মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ২০ ও ২১ জুন দু’দিনের গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গ সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (PM Narendra Modi)। হুগলির তারকেশ্বরে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ (Paschimbanga Divas) উদযাপন থেকে শুরু করে কলকাতায় আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের (International Yoga Day) নেতৃত্ব এবং গার্ডেনরিচে (GRSE) নির্মিত তিনটি যুদ্ধজাহাজের কমিশনিং— এই সফরে উন্নয়ন, কৃষি, অবকাঠামো, আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা এবং রাজনৈতিক বার্তা— সবকিছুকেই একসঙ্গে সামনে আনতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফর শুধু সরকারি প্রকল্প উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ‘বিকশিত বাংলা, বিকশিত ভারত’-এর (Viksit Bengal Viksit Bharat) রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক রূপরেখা তুলে ধরার একটি বড় মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহৃত হবে।
তারকেশ্বরে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’: উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মেলবন্ধন
২০ জুন হুগলির তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত হবে রাজ্যস্তরের ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ উদযাপন। এ বছরের থিম— ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল: হেরিটেজ, হারমোনি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বসম্পন্ন তারকেশ্বরকে বেছে নেওয়ার মধ্যেও রাজনৈতিক তাৎপর্য দেখছেন পর্যবেক্ষকরা, কারণ এই অঞ্চল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের (Syama Prasad Mookerjee) স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। প্রধানমন্ত্রী এখানে রেল, কৃষি, মৎস্য, পশুপালন ও গ্রামীণ উন্নয়ন সংক্রান্ত একাধিক প্রকল্পের উদ্বোধন, শিলান্যাস ও জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করবেন। কেন্দ্রের দাবি, এসব প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে।
২৩তম কিস্তির পিএম কিসান নিধি: বাংলার ৪৫ লক্ষের বেশি কৃষকের অ্যাকাউন্টে টাকা
সফরের অন্যতম বড় আকর্ষণ হল প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি (PM-KISAN)-র ২৩তম কিস্তি প্রকাশ। এই কিস্তিতে দেশজুড়ে ৯.৪৪ কোটিরও বেশি কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ১৮,৮৮০ কোটি টাকারও বেশি স্থানান্তর করা হবে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ৪৫ লক্ষের বেশি কৃষক পাবেন ৯০০ কোটিরও বেশি টাকা। ২০১৯ সালে প্রকল্প চালুর পর পশ্চিমবঙ্গে কিষাণ সম্মান নিধির আওতায় মোট বিতরণের পরিমাণ ১৫ হাজার কোটি টাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্র। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কৃষক-ভিত্তিক এই আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি বাংলার গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্কের কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে।
বাংলায় প্রথমবার পূর্ণমাত্রায় ফসল বিমা প্রকল্প
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণাগুলির মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা (PMFBY)-র সূচনা। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে প্রায় ৫০ লক্ষ কৃষক এবং ১৪ লক্ষ হেক্টর কৃষিজমি এই প্রকল্পের আওতায় আসবে। বিমাকৃত ফসলের সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ২৮,১৪০ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্পের পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় কৃষকদের একটি বড় অংশ এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। ফলে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে কৃষি ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডিজিটাল কৃষির যুগে বাংলায় এগ্রিস্ট্যাক
প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গে এগ্রিস্ট্যাক (AgriStack) চালু করবেন, যা ডিজিটাল অ্যাগ্রিকালচার মিশনের অংশ। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষকরা সার বিতরণ, কিষাণ ক্রেডিট কার্ড, সরাসরি আর্থিক সহায়তা (DBT), ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ফসল ক্রয়সহ বিভিন্ন পরিষেবা একক ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পেতে পারবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি তথ্যভান্ডার ডিজিটাল হওয়ায় সরকারি সহায়তা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে পৌঁছনো সহজ হবে।
প্রাকৃতিক কৃষি ও ধান-ধান্য কৃষি যোজনায় জোর
পশ্চিমবঙ্গে চালু হচ্ছে ন্যাশনাল মিশন অন ন্যাচারাল ফার্মিং। ২০২৬-২৭ সালে ১৭,৩০০ হেক্টর জমি জুড়ে ৩৪৬টি প্রাকৃতিক কৃষি ক্লাস্টার গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ধান-ধান্য কৃষি যোজনা (PMDDKY)-র আওতায় পুরুলিয়া, দার্জিলিং, আলিপুরদুয়ার ও ঝাড়গ্রাম জেলায় কৃষি উৎপাদন, সেচ, ফসল বৈচিত্র্য এবং কৃষি অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়া হবে। এই চারটি জেলার নির্বাচনও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এগুলি ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক দিক থেকে রাজ্যের তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলির মধ্যে পড়ে।
মৎস্য ও পশুপালন খাতে বড় বিনিয়োগ
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফ্রেজারগঞ্জে আধুনিকীকৃত মাছ ধরার বন্দর এবং বীরভূমের সাঁইথিয়ায় আধুনিক মাছ বাজারের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া নদিয়ার হরিণঘাটায় পূর্ব ভারতের প্রথম আঞ্চলিক ছাগল বীর্য উৎপাদন গবেষণাগার ও সিমেন ব্যাঙ্কও উদ্বোধন করা হবে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষির পাশাপাশি মৎস্য ও পশুপালন খাতকে শক্তিশালী করা গ্রামীণ আয় বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫৯০ কোটি টাকার রেল প্রকল্প: হাওড়া ও পূর্ব মেদিনীপুরে জোর
রেল ক্ষেত্রে প্রায় ৫৯০ কোটি টাকার প্রকল্প ঘোষণা করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
- ● হাওড়ার সাঁকরাইল-সাঁতরাগাছি লিংক লাইন প্রকল্পের উদ্বোধন
- ● হাওড়ায় ৩০০ শয্যার নতুন ডিভিশনাল রেলওয়ে হাসপাতালের শিলান্যাস
- ● পূর্ব মেদিনীপুরের হাউর ও রাধামোহনপুরের মধ্যে রোড ওভারব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার অধীনে ৩১৫ কিলোমিটারেরও বেশি দৈর্ঘ্যের ৪৯টি রাস্তা প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন।
কলকাতায় আন্তর্জাতিক যোগ দিবস: বিশ্বমঞ্চে ভারতের সফট পাওয়ার
২১ জুন সকালে কলকাতার রেড রোডে অনুষ্ঠিত হবে ১২তম আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের মূল অনুষ্ঠান। এবারের থিম ‘যোগা ফর হেলদি এজিং’ (Yoga for Healthy Ageing)। ২০১৫ সালে রাষ্ট্রসংঘে ভারতের প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস ভারতীয় কূটনীতির অন্যতম সফল সফট-পাওয়ার উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। নিউ ইয়র্ক, শ্রীনগর, মাইসুরু, লখনউসহ বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠান পরিচালনার পর এবার কলকাতাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ২,৫০০ স্থানে এবং ২১০টিরও বেশি ভারতীয় দূতাবাস ও মিশনে এদিন যোগ দিবস পালিত হবে।
তিন যুদ্ধজাহাজ কমিশনিং: আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তির প্রদর্শন
সফরের সবচেয়ে কৌশলগত অংশ নিঃসন্দেহে কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বন্দরে তিনটি দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত নৌযানের কমিশনিং।
প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে তুলে দেবেন—
- ● উন্নত স্টেলথ ফ্রিগেট — আইএনএস দুনাগিরি (INS Dunagiri)
- ● বৃহৎ সমীক্ষা জাহাজ — আইএনএস সংশোধক (INS Sanshodhak)
- ● অ্যান্টি-সাবমেরিন — যুদ্ধজাহাজ আইএনএস অগ্রয় (INS Agray)
তিনটিই নকশা করেছে ভারতীয় নৌবাহিনীর ওয়ারশিপ ডিজাইন ব্যুরো এবং নির্মাণ করেছে গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (Garden Reach Shipbuilders & Engineers) বা সংক্ষেপে জিআরএসই (GRSE)। ৭৫ শতাংশেরও বেশি দেশীয় উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে এই জাহাজগুলিতে এবং ২০০-র বেশি MSME তাদের নির্মাণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও সামুদ্রিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এই তিন জাহাজ ভারতীয় নৌবাহিনীর নজরদারি, সাবমেরিন-বিরোধী যুদ্ধক্ষমতা এবং উপকূলীয় নিরাপত্তাকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করবে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা— দুই-ই স্পষ্ট
মোদির এই বঙ্গ সফরে একদিকে যেমন কৃষক, মৎস্যজীবী, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও অবকাঠামো উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের মাধ্যমে জাতীয় এবং বৈশ্বিক বার্তাও তুলে ধরা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ২০-২১ জুনের এই সফর পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রের উন্নয়নমূলক উপস্থিতি জোরদার করার পাশাপাশি কৃষি, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির এক সমন্বিত প্রদর্শনী হিসেবে গুরুত্ব পেতে চলেছে।









