৫৩ কাশীপুর বাগানে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ
দশম পরিচ্ছেদ
১৮৮৬, ৯ই এপ্রিল
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কাশীপুরের বাগানে নরেন্দ্রাদি ভক্তসঙ্গে
বুদ্ধদেব ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ
নরেন্দ্র — যেমন মাংস খাই, — তেমনি (মাংসত্যাগ করে) শুধু ভাতও খেতে পারি — লুন না দিয়েও শুধু ভাত খেতে পারি।
কিয়ৎক্ষণ পরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কথা কহিতেছেন। আবার বুদ্ধদেবের কথা ইঙ্গিত করিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) — (বুদ্ধদেবের) কি, মাথায় ঝুঁটি?
নরেন্দ্র — আজ্ঞা না, রুদ্রাক্ষের মালা অনেক জড় করলে যা হয়, সেই রকম মাথায়।
শ্রীরামকৃষ্ণ — চক্ষু?
নরেন্দ্র — চক্ষু সমাধিস্থ।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের প্রত্যক্ষ দর্শন — “আমিই সেই”
ঠাকুর চুপ করিয়া আছেন (Kathamrita)। নরেন্দ্র ও অন্যান্য ভক্তেরা তাঁহাকে একদৃষ্টে দেখিতেছেন। হঠাৎ তিনি ঈষৎ হাস্য করিয়া আবার নরেন্দ্রের সঙ্গে কথা আরম্ভ করিলেন। মণি হাওয়া করিতেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ (নরেন্দ্রের প্রতি) — আচ্ছা, — এখানে সব আছে, না? — নাগাদ মুসুর ডাল, ছোলার ডাল, তেঁতুল পর্যন্ত।
নরেন্দ্র — আপনি ও-সব অবস্থা ভোগ করে, নিচে রয়েছেন! —
মণি (স্বগত) — সব অবস্থা ভোগ করে, ভক্তের অবস্থায়! —
শ্রীরামকৃষ্ণ — কে যেন নিচে টেনে রেখেছে!
এই বলিয়া ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ মণির হাত হইতে পাখাখানি লইলেন এবং আবার কথা কহিতে লাগিলেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) — এই পাখা যেমন দেখছি, সামনে — প্রত্যক্ষ — ঠিক অমনি আমি (ঈশ্বরকে দেখেছি! আর দেখলাম —
এই বলিয়া ঠাকুর নিজের হৃদয়ে হাত দিয়া ইঙ্গিত করিতেছেন, আর নরেন্দ্রকে বলিতেছেন, “কি বললুম বল দেখি?”
নরেন্দ্র — বুঝেছি।
শ্রীরামকৃষ্ণ — বল দেখি?
নরেন্দ্র ভাল শুনিনি।
শ্রীরামকৃষ্ণ আবার ইঙ্গিত করিতেছেন (Kathamrita), — দেখলাম, তিনি (ঈশ্বর) আর হৃদয় মধ্যে যিনি আছেন এক ব্যক্তি।
নরেন্দ্র — হাঁ, হাঁ, সোঽহম্।
শ্রীরামকৃষ্ণ — তবে একটি রেখামাত্র আছে — (‘ভক্তের আমি’ আছে) সম্ভোগের জন্য।
নরেন্দ্র (মাস্টারকে) — মহাপুরুষ নিজে উদ্ধার হয়ে গিয়ে জীবের উদ্ধারের জন্য থাকেন, — অহঙ্কার নিয়ে থাকেন — দেহের সুখ-দুঃখ নিয়ে থাকেন।
“যেমন মুটেগিরি, আমাদের মুটেগিরি on compulsion (কারে পড়ে)। মহাপুরুষ মুটেগিরি করেন সখ করে।”
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও গুরুকৃপা
আবার সকলে চুপ করিয়া আছেন। অহেতুক-কৃপাসিন্ধু ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আবার কথা কহিতেছেন। আপনি কে, এই তত্ত্ব নরেন্দ্রাদি ভক্তগণকে আবার বুঝাইতেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) নরেন্দ্রাদি ভক্তের প্রতি — ছাদ তো দেখা যায়! — কিন্তু ছাদে উঠা বড় শক্ত!
নরেন্দ্র — আজ্ঞে হাঁ।
শ্রীরামকৃষ্ণ — তবে যদি কেউ উঠে থাকে, দড়ি ফেলে দিলে আর-একজনকে তুলে নিতে পারে।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের পাঁচপ্রকার সমাধি
“হৃষীকেশের সাধু এসেছিল। সে (আমাকে) বললে, কি আশ্চর্য! তোমাতে পাঁচপ্রকার সমাধি দেখলাম!
“কখন কপিবৎ — দেহবৃক্ষে বানরের ন্যায় মহাবায়ু যেন এ-ডাল থেকে ও-ডালে একেবারে লাফ দিয়ে উঠে, আর সমাধি হয়।
“কখন মীনবৎ — মাছ যেমন জলের ভিতরে সড়াৎ সড়াৎ করে যায় আর সুখে বেড়ায়, তেমনি মহাবায়ু দেহের ভিতর চলতে থাকে আর সমাধি হয়।
“কখন বা পক্ষীবৎ — দেহবৃক্ষে পাখির ন্যায় কখনও এডালে কখনও ও-ডালে (Kathamrita)।
“কখন পিপীলিকাবৎ — মহাবায়ু পিঁপড়ের মতো একটু একটু করে ভিতরে উঠতে থাকে, তারপর সহস্রারে বায়ু উঠলে সমাধি হয়। কখন বা তির্যক্বৎ — অর্থাৎ মাহবায়ুর গতি সর্পের ন্যায় আঁকা-ব্যাঁকা; তারপর সহস্রারে গিয়ে সমাধি।”
রাখাল (ভক্তদের প্রতি) — থাক আর কথায়, — অনেক কথা হয়ে গেল; — অসুখ করবে।

Leave a Reply