Nepal Flood: নেপালের বন্যায় মৃত্যু ১১০০ পার, এবার হিমালয়জুড়ে নতুন বিপদের আশঙ্কা! পঞ্চম বিমান পাঠাল ভারত

nepal-bhotekoshi-floods-death-toll-glacial-flood-risk-himalayas

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: নেপালের ভয়াবহ ভোটেকোশি বন্যায় মৃত্যুমিছিল আরও দীর্ঘ হচ্ছে। বুধবার পর্যন্ত নেপাল পুলিশের হিসাব অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১১২৭। নিখোঁজ প্রায় ৪ হাজার। ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের পর শুধু নেপাল নয়, গোটা হিমালয়জুড়ে বাড়ছে হিমবাহ-উদ্ভূত বন্যা বা গ্লেসিয়াল ফ্লাডের আশঙ্কা। বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সতর্কবার্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের হিমবাহ ও হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদগুলির অস্থিতিশীলতা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১৬ লক্ষ!

প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষ নেপালের ভয়াবহ ভোটেকোশি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে প্রাথমিক পরিস্থিতি রিপোর্টে জানানো হয়েছে। নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান, গোরখা, তানাহুন, নাওয়ালপরাসি ইস্ট ও নাওয়ালপরাসি ওয়েস্ট-সহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এমনকী ভারতের মাটিতেও ৯টি দেহ উদ্ধারের খবর মিলেছে। উদ্ধার হওয়া দেহগুলির মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র ৯৫টি দেহ শনাক্ত করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ফলে নিখোঁজদের সন্ধান এবং মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করা—দুই ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে নেপাল প্রশাসন।

হিমালয়জুড়ে বাড়ছে হিমবাহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় নতুন করে সামনে এনেছে হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশের ঝুঁকি। রাষ্ট্রপুঞ্জের এক শীর্ষ আধিকারিক সতর্ক করেছেন, হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ হিমবাহ-উদ্ভূত বন্যার ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। এই ধরনের বিপর্যয়ের সম্ভাব্য শিকার হতে পারেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। ২০২০ সালে গবেষকরা নেপাল, চিন ও ভারতের হিমালয় অঞ্চলে ৪৭টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ চিহ্নিত করেছিলেন। তবে বর্তমানে সেই সংখ্যা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া জলাধার বা হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ জল নেমে আসতে পারে নিচের উপত্যকায়। এর ফলে নদীর জলস্তর দ্রুত বেড়ে গিয়ে ভেসে যেতে পারে সেতু, রাস্তা, বসতি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতের বড় হিমবাহ-উদ্ভূত বন্যা নেপালের জলবিদ্যুৎ পরিকাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং নদীর তীরবর্তী বহু বসতিকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলতে পারে।

চিনেও নতুন বিপদের সতর্কতা

এদিকে চিনের তিব্বত অঞ্চলেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ছোচেন নদীর ক্রেটার সংলগ্ন বরফের গঠনগুলি এখনও ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে চিনা কর্তৃপক্ষ। সেগুলি ভেঙে গেলে ফের বড় ধরনের জলপ্রবাহ বা বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে জিরং বন্দরের কাছে ভূমিধসের জেরে তৈরি হওয়া একটি ব্যারিয়ার লেক আপাতত স্বাভাবিকভাবে জল ছাড়ছে বলে খবর। বাধার বড় অংশ সরে যাওয়ায় হ্রদটির জলস্তর ও আয়তন কমেছে। শনিবার সকালে এর জলাধারের পৃষ্ঠের আয়তন প্রায় ৯৯ হাজার বর্গমিটার-এ নেমে এসেছে বলে জানা গিয়েছে।

নেপাল থেকে বন্যার জল নেমে আসার পর ভারতের বিহারেও সতর্কতা জারি হয়েছে। বন্যার জলের সঙ্গে অচেনা প্রজাতির মাছ ভেসে আসায় প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

বিপর্যস্ত নেপালের বিদ্যুৎ পরিকাঠামো

বন্যার ধাক্কা পড়েছে নেপালের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাতেও। প্রায় ৪৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এর ফলে নেপালের জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিদ্যুৎ রফতানিতেও প্রভাব পড়তে পারে। একইসঙ্গে বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় এখনও বহু মানুষ আটকে রয়েছেন। প্রায় ৩০০ জন শ্রমিককে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে জানা গিয়েছে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং নতুন করে বন্যা বা ভূমিধসের আশঙ্কার কারণে উদ্ধার অভিযান আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

১০০ কোটি নেপালি টাকা ত্রাণে

বিপর্যয় মোকাবিলায় নেপাল সরকার ১০০ কোটি নেপালি টাকা ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ করেছে। নিখোঁজ ও মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজও চলছে। এই কাজে নেপালকে সাহায্য করছে ভারতের একটি ১৯ সদস্যের ফরেনসিক দল। ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা নেপালি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করছেন। বিপুল সংখ্যক দেহ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নেপালে পঞ্চম বিমান পাঠাল ভারত

এদিকে, নেপালের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা আরও বাড়িয়েছে ভারত। বুধবার নেপালের উদ্দেশে পঞ্চম বিমান পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এই বিমানে রয়েছে ১১ সদস্যের বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল, উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য বিশেষ সরঞ্জাম এবং ৫.৫ টন অত্যাবশ্যক ওষুধ। জয়শঙ্কর জানান, নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা মোকাবিলায় চলমান উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযানে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

এর আগে ভারত নেপালে ৬৮ টনেরও বেশি জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কম্বল, স্লিপিং ব্যাগ, ভারী ত্রিপল, প্লাস্টিক শিট, স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী, ওষুধ, খাবারের প্যাকেট, সৌরবিদ্যুৎচালিত বাতি, জল পরিশোধন ট্যাবলেট এবং পোর্টেবল জেনারেটর। এখনও পর্যন্ত ১৬৩ জন ভারতীয়কে নেপাল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

ভারতের নদীতেও মিলছে বন্যার শিকারদের দেহ

নেপালের বন্যার ভয়াবহতার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের নদীগুলিতেও দেখা যাচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের গণ্ডক নদী থেকে উদ্ধার করা পাঁচ নেপালি বন্যার্তের দেহ নেপাল পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্রায় ৭৫ জন মার্কিন নাগরিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই বিপর্যয়ের প্রভাব ছড়িয়েছে।

শুধু নেপালের বিপর্যয় নয়, হিমালয়ের জন্য বড় সতর্কবার্তা

নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধুমাত্র একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন, হিমবাহ-হ্রদের জল বৃদ্ধি, বরফ ও পাথরের স্তরের অস্থিতিশীলতা এবং পাহাড়ি নদীগুলির আকস্মিক জলপ্রবাহ—সব মিলিয়ে হিমালয় অঞ্চলে নতুন ধরনের জলবায়ুজনিত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বিশেষ করে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চিনের বিস্তীর্ণ হিমালয় অঞ্চলজুড়ে নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বিপুল। ফলে একটি হিমবাহ-হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে তার প্রভাব কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে বহু দূরে পৌঁছে যেতে পারে।

নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় সেই সম্ভাব্য ভবিষ্যতেরই একটি ভয়াবহ ছবি দেখাল। এখন নজর তাই শুধু উদ্ধার ও পুনর্বাসনে নয়—হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং হিমালয়জুড়ে আন্তঃদেশীয় দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকাঠামো কত দ্রুত শক্তিশালী করা যায়, সেদিকেও।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share