মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মুম্বইয়ের অ্যান্টিলিয়ায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানি এবং ডিরেক্টর অনন্ত আম্বানির সঙ্গে বৈঠক করলেন তিনি। বাংলায় রিলায়েন্সের নতুন বিনিয়োগ, বর্তমানে চালু থাকা ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং একাধিক নতুন প্রকল্পের সম্ভাবনা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। রিলায়েন্সের তরফেও বৈঠকের কথা নিশ্চিত করা হয়েছে।
অ্যান্টিলিয়ায় প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠক
শিল্পমহলের নজরে থাকা এই বৈঠকটি হয় মুম্বইয়ে আম্বানি পরিবারের বাসভবন ‘অ্যান্টিলিয়া’-য়। সূত্রের খবর, প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে আলোচনা। পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং রাজ্যে রিলায়েন্সের ব্যবসার পরিধি আরও বাড়ানোর বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, বায়োগ্যাস-সহ একাধিক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
বৈঠকের আগে থেকেই অবশ্য বাংলায় রিলায়েন্সের বিনিয়োগ নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। কয়েক দিন আগে একটি শিল্প সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছিলেন, অনন্ত আম্বানির সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। সেখানেই রিলায়েন্সের সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে ডেটা সেন্টার এবং সেমিকন্ডাক্টর হাবের কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, “অনন্ত আম্বানির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনি ও মুকেশ আম্বানি বাংলায় আসছেন। বাংলায় বিনিয়োগ করবেন ওঁরা। ডেটা সেন্টার ও সেমি কন্ডাক্টর হাবে কাজ করবেন।” এরপর গণেশ উৎসবের পর মুম্বই গিয়ে মুকেশ আম্বানি ও অনন্ত আম্বানির সঙ্গে বৈঠকের কথা প্রকাশ্যে জানান শুভেন্দু। সেই ঘোষণার পর থেকেই প্রশ্ন উঠছিল, এই সফর কি শুধুই সৌজন্য সাক্ষাৎ, নাকি বাংলায় বড় বিনিয়োগের রূপরেখা তৈরিই মূল লক্ষ্য?
‘বনতারা’ প্রকল্প নিয়েও আলোচনা?
শুধু শিল্প ও প্রযুক্তি ক্ষেত্র নয়, আম্বানিদের ‘বনতারা’ প্রকল্প নিয়েও বাংলার সঙ্গে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা সামনে এসেছে। সূত্রের খবর, পূর্ব ভারতে বন্যপ্রাণ ও সংরক্ষণকেন্দ্রিক একটি প্রকল্পের সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়ে ভাবনাচিন্তা চলছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার চাইছে উত্তরবঙ্গের তরাই-ডুয়ার্স অথবা পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রামের অরণ্যাঞ্চলকে সম্ভাব্য প্রকল্পের জন্য তুলে ধরতে।
সম্প্রতি পুরুলিয়া সফরে গিয়ে দক্ষিণবঙ্গের প্রথম বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই ঘোষণার সঙ্গে ‘বনতারা’-র সম্ভাব্য প্রকল্পের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে এই মুহূর্তে বাংলায় বনতারা প্রকল্প স্থাপনের বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। বিষয়টি এখনও সম্ভাবনার স্তরেই রয়েছে।
বাংলায় ইতিমধ্যেই রিলায়েন্সের জমি
বাংলায় রিলায়েন্সের বিনিয়োগের সম্ভাবনা একেবারে নতুন নয়। নিউ টাউনের বেঙ্গল সিলিকন ভ্যালি হাবে ইতিমধ্যেই ডেটা সেন্টারের জন্য রিলায়েন্সকে জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যে সেমিকন্ডাক্টর হাব গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও মুখ্যমন্ত্রী আগেই জানিয়েছিলেন। ফলে মুম্বইয়ের এই বৈঠককে শুধু নতুন বিনিয়োগের আলোচনা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না। রাজ্যে রিলায়েন্সের ইতিমধ্যে থাকা ব্যবসা আরও সম্প্রসারণ করা এবং নতুন ক্ষেত্রের দরজা খোলার বিষয়টিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
শিল্পমহলে বিনিয়োগ ঘিরে তৎপরতা
মে মাসে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগ টানার উদ্যোগের কথা বারবার সামনে এনেছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তাপস রায়ও বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। সরকারের দাবি, নতুন শিল্প স্থাপন, পুরনো শিল্পের সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
সম্প্রতি আদিত্য বিড়লা গোষ্ঠীর সঙ্গেও বাংলায় বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শিল্পমহলে আরও একাধিক বড় গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজ্য সরকারের যোগাযোগের খবর সামনে এসেছে। এই আবহে রিলায়েন্সের মতো দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি বৈঠক তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আদানি গোষ্ঠীর প্রকল্পও সামনে
একই সময়ে বাংলায় আদানি গোষ্ঠীর প্রকল্প নিয়েও তৎপরতা চলছে। নিউ টাউনে ২,০০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে গোষ্ঠীটির। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর এই প্রকল্পের শিলান্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে এবং গৌতম আদানির উপস্থিত থাকার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রকল্পটির জন্য ১,০০০ শয্যা আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য রাখার পরিকল্পনার কথাও আগে জানানো হয়েছে।
এদিকে দুর্গাপুজোর আগেই রাজ্যের ৩৩টি শিল্প সংস্থাকে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাও রয়েছে। শিল্প স্থাপন ও ব্যবসার সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরিকে সামনে রেখে একাধিক শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে রাজ্য সরকার।
এই আবহে মুম্বইয়ের অ্যান্টিলিয়ায় মুকেশ ও অনন্ত আম্বানির সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর বৈঠক বাংলায় রিলায়েন্সের পরবর্তী বিনিয়োগ-পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে কোন প্রকল্পে কত বিনিয়োগ হবে, তার চূড়ান্ত ঘোষণা এখনও হয়নি।

Leave a Reply