CAG Report: স্বাস্থ্যসাথী থেকে আমফান ত্রাণ, একাধিক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, ক্যাগ রিপোর্টে বিস্ফোরক দাবি

amphan-relief-from-swasthyasathi-allegations-of-irregularities-in-multiple-projects-explosive-claims-in-cag-report

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: স্বাস্থ্যসাথী থেকে যুবশ্রী, আমফানের ত্রাণ থেকে পিএম কেয়ার্সের অক্সিজেন প্ল্যান্ট—রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, গাফিলতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে একের পর এক প্রশ্ন ক্যাগের রিপোর্টে (CAG Report)। শনিবার বিধানসভায় ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ২৮টি ক্যাগ রিপোর্ট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। রিপোর্টগুলিতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং রাজ্যের আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে একাধিক গুরুতর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর কথায়, ‘‘এই রিপোর্টগুলো পড়লেই বোঝা যাবে কেন রাজ্যের ঋণের বোঝা এত বেড়েছে।’’

পিএম কেয়ার্সের অক্সিজেন প্ল্যান্টের বড় অংশই চালু হয়নি

ক্যাগ রিপোর্টে (CAG Report) বলা হয়েছে, কোভিডের সময় কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গকে (West Bengal) যে জরুরি আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল, ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত তার ৬৫৯.২৮ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট বরাদ্দের প্রায় ৬৫ শতাংশই খরচ হয়নি। রিপোর্ট অনুযায়ী, পিএম কেয়ার্স তহবিল এবং কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR)-এর অর্থে রাজ্যে ৭৫টি অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হলেও ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৩২টি চালু ছিল। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় অর্থে তৈরি হওয়া বহু পরিকাঠামো দীর্ঘদিন ব্যবহারই করা হয়নি বলে রিপোর্টে (CAG Report) উল্লেখ।

স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে একাধিক অনিয়ম!

স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প নিয়েও একাধিক গুরুতর পর্যবেক্ষণ করেছে ক্যাগ—

  • ভুয়ো সুবিধাভোগীর আশঙ্কা- ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজ্যে রেশন কার্ডধারী পরিবারের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি স্বাস্থ্যসাথী সুবিধাভোগীর নাম নথিভুক্ত ছিল, যা ভুয়ো উপভোক্তার সম্ভাবনার ইঙ্গিত বলেই ক্যাগের রিপোর্টে (CAG Report) উল্লেখ।
  • অতিরিক্ত খরচ ও হাসপাতালের রেটিং নিয়ে প্রশ্ন- স্মার্ট কার্ড বিতরণে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। নমুনা হিসেবে পরীক্ষা করা ৫০টি বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে ৩১টিকে বিধিবহির্ভূতভাবে উচ্চতর শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত (Empanel) করা হয়েছিল। এর ফলে সরকারকে অতিরিক্ত ১৪ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।
  • হাসপাতালের সংখ্যায় ঘাটতি- মোট ২ কোটি ৪৩ লক্ষ পরিবারের জন্য ৩,০৩৮টি হাসপাতাল প্রয়োজন হলেও বাস্তবে তালিকাভুক্ত ছিল মাত্র ২,৬০৫টি হাসপাতাল। ফলে বহু মানুষ স্বাস্থ্যসাথী কার্ড থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি বলে রিপোর্টে (CAG Report) ইঙ্গিত করা হয়েছে।
  • জনবল ও পরিকাঠামোর অভাব- পরিদর্শন করা হাসপাতালগুলির মধ্যে- ৩২টিতে চিকিৎসকের অভাব, ৩৬টিতে নার্সের ঘাটতি, ১৬টিতে ভেন্টিলেটরের মতো জরুরি সরঞ্জামের অভাব ধরা পড়েছে।

বাজেটের অভাবে ঋণ

স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় ২০২০-২২ সালে প্রায় ৭২১ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। পরে সেই ঋণের সুদ বাবদ সরকারকে প্রায় ১০-১১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার করুণ চিত্র

ক্যাগ রিপোর্ট অনুযায়ী—

  • ● বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ৩৬ শতাংশ পদ খালি
  • ● সাধারণ চিকিৎসকের ৪৯ শতাংশ পদ শূন্য
  • ● ৮৯ শতাংশ সাব-সেন্টারে পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী নেই
  • ● কমিউনিটি হেলথ সেন্টারের ৫৪ শতাংশ চিকিৎসকের পদ ফাঁকা
  • ● ৯১ শতাংশ CHC-তে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই
  • ● ৮০ শতাংশের বেশি CHC-তে রক্ত সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না

এছাড়া জেলা হাসপাতালগুলিতে—

  • ● ৬৩ শতাংশ চিকিৎসকের পদ
  • ● ৪৪ শতাংশ প্যারামেডিক্যাল কর্মীর পদ
  • ● ৮০ শতাংশ প্রশাসনিক আধিকারিকের পদ খালি ছিল

যুবশ্রী প্রকল্পেও প্রশ্ন

ক্যাগ (CAG Report) রিপোর্টে উল্লেখ, যুবশ্রী প্রকল্পে আবেদনকারীদের যথাযথ যাচাইয়ের কোনও কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। রিপোর্টে বলা হয়েছে- একই ব্যক্তি বছরের পর বছর ভাতা পাচ্ছেন। নতুন আবেদনকারীদের সুযোগ কমে যাচ্ছে। ভুয়ো আবেদনকারী তালিকায় থেকে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

আমফান ও ইয়াসে ত্রাণে অনিয়ম!

সুপার সাইক্লোন আমফান-এর ক্ষতিপূরণ নিয়েও একাধিক অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করেছে ক্যাগ (CAG Report)। রিপোর্ট অনুযায়ী- রাজ্য সরকার (West Bengal) কেন্দ্রের কাছে ৩৫,০১৮ কোটি টাকা দাবি করলেও নিরীক্ষায় দেখা যায়, প্রকৃত প্রাপ্য ছিল প্রায় ২,৭০৭.৭৭ কোটি টাকা। ৯,২২৬ জন উপভোক্তাকে একাধিকবার বাড়ি তৈরির অনুদান দেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ ১৮.০৭ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে ২১৮.০৪ কোটি টাকা নির্দিষ্ট তহবিলের বাইরে রাখা হয়েছিল, ফলে ৪.৫১ কোটি টাকার সুদের ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে ইয়াস ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতিপূরণে হুগলি ও পূর্ব মেদিনীপুরে ১,৭৭৯ জন একই ব্যক্তি একাধিকবার আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন, যার ফলে ২২.৮৩ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

শিল্পে জমি লিজে প্রায় ১৩ কোটি টাকার ক্ষতি

ক্যাগ রিপোর্টে (CAG Report) আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নদিয়ার হরিণঘাটায় শিল্প পার্কের জমি ৯৯ বছরের জন্য একটি ই-কমার্স সংস্থাকে লিজ দেওয়ার সময় জলাভূমিও লিজের আওতায় চলে আসে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগমের প্রায় ১৩ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিমা সংস্থার বকেয়া বেড়ে ৩১ কোটি টাকা

ক্যাগের রিপোর্টে (CAG Report) বলা হয়েছে, বিমা সংস্থাগুলির কাছে রাজ্য সরকারের প্রায় ৭ কোটি ২৬ লক্ষ টাকা বকেয়া ছিল। সময়মতো সেই অর্থ পরিশোধ না করায় জরিমানা-সহ বকেয়ার পরিমাণ ৩১ কোটিরও বেশি হয়ে যায়। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বকেয়া বৃদ্ধি পেলেও সেই অর্থ বিমা সংস্থাগুলিকে পরিশোধ করা হয়নি।

বাজেট বাস্তবায়নেও অসঙ্গতি

২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের স্টেট ফিনান্সেস অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে- বরাদ্দ ছিল ৩ লক্ষ ৯০ হাজার ৬৩৮.০৪ কোটি টাকা। ব্যয় হয়েছে ৩ লক্ষ ১৯ হাজার ৯৭৫.৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৭০ হাজার ৬৬২.২৫ কোটি টাকা (১৮.০৯ শতাংশ) অব্যবহৃত থেকে গেছে। এছাড়া ১৩ হাজার ৪৮৬.৯২ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় এখনও বিধানসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রেও বহু হাজার কোটি টাকা অব্যবহৃত থাকার কথা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজ্যের আর্থিক অবস্থার চিত্র

ক্যাগ রিপোর্ট অনুযায়ী- রাজস্ব ঘাটতি: ৩৯,৭২৭ কোটি টাকা। আর্থিক (Fiscal) ঘাটতি: ৬১,৯২৪ কোটি টাকা। মোট ঋণ: প্রায় ৭.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত টানা ১০ বছর রাজস্ব ঘাটতির কথাও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে রাজস্ব আয়ের বড় অংশ বেতন, পেনশন, সুদ এবং ভর্তুকি খাতে ব্যয় হওয়ায় পরিকাঠামো উন্নয়নে পর্যাপ্ত মূলধনী বিনিয়োগ সম্ভব হয়নি বলেও পর্যবেক্ষণ করেছে ক্যাগ।

বিজেপির প্রতিক্রিয়া

বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Shamik Bhattacharya) দাবি করেছেন, ক্যাগ রিপোর্ট পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ‘‘ভয়াবহ চিত্র’’ তুলে ধরেছে। তাঁর অভিযোগ, ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়লেও সেই অর্থ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি। তাঁর মতে, প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

ক্যাগ রিপোর্টে যেসব প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে

স্বাস্থ্যসাথী, যুবশ্রী, পিএম কেয়ার্সে অর্থে স্থাপিত অক্সিজেন প্ল্যান্ট, আমফান ও ইয়াস ত্রাণ, জল জীবন মিশন, সমগ্র শিক্ষা মিশন, অঙ্গনওয়াড়ি প্রকল্প, পূর্ত দপ্তরের বিভিন্ন কাজ, শিল্পোন্নয়ন নিগমের জমি লিজ ও রাজ্যের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা- সব মিলিয়ে, ক্যাগের একাধিক রিপোর্টে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থ ব্যয়, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, দুর্যোগ ত্রাণ, কর্মসংস্থান প্রকল্প এবং রাজ্যের আর্থিক ব্যবস্থাপনা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই একাধিক অনিয়ম, গাফিলতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ উঠে এসেছে।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share