৫২ শ্যামপুকুর বাটীতে ভক্তসঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ
১৮৮৫, ২৪শে অক্টোবর
শ্যামপুকুর বাটীতে নরেন্দ্র, ডাক্তার সরকার প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে
ডাক্তার সরকার ও সর্বধর্ম পরীক্ষা (Comparative Religion)
শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—আর ‘যে কুছ্ হ্যায় তুঁহি হ্যায়।’
ডাক্তার — আহা!
গান সমাপ্ত হইল। ডাক্তার মুগ্ধপ্রায় হইয়াছেন।
কিয়ৎক্ষণ পরে ডাক্তার অতি ভক্তিভাবে হাতজোড় করিয়া ঠাকুরকে বলিতেছেন, ‘তবে আজ যাই্, — আবার কাল আসব।’
শ্রীরামকৃষ্ণ—একটু থাক না! গিরিশ ঘোষকে খপর দিয়েছে। (মহিমাকে দেখাইয়া) ইনি বিদ্বান হরিনামে নাচেন, অহংকার নাই। কোন্নগরে চলে গিছলেন (Kathamrita)— আমরা গিছলাম বলে; আবার স্বাধীন, ধনবান, কারু চাকরি করতে হয় না! (নরেন্দ্রকে দেখাইয়া) এ কেমন?
ডাক্তার — খুব ভাল!
শ্রীরামকৃষ্ণ — আর ইনি —
ডাক্তার — আহা!
মহিমাচরণ — হিন্দুদের দর্শন না পড়লে দর্শন পড়াই হয় না। সাংখ্যের চতুর্বিংশতি তত্ত্ব ইওরোপ জানে না — বুঝতেও পারে না।
শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) — কি তিন পথ তুমি বলো?
মহিমা—সৎপথ—জ্ঞানের পথ। চিৎপথ, যোগের। কর্মযোগ। তাই চার আশ্রমের ক্রিয়া, কি কি কর্তব্য, এর ভিতর আসছে। আনন্দপথ—ভক্তিপ্রেমের পথ।—আপনাতে তিন পথেরই ব্যাপার — আপনি তিন পথেরই খপর বাতলে দেন! (ঠাকুর হাসিতেছেন)
“আমি আর কি বলব? জনক বক্তা, শুকদেব শ্রোতা!”
ডাক্তার বিদায় গ্রহণ করিলেন।
সন্ধ্যার পর সমাধিস্থ—নিত্যগোপাল ও নরেন্দ্র—‘জপাৎ সিদ্ধি’
সন্ধ্যার পর চাঁদ উঠিয়াছে। আজ কোজাগর পূর্ণিমার পরদিন, শনিবার, ৯ই কার্তিক। ঠাকুর সমাধিস্থ! দাঁড়াইয়া আছেন। নিত্যগোপালও তাঁহার কাছে ভক্তিভাবে দাঁড়াইয়া আছেন।
ঠাকুর উপবিষ্ট হইয়াছেন — নিত্যগোপাল পদসেবা করিতেছেন। দেবেন্দ্র কালীপদ প্রভৃতি অনেকগুলি ভক্ত কাছে বসিয়া আছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ (দেবেন্দ্র প্রভৃতির প্রতি) — এমনি মনে উঠছে, নিত্যগোপালের এ-অবস্থাগুলো এখন যাবে,—ওর সব মন কুড়িয়ে আমাতেই আসবে — যিনি এর ভিতর আছেন, তাঁতে।
“নরেন্দ্রকে দেখছো না?—সব মনটা ওর আমারই উপর আসছে!”
ভক্তেরা অনেকে বিদায় লইতেছেন। ঠাকুর দাঁড়াইয়া আছেন। একজন ভক্তকে জপের কথা বলিতেছেন (Ramakrishna)— “জপ করা কি না নির্জনে নিঃশব্দে তাঁর নাম করা। একমনে নাম করতে করতে — জপ করতে করতে — তাঁর রূপদর্শন হয় — তাঁর সাক্ষাৎকার হয়। শিকলে বাঁধা কড়িকাঠ গঙ্গার গর্ভে ডুবান আছে — শিকলের আর-একদিক তীরে বাঁধা আছে। শিকলের এক-একটি পাপ (Link) ধরে ধরে গিয়ে ক্রমে ডুব মেরে শিকল ধরে যেতে ওই কড়ি-কাঠ স্পর্শ করা যায়! ঠিক সেইরূপ জপ করতে করতে মগ্ন হয়ে গেলে ক্রমে ভগবানের সাক্ষাৎকার হয়।”
কালীপদ (সহাস্যে, ভক্তদের প্রতি) — আমাদের এ খুব ঠাকুর! — জপ-ধ্যান, তপস্যা করতে হয় না!
ঠাকুরের (Ramakrishna) গলায় অসুখ করিতেছে। দেবেন্দ্র বলিতেছেন — “এ-কথায় আর ভুলি না।” দেবেন্দ্রের এই মনের ভাব যে ঠাকুর কেবল ভক্তদের ভুলাইবার জন্য অসুখ দেখাইতেছেন।
ভক্তেরা (Kathamrita) বিদায় গ্রহণ করিলেন। রাত্রে কয়েকটি ছোকরা ভক্ত পালা করিয়া থাকিবেন। আজ মাস্টারও রাত্রে থাকিবেন।

Leave a Reply