করেন।

    সাংবাদিকতা ও সামাজিক প্রচার

    স্বামী শ্রদ্ধানন্দ ছিলেন এক দক্ষ লেখক ও সাংবাদিক। তিনি উর্দু পত্রিকা ‘তেজ’ এবং হিন্দি দৈনিক ‘অর্জুন’ প্রতিষ্ঠা করেন। দেবনাগরী লিপিতে হিন্দি ভাষার প্রসার, নারী শিক্ষা ও সমাজসেবায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা নেন।

    শুদ্ধি আন্দোলন ও হিন্দু পুনর্গঠন

    ধর্মান্তর নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি শুদ্ধি আন্দোলন–এর নেতৃত্ব দেন, যার লক্ষ্য ছিল ধর্মান্তরিত হিন্দুদের পুনরায় হিন্দু সমাজে ফিরিয়ে আনা। আগ্রা, মথুরা ও ভরতপুর অঞ্চলে—বিশেষত রাজপুত সম্প্রদায়ের মধ্যে—বৃহৎ শুদ্ধি কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

    চিরস্থায়ী উত্তরাধিকার

    ২৩ ডিসেম্বর ১৯২৬, দিল্লিতে নিজের বাসভবনে নিউমোনিয়া থেকে সেরে ওঠার সময় আবদুল রশিদ নামে এক ব্যক্তি আলোচনার ছলে এসে তাঁকে খুব কাছ থেকে গুলি করে। সব চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি প্রাণ হারান। এই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত শিবির থেকে নিন্দা জানানো হয়। প্রায় এক শতাব্দী পরও স্বামী শ্রদ্ধানন্দ নির্ভীক সংস্কার, বৌদ্ধিক সাহস ও জাতীয় সেবার প্রতীক হিসেবে স্মরণীয়। শিক্ষা, সমাজ সংস্কার, স্বাধীনতা আন্দোলন ও সভ্যতাগত পুনর্জাগরণে তাঁর অবদান আজও প্রেরণা জোগায়। সহিংসতায় তাঁর জীবন থেমে গেলেও, তাঁর চিন্তা ও কর্ম—বিশেষত গুরুকুল কাংরি–র মাধ্যমে—আজও জীবিত।

  • Ramakrishna 540: “ডুবলো নয়ন ফিরে না এলো, গৌর রূপসাগরে সাঁতার ভুলে, তলিয়ে গেল আমার মন”

    Ramakrishna 540: “ডুবলো নয়ন ফিরে না এলো, গৌর রূপসাগরে সাঁতার ভুলে, তলিয়ে গেল আমার মন”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই
    গুহ্যকথা—“তিনজনই এক”

    বলরামের বাড়ির বৈঠকখানার পশ্চিমপার্শ্বের ঘরে ঠাকুর বিশ্রাম করিতেছেন, নিদ্রা জাইবেন। গণুর মার বাড়ি হইতে ফিরিতে অনেক রাত হইয়া গিয়াছে। রাত পৌনে এগারটা হইবে।

    ঠাকুর (Ramakrishna) বলিতেছেন, “যোগীন একটু পায়ে হাতটা বুলিয়ে দাও তো।”

    কাছে মণি বসিয়া আছেন।

    যোগীন পায়ে হাত বুলাইয়া দিতেছেন (Kathamrita); এমন সময় ঠাকুর বলিতেছেন, আমার ক্ষিদে পেয়েছে, একটু সুজি খাব।

    ব্রাহ্মণী সঙ্গ সঙ্গে এখানেও আসিয়াছেন। ব্রাহ্মণীর ভাইটি বেশ বাঁয়া তবলা বাজাইতে পারেন। ঠাকুর ব্রাহ্মণিকে আবার দেখিয়া বলিতেছেন, “এবার নরেন্দ্র এলে, কি আর কোনও গাইয়ে লোক এলে ওঁর ভাইকে ডেকে আনলেই হবে।”

    ঠাকুর একটু সুজি খাইলেন। ক্রমে যোগীন ইত্যাদি ভক্তেরা ঘর হইতে চলিয়া গেলেন। মণি ঠাকুরের পায়ে হাত বুলাইতেছেন, ঠাকুর তাঁহার সহিত কথা কহিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—আহা, এদের (ব্রাহ্মণীদের) কি আহ্লাদ!

    মণি—কি আশ্চর্য, যীশুকৃষ্টের সময় ঠিক এইরকম হয়েছিল! তারাও দুটি মেয়েমানুষ ভক্ত, দুই ভগ্নী। মার্থা আর মেরী।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (উৎসুক হইয়া)—তাদের গল্প কি বল তো (Kathamrita)।

    মণি—যীশুকৃষ্ট তাঁদের বাড়িতে ভক্তসঙ্গে ঠিক এইরকম করে গিয়েছিলেন। একজন ভগ্নী তাঁকে দেখে ভাবোল্লাসে পরিপূর্ণ হয়েছিল। যেমন গৌরের গানে আছে,—

              ‘ডুবলো নয়ন ফিরে না এলো।
    গৌর রূপসাগরে সাঁতার ভুলে, তলিয়ে গেল আমার মন।’

    “আর-একটি বোন একলা খাবর-দাবার উদ্যোগ করছিল। সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে যীশুর কাছে নালিশ করলে, প্রভু, দেখুন দেখি—দিদির কি অন্যায়! উনি এখানে একলা চুপ করে বসে আছেন, আর আমি (Ramakrishna) একলা এই সব উদ্যোগ করছি?

    “তখন যীশু বললেন, তোমার দিদিই ধন্য, কেন না মানুষ জীবনের যা প্রয়োজন (অর্থাৎ ঈশ্বরকে ভালবাসা—প্রেম) তা ওঁর হয়েছে।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ—আচ্ছা তোমার এ-সব দেখে কি বোধ হয়?

    মণি—আমার বোধ হয়, তিনজনেই এক বস্তু!—যীশুখ্রীষ্ট, চৈতন্যদেব আর আপনি—একব্যক্তি!

    শ্রীরামকৃষ্ণ—এক এক! এক বইকি। তিনি (ঈশ্বর),—দেখছ না,—যেন এর উপর এমন করে রয়েছে!

    এই বলিয়া ঠাকুর নিজের শরীরের উপর অঙ্গুলি নির্দেশ করিলেন যেন বলছেন, ঈশ্বর তাঁরই শরীরধারণ করে অবতীর্ণ হয়েই রয়েছেন।

  • Ramakrishna 539: “নয়ন-বাঁকা, বাঁকা-শিখিপাখা, রাধিকা-হৃদিরঞ্জন; গোবর্ধনধারণ, বনকুসুমভূষণ, দামোদর কংসদর্পহারী, শ্যাম রাসরসবিহারী”

    Ramakrishna 539: “নয়ন-বাঁকা, বাঁকা-শিখিপাখা, রাধিকা-হৃদিরঞ্জন; গোবর্ধনধারণ, বনকুসুমভূষণ, দামোদর কংসদর্পহারী, শ্যাম রাসরসবিহারী”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই

    গণুর মার বাড়িতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    ঠাকুর (Ramakrishna) বলিতেছেন, “এর উপরেই বস না। আই আমি লিচ্ছি।” এই বলিয়া আসন গুটাইয়া লইলেন। ছোকরারা গান গাহিতেছে:

    কেশব কুরু করুণাদীনে কুঞ্জকাননচারী
    মাধব মনোমোহন মোহন মুরলীধারী।
    (হরিবোল, হরিবোল, হরিবোল, মন আমার) ॥
    ব্রজকিশোর, কালীয়হর কাতরভয়ভঞ্জন,
    নয়ন-বাঁকা, বাঁকা-শিখিপাখা, রাধিকা-হৃদিরঞ্জন;
    গোবর্ধনধারণ, বনকুসুমভূষণ, দামোদর কংসদর্পহারী।
    শ্যাম রাসরসবিহারী।
    (হরিবোল, হরিবোল, হরিবোল, মন আমার) ॥

    গান—এস মা জীবন উমা—ইত্যাদি।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Kathamrita)—আহা কি গান!—কেমন বেহালা!—কেমন বাজনা!

    একটি ছোকরা ফ্লুট বাজাইতেছিলেন। তাঁহার দিকে ও অপর আর আকটি ছোকরার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া বলিতেছেন। “ইনি ওঁর যেন জোড়।”

    এইবার কেবল কনসার্ট বাজনা হইতে লাগিল। বাজনার পর ঠাকুর আনন্দিত হইয়া বলিতেছেন, “বা! কি চমৎকার!”

    একটি ছোকরাকে নির্দেশ করিয়া বলিতেছেন, “এঁর সব (সবরকম বাজনা) জানা আছে।”

    মাস্টারকে বলিতেছেন,—এঁরা সব বেশ লোক।”

    ছোকরাদের (Ramakrishna) গান-বাজনার পর তাহারা ভক্তদের বলিতেছে—“আপনারা কিছু গান!” ব্রাহ্মণী দাঁড়াইয়া আছেন। তিনি দ্বারের কাছ থেকে বলিলেন, গান এরা কেউ জানে না, এক মহিমবাবু বুঝি জানেন, তা ওঁর সামনে উনি গাইবেন না।

    একজন ছোকরা — কেন? আমি বাবা সুমুখে গাইতে পারি।

    ছোট নরেন (উচ্চহাস্য করিয়া) — অতদূর উনি এগোননি!

    সকলে হাসিতেছেন। কিয়ৎক্ষণ পরে ব্রাহ্মণী আসিয়া বলিতেছেন,—“আপনি ভিতরে আসুন।” শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেছেন (Kathamrita), “কেন গো!”

    ব্রাহ্মণী—সেখানে জলখাবার দেওয়া হয়েছে; যাবেন?

    শ্রীরামকৃষ্ণ—এইখানেই এনে দাও না।

    ব্রাহ্মণী—গণুর মা বলেছে, ঘরটায় একবার পায়ের ধুলা দিন, তাহলে ঘর কাশী হয়ে থাকবে, — ঘরে মরে গেলে আর কোন গোল থাকবে না।

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna), ব্রাহ্মণী ও বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে অন্তঃপুরে গমন করিলেন। ভক্তেরা চাঁদের আলোতে বেড়াইতে লাগিলেন। মাস্টার ও বিনোদ বাড়ির দক্ষিণদিকে সদর রাস্তার উপর গল্প করিতে করিতে পাদচারণ করিতেছেন!

  • Ramakrishna 538: “পাড়ার ছেলে-বুড়ো সকলেই ঠাকুরের আগমন সংবাদ শুনিয়া ব্যস্ত”

    Ramakrishna 538: “পাড়ার ছেলে-বুড়ো সকলেই ঠাকুরের আগমন সংবাদ শুনিয়া ব্যস্ত”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই

    গণুর মার বাড়িতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    গণুর মার বাড়ির বৈঠকখানায় ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) বসিয়া আছেন। ঘরটি একতলায়, ঠিক রাস্তার উপর। ঘরের ভিতর ঐকতান বাদ্যের (Concert) আখড়া আছে। ছোকরারা বাদ্যযন্ত্র লইয়া ঠাকুরের প্রীত্যর্থে মাঝে মাঝে বাজাইতেছিল।

    রাত সাড়ে আটটা। আজ আষাঢ় মাসের কৃষ্ণা প্রতিপদ। চাঁদের আলোতে আকাশ, গৃহ, রাজপথ সব যেন প্লাবিত হইয়াছে। ঠাকুরের সঙ্গে সঙ্গে ভক্তেরা আসিয়া ওই ঘরে বসিয়াছেন।

    ব্রাহ্মণীও সঙ্গে সঙ্গে আসিয়াছেন। তিনি একবার বাড়ির ভিতর যাইতেছেন, একবার বাহিরে আসিয়া বৈঠকখানার দরজার কাছে আসিয়া দাঁড়াইতেছেন। পাড়ার কতকগুলি ছোকরা বৈঠকখানার জানলার উপর উঠিয়া ঠাকুরকে দেখিতেছে। পাড়ার ছেলে-বুড়ো সকলেই ঠাকুরের আগমন সংবাদ শুনিয়া ব্যস্ত হইয়া মহাপুরুষ(Ramakrishna) দর্শন করিতে আসিয়াছেন।

    জানলার উপর ছেলেরা উঠিয়াছে দেখিয়া ছোট নরেন বলিতেছেন, “ওরে তোরা ওখানে কেন? যা, যা বাড়ি যা।” ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সস্নেহে বলিতেছেন (Kathamrita), “না, থাক না, থাক না।”

    ঠাকুর মাঝে মাঝে বলিতেছেন, “হরি ওঁ! হরি ওঁ!”

    শতরঞ্জির উপর একখানি আসন দেওয়া হইয়াছে, তাহার উপর শ্রীরামকৃষ্ণ বসিয়াছেন। ঐকতান বাদ্যের ছোকরাদের গান গাহিতে (Kathamrita) বলা হইল। তাহাদের বসিবার সুবিধা হইতেছে না, ঠাকুর তাঁহার নিকটে শতরঞ্জিতে বসিবার জন্য তাহাদের আহ্বান করিলেন।

  • Ramakrishna 537: “সকলকে বলি, আয়রে আমার সুখ দেখে যা!—যাই,—যোগীনকে বলিগে, আমার ভাগ্যি দেখে যা!”

    Ramakrishna 537: “সকলকে বলি, আয়রে আমার সুখ দেখে যা!—যাই,—যোগীনকে বলিগে, আমার ভাগ্যি দেখে যা!”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই
    শোকাতুরা ব্রাহ্মণীর বাটীতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    ব্রাহ্মণী (Ramakrishna) অধীর হইয়া বলিতেছেন, “ওগো, আমি যে আহ্লাদে আর বাঁচি না, গো! তোমরা সব বল গো আমি কেমন করে বাঁচি! ওগো, আমার চণ্ডী যখন এসেছিল, — সেপাই শান্ত্রী, সঙ্গে করে— আর রাস্তায় তারা পাহারা দিচ্ছিল—তখন যে এত আহ্লাদ হয়নি গো!—ওগো চণ্ডীর শোক এখন একটুও আমার নাই! মনে করেছিলাম, তিনি যেকালে এলেন না, যা আয়োজন করলুম, সব গঙ্গার জলে ফেলে দেব;—আর ওঁর (ঠাকুরের) সঙ্গে আলাপ করব না, যেখানে আসবেন একবার যাব, অন্তর থেকে দেখব,—দেখে চলে আসব।

    “যাই— সকলকে বলি, আয়রে আমার সুখ দেখে যা!—যাই,— যোগীনকে বলিগে, আমার ভাগ্যি দেখে যা!”

    ব্রাহ্মণী (Ramakrishna) আবার আনন্দে অধীর হইয়া বলিতেছেন, “ওগো খেলাতে (লটারী-তে) একটা টাকা দিয়ে মুটে এক লাখ টাকা পেয়েছিল,—সে যেই শুনলে এক লাখ টাকা পেয়েছি, অমনি আহ্লাদে মরে গিছল—সত্য সত্য মরে গিছল!—ওগো আমার যে তাই হল গো! তোমরা সকলে আশীর্বাদ কর, না হলে আমি সত্য সত্য মরে যাব।”

    মণি ব্রাহ্মণীর আর্তি ও ভাবের অবস্থা দেখিয়া মোহিত হইয়া গিয়াছেন। তিনি তাঁহার পায়ের ধুলা লইতে গেলেন। ব্রাহ্মণী বলিতেছেন, ‘সে কি গো!’—তিনি মণিকে প্রতিপ্রণাম করিলেন।

    ব্রাহ্মণী, ভক্তেরা আসিয়াছেন দেখিয়া আনন্দিত হইয়াছেন আর বলিতেছেন, “তোমরা সব এসেছ,—ছোট নরেনকে এনেছি,—বলি তা না হলে হাসবে কে!” ব্রাহ্মণী এইরূপ কথাবার্তা কহিতেছেন, উহার ভগ্নী আসিয়া ব্যস্ত হইয়া বলিতেছেন, “দিদি এসো না! তুমি এখানে দাঁড়ায়ে থাকলে কি হয়? নিচে এসো! আমরা কি একলা পারি।”

    ব্রাহ্মণী আনন্দে বিভোর! ঠাকুর ও ভক্তদের দেখিতেছেন। তাঁদের ছেড়ে যেতে আর পারেন না।

    এইরূপ কথাবার্তার পর ব্রাহ্মণী অতিশয় ভক্তিসহকারে ঠাকুরকে অন্য ঘরে লইয়া গিয়া মিশটান্নাদি নিবেদন করিলেন। ভক্তেরাও ছাদে বসিয়া সকলে মিষ্টমুখ করিলেন।

    রাত প্রায় ৮টা হইল, ঠাকুর বিদায় গ্রহণ করিতেছেন। নিচের তলায় ঘরের কোলে বারান্দা, বারান্দা দিয়ে পশ্চিমাস্য হইয়া উঠানে আসিতে হয়। তাহার পর গোয়ালঘর ডান দিকে রাখিয়া সদর দরজায় আসিতে হয়। ঠাকুর যখন বারান্দা দিয়া ভক্তসঙ্গে সদর দরজার দিকে আসিতেছেন, তখন ব্রাহ্মণী (Kathamrita) উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতেছেন, “ও বউ, শীঘ্র পায়ের ধুলা নিবি আয়!” বউ ঠাকুরানী প্রণাম করিলেন। ব্রাহ্মণীর একটি ভাইও আসিয়া প্রণাম করিলেন।

    ব্রাহ্মণী ঠাকুরকে বলিতেছেন, “এই আর একটি ভাই; মুখ্যু।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—না, না, সব ভাল মানুষ।

    একজন সঙ্গে সঙ্গে প্রদীপ ধরিয়া আসিতেছেন, আসিতে আসিতে এক যায়গায় তেমন আলো হইল না।

    ছোট নরেন উচ্চৈঃস্বরে বলিতেছেন, “পিদ্দিম ধর, পিদ্দিম ধর! মনে করো না যে, পিদ্দিম ধরা ফুরিয়ে গেল!” (সকলের হাস্য)

    এইবার গোয়ালঘর। ব্রাহ্মণী ঠাকুরকে বলিতেছেন, এই আমার গোয়ালঘর। গোয়ালঘরের সামনে একবার দাঁড়াইলেন, চতুর্দিকে ভক্তগণ। মণি ভূমিষ্ঠ হইয়া ঠাকুরকে প্রণাম করিতেছেন ও পায়ের ধুলা লইতেছেন।

    এইবার ঠাকুর গণুর মার বাড়ি যাইবেন।

  • Ramakrishna 536: “দিদি এই গেলেন নন্দ বোসের বাড়ি খবর নিতে, কেন এত দেরি হচ্ছে— এতক্ষণে ফিরবেন”

    Ramakrishna 536: “দিদি এই গেলেন নন্দ বোসের বাড়ি খবর নিতে, কেন এত দেরি হচ্ছে— এতক্ষণে ফিরবেন”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই
    শোকাতুরা ব্রাহ্মণীর বাটীতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    ঠাকুর (Ramakrishna) বাগবাজারের একটি শোকাতুরা ব্রাহ্মণীর বাড়ি আসিয়াছেন। বাড়িটি পুরাতন ইষ্টকনির্মিত। বাড়ি প্রবেশ করিয়াই বাম দিকে গোয়ালঘর। ছাদের উপর বসিবার স্থান হইয়াছে। ছাদে লোক কাতার দিয়া, কেহ দাঁড়াইয়া কেহ বসিয়া আছেন। সকলেই উৎসুক — কখন ঠাকুরকে দেখিবেন।

    ব্রাহ্মণীরা দুই ভগ্নী, দুই জনেই বিধবা। বাড়িতে এঁদের ভায়েরাও সপরিবারে থাকেন। ব্রাহ্মণীর একমাত্র কন্যা দেহত্যাগ করাতে তিনি যারপরনাই শোকাতুরা। আজ ঠাকুর গৃহে পদার্পণ করিবেন বলিয়া সমস্ত দিন উদ্যোগ করিতেছেন। যতক্ষণ ঠাকুর শ্রীযুক্ত নন্দ বসুর বাড়িতে ছিলেন, ততক্ষণ ব্রাহ্মণী ঘর-বাহির করিতেছিলেন, — কখন তিনি আসেন। ঠাকুর বলিয়া দিয়াছিলেন যে, নন্দ বসুর বাড়ি হইতে আসিয়া তাঁহার বাড়িতে আসিবেন। বিলম্ব হওয়াতে তিনি ভাবিতেছিলেন, তবে বুঝি ঠাকুর আসিবেন না।

    ঠাকুর (Ramakrishna) ভক্তসঙ্গে আসিয়া ছাদের উপর বসিবার স্থানে আসন গ্রহণ করিলেন। কাছে মাদুরের উপর মাস্টার, নারাণ, যোগীন সেন, দেবেন্দ্র, যোগীন। কিয়ৎক্ষণ পরে ছোট নরেন প্রভৃতি অনেক ভক্তেরা আসিয়া জুটিলেন। ব্রাহ্মণীর ভগ্নী ছাদের উপর আসিয়া ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া বলিতেছেন—“দিদি এই গেলেন নন্দ বোসের বাড়ি খবর নিতে, কেন এত দেরি হচ্ছে;—এতক্ষণে ফিরবেন।”

    নিচে একটি শব্দ হওয়াতে তিনি আবার বলিতেছেন (Kathamrita)—“ওই দিদি আসছেন।” এই বলিয়া তিনি দেখিতে লাগিলেন। কিন্তু তিনি এখনও আসিয়া পৌঁছেন নাই।

    ঠাকুর সহাস্যবদন, ভক্তপরিবৃত হইয়া বসিয়া আছেন।

    মাস্টার (দেবেন্দ্রের প্রতি)—কি চমৎকার দৃশ্য। ছেলে-বুড়ো, পুরুষ-মেয়ে কাতার দিয়ে দাঁড়িয়া রয়েছে! সকলে কত উৎসুক—এঁকে দেখবার জন্য! আর এঁর কথা শোনবার জন্য!

    দেবেন্দ্র (শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি)—মাস্টার মশাই বলছেন যে, এ জায়গাটি নন্দ বোসের চেয়ে ভাল জায়গা; — এদের কি ভক্তি!

    ঠাকুর হাসিতেছেন।

    এইবার ব্রাহ্মণীর ভগ্নী বলিতেছেন, “ওই দিদি আসছেন।”

    ব্রাহ্মণী আসিয়া ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া কি বলিবেন (Kathamrita), কি করিবেন কিছুই ঠিক করিতে পারিতেছেন না।

LinkedIn
Share