হাসিনা সরকারকে উৎখাত করার পর থেকেই অশান্ত বাংলাদেশ। মন্দির ভাঙচুর, আগুন, মারধর, খুন-সবেতেই টার্গেট সংখ্যালঘু হিন্দু। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া ইউনূসের কঙ্কালসার চেহারাটা এখন গোটা বিশ্বের কাছে পরিষ্কার। ইসকনের সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসকে গ্রেফতারের পর গোটা বিশ্ব জেনে গিয়েছে, কী ভয়াবহ এবং আতঙ্কের পরিবেশ সেখানে। শুধু কি সাধারণ নিরীহ হিন্দু বা হিন্দুদের মন্দির? না, বেছে বেছে কাঠগড়ায় তুলে চরম শাস্তি দেওয়া হয়েছে আওয়ামি লিগপন্থী জনপ্রতিনিধি, পুলিশ অফিসার থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পদস্থ কর্তাদেরও। কীভাবে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন চলছে, কীভাবে একের পর এক সরকারি অফিসার বা জনপ্রতিনিধির ওপর শাস্তির খাঁড়া নেমে আসছে, তা নিয়েই আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদন। আজ অষ্টম পর্ব।
অশান্ত বাংলাদেশ: টার্গেট হিন্দু-১০
মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: চলতি বছরের অগাস্ট মাসের পাঁচ তারিখে হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশের (Bangladesh Crisis 10) সংখ্যালঘুদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন নেমে আসে। এরপর থেকেই হিন্দুদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ শুরু হয়। চলতি বছরের অক্টোবর মাসেই বড় আকারের সমাবেশ করে বাংলাদেশ সম্মিলিত সংখ্যালঘু জোট (Targeting Minority)। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। গত ৪ অক্টোবর এখানে উপস্থিত ছিলেন হিন্দু সমাজের ধর্মীয় নেতারা এবং তাঁরা নিজেদের বক্তব্যে হিন্দু ধর্ম তথা বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপরে হামলার নিন্দা করেন এবং দোষীদের বিচারের দাবিতে সরব হন।
১৯ জন হিন্দুর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ মামলা (Bangladesh Crisis 10)
প্রসঙ্গত, গত অক্টোবর মাসের ২৬ তারিখ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দাবি সমেত অন্যান্য আট দফা দাবিতে চট্টগ্রামে এক বিশাল হিন্দু সমাবেশ আয়োজন করে সনাতন জাগরণ মঞ্চ নামের একটি সংগঠন। হিন্দু সমাজের ওই সমাবেশের পরে ফের একের পর এক সম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনা শুরু হয়। চট্টগ্রামে অক্টোবর মাসেই বিতর্কিতভাবে দেশদ্রোহী মামলা দায়ের করা হয় ১৯ জন হিন্দুর বিরুদ্ধে। যাঁদের মধ্যে ছিলেন ইস্কন সন্ন্যাসীরাও। অভিযোগ করা হয় যে ইসকনের ওই সন্ন্যাসীরা বাংলাদেশের (Bangladesh Crisis 10) জাতীয় পতাকার ওপরে গৈরিক পতাকা উত্তোলন করেছেন।
২ নভেম্বর সনাতন জাগরণ মঞ্চের সভা
হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ চলতে থাকে নভেম্বর মাসেও। সেই সময়ও বাংলাদেশের (Bangladesh Crisis 10) একাধিক জায়গায় মন্দিরে-মন্দিরে হামলা, সংখ্যালঘু হিন্দুদের বাড়িতে লুট, অগ্নি-সংযোগের ঘটনা ঘটতে থাকে। গত ২ নভেম্বর সেখানকার সনাতন জাগরণ মঞ্চ চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায় সভা করে। চট্টগ্রামের ওই সভার মধ্যে অন্যতম দাবি ছিল, বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হওয়া হামলার বিচার। বিপুল সংখ্যায় হিন্দুরা ওই সমাবেশে যোগদান করে এবং তারা নিরাপত্তা তথা বিচারের দাবিতে গর্জন শুরু করে।
বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা
বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর লাগাতার এমন অত্যাচারের ঘটনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম সমেত বাংলাদেশের (Bangladesh Crisis 10) জেলায় জেলায় বিক্ষোভের পাশাপাশি, নির্যাতিত হিন্দুদের পাশে দাঁড়াতে গোটা বিশ্বের সনাতনীরা মাঠে নেমে পড়ে। এক ব্যাপক হিন্দু আন্দোলন গড়ে ওঠে সারা বিশ্বজুড়ে। বিশ্বের কমবেশি প্রত্যেকটি দেশেই শুরু হয় প্রতিবাদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সনাতনীরা হাতে পোস্টার এবং ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে সব থেকে বড় আকারের বিক্ষোভ হয়। বাংলাদেশি হিন্দু বংশোদ্ভুতরা জাতিসঙ্ঘের সদর দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। নিউইয়র্কের এই বিক্ষোভে ব্যাপক প্রভাব পড়ে দুনিয়াজুড়ে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য সংবাদমাধ্যমও এই ঘটনাগুলিকে খবরের আকারের প্রতিবেদন হিসেবে প্রকাশ করে। বিক্ষোভ চলতে থাকে মিশিগান, ওয়াশিংটন প্রভৃতি শহরে।
বিক্ষোভ হোয়াইট হাউসের সামনেও
অন্যদিকে, হিন্দুরা ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের সামনেও বিক্ষোভ দেখাতে থাকে। গোটা দুনিয়ার নজরে আনা হয় বাংলাদেশ সরকারের এমন বর্বরোচিত আচরণ। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং নির্যাতনের ঘটনায় প্রতিবাদ দেখা যায় ব্রিটেনেও। সেখানেও দলে দলে হিন্দুরা রাস্তায় নামে। বাংলাদেশের হিন্দুদের বিরুদ্ধে হওয়া আক্রমণের ঘটনায় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট বিল্ডিং-এর সামনে বিবিসি হেডকোয়ার্টারের পাশেই বিক্ষোভ চলতে থাকে। একইসঙ্গে বিক্ষোভ দেখানো হয় লন্ডনেও। শুধুমাত্র ব্রিটেন কিংবা আমেরিকা নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও শুরু হয় এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ। অস্ট্রেলিয়াতে ব্যাপক সংখ্যায় হিন্দুরা বিক্ষোভ দেখাতে থাকে। সে দেশে বিক্ষোভ চলে মেলবোর্ন অ্যাডিলেড পার্ক প্রভৃতি স্থানে।
গ্রেফতার করা হয় চিন্ময় প্রভুকে
প্রসঙ্গত, মৌলবাদীদের পাশাপাশি সে দেশে প্রশাসনের মদতেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরে নির্বিচারে অত্যাচার শুরু হয়। হয়রানি করা হতে থাকে সেখানকার সাধু-সন্ন্যাসীদের। ইসকনের হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাস, যিনি ছিলেন সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের অন্যতম মুখপাত্র এবং ইসকনের সন্ন্যাসী, তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকা বিমানবন্দরে চিন্ময় প্রভুকে গ্রেফতার করা হয় ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের ২৫ তারিখ। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় দেশদ্রোহিতার এবং বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে অবমাননা করার। এরপরে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে যেদিন চট্টগ্রাম আদালতে হাজির করা হয়, সেদিন ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয় দুপক্ষের মধ্যে। সেখানে নিহত হয় এক আইনজীবী।
গ্রেফতার চিন্ময় প্রভু, বিক্ষোভ বাংলাদেশজুড়ে
চিন্ময় প্রভুর গ্রেফতারের পরেই বাংলাদেশ জুড়ে আবার ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে সংখ্যালঘু হিন্দুদের মধ্যে। দলে দলে হিন্দুরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করতে থাকেন। বিক্ষোভ শুরু হয় চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে। এর পাশাপাশি ঢাকা, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, সিলেট, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, ফেনী প্রত্যেকটি জায়গাতে চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিতে রাস্তায় নামে দলে দলে হিন্দুরা। একইসঙ্গে বাংলাদেশের ইসকন আনুষ্ঠানিকভাবে চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারির প্রতিবাদ জানায়।
দেশের খবর, দশের খবর, সব খবর, সবার আগে পেতে ফলো করুন আমাদের Whatsapp, Facebook, Twitter, Telegram এবং Google News পেজ।
Leave a Reply