মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: চিনের তিব্বতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাণ হারালেন অন্তত ১৬ জন। আহত হয়েছেন আরও ৫৪ জন। বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৩৩ মিনিট নাগাদ ৭.০ মাত্রার এই ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে উত্তর তিব্বতের নাগকু শহর ও সংলগ্ন এলাকায়। সরকারি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূমিকম্পের জেরে অন্তত ৩৩৯টি বাড়ি এবং ২০টি পশু রাখার শেড ভেঙে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা জানতে চলছে তল্লাশি। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য আশ্রয়, খাবার ও জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজও শুরু করেছে প্রশাসন।
নাগকুতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, উদ্ধারকাজে ১,৬০০ জন
ভূমিকম্পের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নাগকু শহর ও তার আশপাশের এলাকায়। নাগকু প্রশাসনের মিডিয়া দফতর জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত অন্তত ৩৩৯টি বাড়ি ও ২০টি পশু রাখার শেড ধসে পড়ার খবর মিলেছে। বহু পরিবার ঘরছাড়া হয়েছেন। দুর্গম ও উচ্চ পার্বত্য এলাকায় উদ্ধারকাজ চালানোও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের হয়ে উঠেছে।
উদ্ধার ও ত্রাণের কাজে সাহায্য করতে স্থানীয় জেলা থেকে ১,৬০০-রও বেশি মানুষকে পাঠানো হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কাজ করছেন তাঁরা। মৃত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য বিপুল পরিমাণ জরুরি সামগ্রী পাঠিয়েছে প্রশাসন। এর মধ্যে রয়েছে ১,০০০টি প্রিফ্যাব্রিকেটেড আবাসন ইউনিট, প্রায় ৩,০০০টি তাঁবু, ভাঁজ করা বিছানা, টর্চ এবং শীতের পোশাক। তিব্বতের এই পার্বত্য অঞ্চলে ঠান্ডার মধ্যে বহু মানুষ ঘরছাড়া হওয়ায় অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ধসের জেরে বন্ধ জাতীয় সড়ক, ব্যাহত রেল পরিষেবা
ভূমিকম্পের প্রভাবে তিব্বতের একাধিক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে স্থানীয় রেল কর্তৃপক্ষও জরুরি পদক্ষেপ করেছে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
অন্যদিকে, ভূমিকম্পের জেরে পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ায় জাতীয় সড়ক ৩১৭-এর একটি অংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাস্তা থেকে পাথর ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছে। আপাতত ওই অংশ দিয়ে শুধুমাত্র জরুরি পরিষেবার গাড়ি, উদ্ধারকারী দল এবং প্রশাসনের ত্রাণবাহী যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা এবং দুর্গত এলাকাগুলিতে দ্রুত পৌঁছনোর জন্য রাস্তা পরিষ্কারের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং প্রতিকূল আবহাওয়া উদ্ধারকাজের গতি কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কোথায় ছিল ভূমিকম্পের উৎস? জানাল ইউএসজিএস
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (USGS)-এর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর উপকেন্দ্র ছিল নাগকু শহর থেকে প্রায় ১৯১ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তরপূর্বে। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়।
উত্তর তিব্বতের এই অঞ্চলটি উচ্চ পার্বত্য এবং তুলনামূলকভাবে কম জনবসতিপূর্ণ। তবে ভূমিকম্পের তীব্রতা এবং একাধিক বাড়ি ধসে পড়ার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
প্রাথমিক কম্পনের পর অন্তত সাতটি পরবর্তী কম্পন বা আফটারশকেরও রেকর্ড পেয়েছে USGS। সেগুলির মাত্রা ছিল ৪.৩ থেকে ৫.২-এর মধ্যে। প্রতিটি আফটারশকের উৎপত্তি হয়েছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ১০ কিলোমিটার গভীরে।
তুষারপাতের পূর্বাভাস, বাড়ছে উদ্ধারকাজের চ্যালেঞ্জ
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত তিব্বতের এলাকায় আগামী তিন দিন ধরে থেমে থেমে তুষারপাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে চিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া। এর ফলে উদ্ধারকাজ এবং ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষত যাঁরা বাড়ি হারিয়ে অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের জন্য ঠান্ডা থেকে সুরক্ষা এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে উঠেছে। সেই কারণেই তাঁবু, অস্থায়ী আবাসন, বিছানা ও শীতের পোশাক সরবরাহের উপর জোর দিচ্ছে প্রশাসন।
উদ্ধারকাজে সর্বশক্তি প্রয়োগের নির্দেশ শি জিনপিংয়ের
ভূমিকম্পের পর উদ্ধার ও ত্রাণকাজে সর্বশক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা এবং দুর্গত পরিবারগুলিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উপর জোর দিয়েছেন তিনি। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা চালাচ্ছেন উদ্ধারকারী দলগুলি।
চিনের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এই অঞ্চলে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প এটি। তিব্বতের রাজধানী লাসা থেকে নাগকুর দূরত্ব ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি।
প্রাণহানি, বাড়িঘর ধসে পড়া এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার ঘটনায় উত্তর তিব্বতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আপাতত উদ্ধারকাজ, আহতদের চিকিৎসা এবং ঘরছাড়া পরিবারগুলির জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।

Leave a Reply