মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাঁচিতে মর্মান্তিক ঘটনা। ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আত্মহত্যা করলেন আদিবাসী নেত্রী তথা সমাজকর্মী নিশা ভগত (Nisha Bhagat)। ৬ নভেম্বরের এই ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মৃত্যুর আগে ফেসবুক লাইভে রাজ্যের হেমন্ত সোরেন সরকার এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক হেনস্থা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে টার্গেট করার অভিযোগ করেন তিনি। সরকারের অনিয়মের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার মূল্য তাঁকে নিজের জীবন দিয়ে চোকাতে (Tribal Woman Suicide Case) হচ্ছে বলেও দাবি করেন নিশা। ওরাঁও আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য নিশার আদি বাড়ি ঝাড়খণ্ডের গুমলা জেলায়। ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে গুমলা কেন্দ্র থেকে ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চার প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। যদিও জয়ী হতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরেই ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় আন্দোলন করে আসছিলেন নিশা। আদিবাসীদের জমি দখলের সঙ্গে যুক্ত জমি মাফিয়াদের পাশাপাশি ধর্মান্তকরণ কার্যকলাপেরও বিরোধিতা করেছিলেন তিনি।
সরকারের বিরুদ্ধে নিশার ক্ষোভ (Nisha Bhagat)
মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে প্রকাশিত প্রায় ১০ মিনিটের ফেসবুক লাইভে কার্যত ভেঙে পড়তে দেখা যায় নিশাকে। সেখানে রাজ্য সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে তাঁকে এবং তাঁর বাবা-মাকে লাগাতার হেনস্থা করার অভিযোগ করেন তিনি। কান্নায় ভেঙে পড়ে নিশাকে বলতে শোনা যায়, “হেমন্ত সোরেন সরকার এক মহিলাকে অপমান ও অসম্মান করার সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছে। আর সহ্য করতে পারছি না। আমার বাবা-মাকে আর কত কষ্ট সহ্য করতে হবে?”
তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দালাল হওয়ার অভিযোগ তোলা হচ্ছিল বলেও দাবি করেন নিশা। সেই অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, “আমি কারও দালাল নই। নিজের আদিবাসী সমাজের সুরক্ষার জন্যই দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছি।”
লাইভ সম্প্রচারের সময় বারবার প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, নিজের সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে কার্যত একা হয়ে পড়েছিলেন তিনি। পিঠোরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিককেও ফোন করেন নিশা। নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা তাঁকে জানানোর পাশাপাশি যাঁরা তাঁকে হেনস্থা করছেন এবং সামাজিকভাবে হেয় করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি বলেও অভিযোগ করেন। এই চরম সিদ্ধান্তের জন্য নিশা সরাসরি ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার সরকার, অজয় তিরকে নামে এক ব্যক্তি এবং স্থানীয় প্রশাসনের লাগাতার হয়রানিকে দায়ী করেন। খবর পেয়ে পুলিশ নিশার বাড়িতে পৌঁছয়। সেখান থেকে তাঁকে উদ্ধার করে রাঁচির হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিশার বাবার অভিযোগ
নিশার (Nisha Bhagat) মৃত্যুর পর তাঁর বাবা হান্ডু ভগত পিঠোরিয়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। অজয় তিরকে, জ্যোৎস্না কেরকেট্টা-সহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। পিঠোরিয়া থানার কর্তা সুনীল কুমার দাস অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেছেন।
হান্ডুর অভিযোগ, সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাঁর মেয়েকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিশাকে মানসিক ও সামাজিকভাবে হেনস্থা করা হচ্ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর সম্মানহানি করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে।
নিশার বাবার আরও অভিযোগ, লাগাতার অপমান, হয়রানি ও চরিত্রহননের কারণে তাঁর মেয়ে এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছে গিয়েছিলেন যে, বাড়ির বাইরে বেরোতেও ভয় পেতেন।
আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় দীর্ঘদিনের আন্দোলন
আদিবাসী সমাজের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরেই সরব ছিলেন নিশা। তাঁর আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল আদিবাসীদের জন্য পৃথক সারনা ধর্মীয় পরিচয় ও ধর্মীয় বিধির স্বীকৃতি। জল, জঙ্গল ও জমির অধিকার সুরক্ষিত করা, ছোটনাগপুর প্রজাস্বত্ব আইন এবং সাঁওতাল পরগনা প্রজাস্বত্ব আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও পঞ্চায়েত (তফসিলি এলাকায় সম্প্রসারণ) আইন কার্যকর করার (Tribal Woman Suicide Case) দাবিও তুলেছিলেন তিনি।
আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মান্তকরণ কার্যকলাপেরও তীব্র বিরোধিতা করতেন নিশা। তাঁর মৃত্যুর (Nisha Bhagat) ঘটনায় ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তাঁর বাবার দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কী পদক্ষেপ করে, এখন সেটাই দেখার।

Leave a Reply