মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: লাখো ভক্তের ঢল ও ৩৭ কিমি হাঁটা পথ- শ্রাবণী মেলায় (Shrabani Mela 2026) বাবা তারকনাথের পুজোয় সেজে উঠছে তারকেশ্বর (Tarakeswar)। পুণ্যার্থীদের সুরক্ষা ও স্বাচ্ছন্দ্যে নজিরবিহীন প্রশাসনিক উদ্যোগ। শ্রাবণ মাসে বাবা তারকনাথের মাথায় জল ঢালতে প্রতি বছর লাখো লাখো ভক্তের সমাগম হয়। এ বছর প্রায় এক কোটি পুণ্যার্থীর ভিড় হতে পারে- এই লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখেই ঢেলে সাজানো হচ্ছে মেলার সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সম্প্রতি হরিপাল বিডিও অফিসে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠকে এই সংক্রান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা শ্রীরামপুরের বিধায়ক ভাস্কর ভট্টাচার্য, জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদরি, হুগলি গ্রামীণ পুলিশ সুপার কুনওয়ার ভূষণ সিং এবং পুলিশ কমিশনার সুনীল যাদব। বৈঠক শেষে জানানো হয়, মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশিকা মেনে মেলা প্রাঙ্গণ ও যাত্রাপথের নিরাপত্তা কয়েক গুণ বাড়ানো হচ্ছে।
বিশেষ দিনের সূচি
জুলাই ও অগাস্ট মাসজুড়ে শ্রাবণী মেলাকে (Shrabani Mela 2026) ছ’টি পর্বে ভাগ করা হয়েছে। ১৪-২০ জুলাই, ২৪-২৭ জুলাই, ৩১ জুলাই-৩ অগাস্ট, ৭-১০ অগাস্ট, ১৪-১৭ অগাস্ট এবং ২২-২৩ অগাস্ট। শনি, রবি ও সোমবার সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। তাই এই দিনগুলিতে থাকছে বিশেষ ব্যবস্থা। ছোট গলির আনাজ বিক্রেতাদের সকাল ৯টা পর্যন্ত বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের উদ্যোগে তৈরি করা হবে জলসত্র। এখানে ঠান্ডা গরম দু’রকম জলেরই ব্যবস্থা থাকবে।
যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প রুট
মেলা উপলক্ষে উক্ত দিনগুলিতে শ্বেতপুর মোড়, দিল্লি রোড, দীর্ঘাঙ্গী মোড় থেকে ১২ নম্বর রুট, বিঘাটি মোড়, পিয়ারাপুর, চাঁপসরা, বৈদ্যবাটি- তারকেশ্বর রোড, চন্দননগর হাসপাতাল মোড় থেকে বৈদ্যবাটি চৌমাথায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। পাশাপাশি ডালহৌসি জুটমিল, মঞ্জুশ্রী, রিষড়া মৈত্রীপথ ও বাঘখাল পর্যন্ত নো-এন্ট্রি থাকবে। চন্দননগর, ভদ্রেশ্বর, শ্রীরামপুর, রিষড়া এবং উত্তরপাড়া থানা সীমানার প্রধান সড়কগুলিতে অটো, টোটো, ই-রিকশা ও ইঞ্জিন ভ্যান সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
বিকল্প রাস্তার নির্দেশিকা
- চন্দননগর ও ভদ্রেশ্বর এলাকা: পালপাড়া রোড, বিঘাটি মোড় এবং দিল্লি রোড হয়ে দর্জি মোড় দিয়ে যাতায়াত করা যাবে।
- শ্রীরামপুর ও রিষড়া এলাকা: অমূল্যকানন, প্রভাসনগর, বটতলা মোড়, জিতেন লাহিড়ী রোড ও ৪ নম্বর রেলগেটের রাস্তা ব্যবহার করা যাবে।
- উত্তরপাড়া এলাকা: বিশালাক্ষ্মী মোড়, রেললাইনের ধার, সুধীর ঘাট ও ধারসা মোড় দিয়ে বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পুণ্যার্থীদের জন্য বিশেষ পরিষেবা ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো
নিমাইতীর্থ ঘাট থেকে গঙ্গার জল তুলে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে তারকেশ্বর মন্দিরে যান ভক্তরা। দীর্ঘ এই যাত্রাপথকে সুগম করতে প্রশাসন একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
- স্বাস্থ্যসেবা- ওয়াটার অ্যাম্বুল্যান্স: শেওড়াফুলি থেকে তারকেশ্বর (Tarakeswar) পর্যন্ত প্রতি ৫ কিলোমিটার অন্তর ২৪ ঘণ্টার চিকিৎসা কেন্দ্র ও ওষুধ মজুত থাকবে। দ্রুত চিকিৎসার জন্য মণিকমল হাসপাতালেও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গঙ্গায় স্নান ও জল তোলার নিরাপত্তার জন্য ১৪টি ঘাটে নজরদারি চলবে এবং যেকোনও জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকছে ‘ওয়াটার অ্যাম্বুল্যান্স’।
- পানীয় জল ও পরিচ্ছন্নতা: পঞ্চায়েতগুলির উদ্যোগে সমগ্র যাত্রাপথে আলোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের তরফ থেকে ঠান্ডা ও গরম পানীয় জলের সুব্যবস্থা (জলসত্র) থাকবে। পাশাপাশি পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে বৈদ্যবাটি থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত ১৫০ মিটার অন্তর প্রায় শতাধিক অস্থায়ী ডাস্টবিন বসানো হচ্ছে।
- সহায়তা ও নজরদারি: প্রতিটি মোড়ে কড়া পুলিশি নজরদারির পাশাপাশি উঁচুতে ওয়াশ টাওয়ার থেকে নজর রাখবে পুলিশ ও কমিশনারেট। পথচলতি পুণ্যার্থীদের সুবিধার জন্য বিতরণ করা হবে বিশেষ ‘গাইড ম্যাপ’, যাতে পানীয় জল, শৌচালয় ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবস্থান স্পষ্ট চিহ্নিত থাকবে। রেলগেটে দুর্ঘটনা এড়াতে জিআরপি ও অতিরিক্ত পুলিশকর্মী রাখা হচ্ছে। সুবিধার জন্য অতিরিক্ত ট্রেন চালাবে পূর্ব রেলও।
ঐতিহ্যের তারকেশ্বর
কলিকাতা থেকে মাত্র ৫৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রাচীন এই শৈবতীর্থ। হাওড়া থেকে দেড় ঘণ্টার ট্রেনযাত্রায় পৌঁছানো যায় তারকেশ্বর (Tarakeswar) স্টেশনে। আটচালা স্থাপত্যের ঐতিহ্যমণ্ডিত এই মন্দিরে গর্ভগৃহে বিরাজ করছেন স্বয়ং বাবা তারকনাথ। মন্দিরের পশ্চিমে রয়েছে ঐতিহাসিক ‘দুধ পুকুর’ বা শিবগঙ্গা। ভক্তদের বিশ্বাস, শ্রাবণ মাসে বৈদ্যবাটির নিমাইতীর্থ ঘাট থেকে গঙ্গার জল এনে শ্রাবণে বাবা তারকনাথকে স্নান করালে সকল মনোবাসনা পূর্ণ হয়। প্রশাসনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রসঙ্গে মন্ত্রী ভাস্কর ভট্টাচার্য জানান, “মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে শ্রাবণী মেলাকে (Shrabani Mela 2026) এবার এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পুণ্যার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে রাজ্য সরকার ও প্রশাসন পুরোপুরি বদ্ধপরিকর।”

Leave a Reply