মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার বাঁশবেড়িয়া সংলগ্ন ত্রিবেণীতে (Bongo Tribeni Kumbho Mohotsav) রচিত হয়েছে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। ইসলামি আগ্রাসনের কারণে ৭০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা এক প্রাচীন কুম্ভমেলা পুনরায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে। একে বলা হচ্ছে “বঙ্গ ত্রিবেণী কুম্ভ মহোৎসব।” বঙ্গের প্রাচীন সংস্কৃতিকে জাগিয়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন উদ্যোক্তারা।
দক্ষিণ প্রয়াগ হিসেবে ত্রিবেণী (Bongo Tribeni Kumbho Mohotsav)
হুগলি জেলার ত্রিবেণীকে (Bongo Tribeni Kumbho Mohotsav) ঐতিহাসিকভাবে ‘দক্ষিণ প্রয়াগ’ (Daksina Prayag) বলা হয়। এলাহাবাদের (প্রয়াগরাজ) মতো এখানেও রয়েছে গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর সঙ্গমস্থল। তবে প্রয়াগরাজের ত্রিবেণীকে বলা হয় ‘যুক্তবেণী’, আর বাংলার ত্রিবেণীকে বলা হয় ‘মুক্তবেণী’। প্রাচীন শাস্ত্র অনুযায়ী, এটি একটি অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান। সমুদ্র মন্থনের ফলে এখানেও অমৃতের ফোঁটা পড়েছিল। এখানে স্নান করলে এই স্নান অমৃত স্নানের সমান। সূর্য দেবতার দক্ষিণায়ণের ফলে যেমন সব কিছুর পরিবর্তন হয় ঠিক তেমনি মানুষের মনেরও পরিবর্তন হয়।
মানবজাতির পাপ মুছে ফেলা হত
বৈষ্ণব পণ্ডিত বৃন্দাবন দাস সপ্তগ্রাম ত্রিবেণী ঘাটকে সেই স্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন যেখানে সপ্তর্ষিরা তপস্যা করেছিলেন এবং যেখানে স্নানের মাধ্যমে মানবজাতির পাপ মুছে ফেলা যায়। ত্রিবেণীর ভিক্ষু এবং ঋষিরা সপ্তর্ষি (মৈত্রেয়ী, অত্রি, পুলস্ত, পুলহ, ব্যাস, বশিষ্ঠ এবং বিশ্বামিত্র নামে ৭ জন ঋষি তপস্যা করেছিলেন। এখানেই প্রতিবছর সমবেত হন লাখ লাখ ভক্ত। সাধু-সন্তদের নির্দেশনা এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় সহায়তায়, মাঘী সংক্রান্তি ভৈমি-একাদশী উপলক্ষে কুম্ভমেলা এবং কুম্ভ স্নানের আয়োজন করা হয়।
ত্রিবেণীর (Bongo Tribeni Kumbho Mohotsav) ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার এবং কুম্ভ ঐতিহ্যের গর্ব পুনরুজ্জীবিত করতে গত বছর এখানে কুম্ভ মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। ৭ শতাব্দী পর, তিন দিনের কুম্ভ মহাস্নান এবং মেলা এই অঞ্চলে এক নতুন শক্তির সঞ্চার করেছে। ৩ দিন ধরে চলা গঙ্গা আরতি, রুদ্রাভিষেক এবং যজ্ঞে অংশগ্রহণ করেছিলেন লাখ লাখ ভক্ত। এবার ৭০৩ বছর পর ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কুম্ভমেলাকে ২০২২ খ্রিস্টাব্দে আবারও পুনরুজ্জীবিত করা হল।
কেন বন্ধ হয়েছিল এই মেলা?
ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, ১২৯২-১২৯৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে মুসলমান আক্রমণকারী জাফর খান গাজির নেতৃত্বে ত্রিবেণী (Bongo Tribeni Kumbho Mohotsav) অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালানো হয়। সেখানে থাকা পাল যুগের বিষ্ণু মন্দির ধ্বংস করা হয় এবং হিন্দুদের ধর্মীয় জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে প্রায় ৭০০ বছর আগে এই মেলা ও স্নানযাত্রা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে, ওই অঞ্চলে থাকা বহু মন্দির ও বিহার ধ্বংস করে তার উপরেই তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন মসজিদের ইমারত গড়ে তোলা হয়েছিল। মুসলিম শাসকরা যেভাবে যেদিকে এগিয়ে গিয়েছে সেখানকার পুরাতন সংস্কৃতিকে বরাবর ধ্বংস করেছে। ১২৮৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩১৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, সপ্তগ্রাম এবং ত্রিবেণী (Daksina Prayag) দৃঢ়ভাবে ইসলামি আক্রমণকারীদের নিয়ন্ত্রণে আসে। ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে, হিন্দু ও বৌদ্ধ মন্দির এবং মঠগুলি নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল এবং পূর্ববর্তী ধর্মীয় কাঠামোর ওপরেই মসজিদ এবং দরগা নির্মাণ করা হয়েছিল। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস ব্যানার্জি এবং প্রণব রায় জাফর খান গাজি দরগার স্তম্ভ, ভাস্কর্যের স্থাপত্যের টুকরো খুঁজে পেয়েছেন যা হিন্দু, জৈন এবং বৌদ্ধ চিত্রের বিকৃত রূপ ধারণ করে। বিশ্বাস করা হয় যে এই অঞ্চলে শেষ কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৩১৯ খ্রিস্টাব্দে।
পুনরুত্থানের প্রচেষ্টা
দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী পর, স্থানীয় কিছু সাধু, সন্ন্যাসী এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের উদ্যোগে ২০২২ সালে প্রথমবার এই কুম্ভমেলা (Daksina Prayag) পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই আন্দোলনের নেপথ্যে ছিলেন কাঞ্চন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো প্রবাসী গবেষক এবং স্থানীয় ‘ত্রিবেণী কুম্ভ পরিচালনা সমিতি’। তাঁদের গবেষণায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু রেফারেন্সও ব্যবহার করা হয়েছিল। যার মাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল যে ১৩১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এখানে কুম্ভ মেলা হত। ফলে হুগলীর ত্রিবেণী সঙ্গমে স্নান (Bongo Tribeni Kumbho Mohotsav) করার ঘটনা কোনও বিছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সনাতনী সাংস্কৃতিক প্রবাহ।
প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা ও বর্তমান চিত্র
২০২৩ সালের ‘মন কি বাত’ (Mann Ki Baat) অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই মেলার পুনরুজ্জীবনের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “স্বাধীনতার পর যা হওয়া উচিত ছিল, তা হতে অনেক দেরি হয়ে গেল। ২০২৬ সালেও ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই উৎসব পালিত হতে চলেছে, যেখানে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ লাখ ভক্তের সমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য
বর্তমানে এই মেলায় কেবল পবিত্র স্নানই হয় না, বরং বাংলার লোকসংস্কৃতি যেমন—কীর্তন, বাউল গান, গৌড়ীয় নৃত্য, শ্রীখোল এবং গঙ্গাপুজোর মতো নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এটি এখন বাংলার হিন্দুদের হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবছরেই ত্রিবেণী কুম্ভ মেলার আয়োজন করা হয়। দেশের নানা প্রান্ত থেকে সাধু, সন্ন্যাসী, নাগারা আসেন। একই ভাবে প্রচুর পর্যটক এবং ভক্ত সমাগমও হয়।
প্রতি ৬ বছর অন্তর হরিদ্বার এবং প্রয়াগরাজে অর্ধকুম্ভ অনুষ্ঠিত হলেও, প্রতি ১২ বছর অন্তর পূর্ণকুম্ভ অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতি, সূর্য এবং চন্দ্রের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে, পূর্ণকুম্ভ চারটি নির্ধারিত স্থানের একটিতে অনুষ্ঠিত হয়-প্রয়াগরাজ, হরিদ্বার, উজ্জয়িনী এবং নাসিক। প্রতি ১৪৪ বছরে একবার মহাকুম্ভ মেলা (Daksina Prayag) অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে সর্বশেষটি অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালে, প্রয়াগরাজে।
কবে কোন উৎসব?
বঙ্গো ত্রিবেণী কুম্ভ মহোৎসবের (Bongo Tribeni Kumbho Mohotsav) যাত্রাপথ নিম্নরূপ:
১১ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সূর্যোদয়, আদিত্য হৃদয় মন্ত্র ও শান্তি বচন
নগর সংকীর্তন
যোগ আসন (ক্লাব গ্রাউন্ড)
রুদ্রাভিষেক ও রুদ্র মহাযজ্ঞ, শিব সহস্র নাম পাঠ (ক্লাব গ্রাউন্ড)
শিশুদের বসে আঁক প্রতিযোগিতা
ধর্মসভা
গঙ্গা আরতি
১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শান্তি কুম্ভ শোভাযাত্রা এবং আলোকচিত্র প্রদর্শনী
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের ভাষণ
গীতা পাঠ
সাধু ভান্ডারা
কালী কীর্তন
গৌড়িয় নৃত্য
গঙ্গা আরতি
১৩ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬
অমৃতা স্নানযাত্রা
ধর্মসভা
সাধু ভোজন
ধর্মীয় অনুষ্ঠান / কীর্তন (ক্লাব গ্রাউন্ড)
গঙ্গা আরতি (সপ্তর্ষি ঘাট)









