Defence Acquisition Council: ১.১০ লক্ষ কোটি টাকার প্রতিরক্ষা কেনাকাটায় সায়! ৯৮% সরঞ্জামই তৈরি হবে ভারতে, বড় সিদ্ধান্ত ডিএসির

india-defence-procurement-98-percent-indigenous-dac-approval

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যে আরও বড় পদক্ষেপ কেন্দ্রের। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বে সোমবার বৈঠকে বসে ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল (ডিএসি)। সেই বৈঠকেই ভারতীয় সেনা, নৌসেনা ও বায়ুসেনার জন্য প্রায় ১.১০ লক্ষ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সামরিক ব্যবস্থা কেনার প্রস্তাবে অ্যাকসেপ্ট্যান্স অব নেসেসিটি (এওএন) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, অনুমোদিত ক্রয়ের প্রায় ৯৮ শতাংশই ভারতীয় শিল্পের কাছ থেকে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে একদিকে যেমন তিন বাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা ও অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পও বড় অর্ডার পাবে।

সেনাবাহিনীর জন্য একাধিক অত্যাধুনিক সরঞ্জাম

ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে ডিএসি। এর মধ্যে রয়েছে কেমিক্যাল, বায়োলজিক্যাল, রেডিওলজিক্যাল অ্যান্ড নিউক্লিয়ার (সিবিআরএন) রিকনেসান্স ভেহিকল, হাই মোবিলিটি ভেহিকল, সেল্ফ-প্রোপেলড মেকানিক্যাল মাইন লেয়ার, অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার (এএলএইচ), ট্রল ট্যাঙ্ক এবং সর্বত্র ব্রিজ সিস্টেম।

সিবিআরএন রিকনেসান্স ভেহিকলের সাহায্যে রাসায়নিক, জৈবিক, তেজস্ক্রিয় এবং পরমাণু উপাদানে দূষিত এলাকা দ্রুত শনাক্ত, চিহ্নিত, পর্যবেক্ষণ ও নির্দিষ্ট করে দেওয়া সম্ভব হবে। যুদ্ধক্ষেত্রে কোনও অঞ্চল সিবিআরএন উপাদানে আক্রান্ত হলে সেনার জন্য নিরাপদ পথ নির্ধারণ এবং পরিস্থিতি মূল্যায়নে এই যানগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

অন্যদিকে, হাই মোবিলিটি ভেহিকল কঠিন ও দুর্গম ভূখণ্ডে সেনার দ্রুত গতিশীলতা এবং রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করবে। পাহাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে প্রতিকূল সীমান্ত অঞ্চলে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম দ্রুত সরানোর ক্ষেত্রে এই ধরনের যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সেল্ফ-প্রোপেলড মেকানিক্যাল মাইন লেয়ার সেনাবাহিনীকে দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকরভাবে মাইন পাতা বা মাইনফিল্ড তৈরি করার সক্ষমতা দেবে। বিশেষ করে দুর্গম ভূখণ্ডে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই ব্যবস্থা সেনার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে আরও নমনীয় করবে।

এএলএইচ থেকে সর্বত্র ব্রিজ—যুদ্ধক্ষেত্রে বাড়বে সক্ষমতা

ডিএসির অনুমোদিত তালিকায় রয়েছে অ্যাডভান্সড লাইট হেলিকপ্টার বা এএলএইচ-ও। বিভিন্ন ভূপ্রকৃতি এবং জটিল অপারেশনাল পরিস্থিতিতে সেনা ও বায়ুসেনার গুরুত্বপূর্ণ মিশনে এই হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হবে। দুর্গম এলাকায় সেনা মোতায়েন, সরঞ্জাম পরিবহণ এবং বিভিন্ন ধরনের অভিযানে এএলএইচ-এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এছাড়া ট্রল ট্যাঙ্ক এবং সর্বত্র ব্রিজ সিস্টেম-এর অনুমোদনও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যুদ্ধক্ষেত্রে নদী, খাল বা অন্যান্য জলপথ এবং দুর্গম ভূখণ্ড অতিক্রম করে সেনার যুদ্ধবিন্যাসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থাগুলি সাহায্য করবে। অর্থাৎ, শুধু অস্ত্রশক্তি নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত গতিশীলতা এবং বাধা অতিক্রমের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও জোর দিয়েছে ডিএসি।

নৌসেনায় অরুধ্র রেডার, দেশীয় মেরিন গ্যাস টারবাইন

ভারতীয় নৌসেনার জন্যও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন দিয়েছে ডিএসি। এর মধ্যে রয়েছে অরুধ্র রেডার সংগ্রহ এবং মেরিন গ্যাস টারবাইন (এমজিটি)-এর নকশা, উন্নয়ন ও পরবর্তী পর্যায়ে সংগ্রহের প্রস্তাব।নৌসেনার বিভিন্ন নেভাল এয়ার স্টেশনে বর্তমানে ব্যবহৃত এয়ার রুট সার্ভেল্যান্স রেডার-এর পরিবর্তে অরুধ্র রেডার বসানো হবে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই রেডার নৌসেনার বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল মেরিন গ্যাস টারবাইন। যুদ্ধজাহাজের প্রোপালশন সিস্টেম বা চালনা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত এই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিদেশি সরবরাহকারীদের উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে ভারত। দেশেই মেরিন গ্যাস টারবাইন তৈরি ও উন্নয়নের উদ্যোগ ভবিষ্যতে যুদ্ধজাহাজের প্রপালশন প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

বায়ুসেনার যুদ্ধক্ষমতা বাড়াতে একাধিক অনুমোদন

ভারতীয় বায়ুসেনার ক্ষেত্রেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে ছাড়পত্র দিয়েছে ডিএসি। ফাইটার এয়ারক্রাফ্ট, ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফ্ট এবং হেলিকপ্টার-এর যুদ্ধক্ষমতা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন সরঞ্জাম ও ব্যবস্থা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি বায়ুসেনার জন্য গ্রাউন্ড-বেসড মাল্টি-পারপাস জ্যামার (জিবিএমপিজে) সংগ্রহের প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে। আধুনিক যুদ্ধে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা বৈদ্যুতিন যুদ্ধব্যবস্থার গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। শত্রুপক্ষের রেডার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিন ব্যবস্থার কার্যকারিতা ব্যাহত করতে জিবিএমপিজে ব্যবহার করা যাবে। কার্যকর জ্যামিংয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের নজরদারি ও লক্ষ্য শনাক্তকরণের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

কাগজের পরিচয়পত্রের বদলে স্মার্ট কার্ড

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ডিফেন্স ফোর্সেস সিকিওর অ্যাকসেস কার্ড (ডিইএফএসিএসি) ব্যবস্থা। ডিএসি এই ব্যবস্থাও অনুমোদন করেছে। বর্তমানে ব্যবহৃত কাগজের পরিচয়পত্র, প্রবেশপত্র এবং অনুমতিপত্রের পরিবর্তে ইন্টারঅপারেবল রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি)-ভিত্তিক স্মার্ট কার্ড চালু করা হবে। এর ফলে প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ আরও আধুনিক, দ্রুত এবং প্রযুক্তিনির্ভর হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অ্যাকসেস-কন্ট্রোল ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

৯৮ শতাংশ দেশীয় ক্রয়—কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এই ডিএসি বৈঠকের সবচেয়ে বড় বার্তা সম্ভবত প্রায় ৯৮ শতাংশ ক্রয় ভারতীয় শিল্পের কাছ থেকে করার পরিকল্পনা। অর্থাৎ, ১.১০ লক্ষ কোটি টাকার এই বিপুল প্রতিরক্ষা বরাদ্দের বড় অংশই দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন শিল্পে প্রবাহিত হবে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশীয় প্রতিরক্ষা নির্মাতা সংস্থা, প্রযুক্তি সংস্থা, গবেষণা ও উন্নয়ন ক্ষেত্র এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলের উপর। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে ভারতীয় সংস্থাগুলির উৎপাদন ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি বিদেশি প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষ করে মেরিন গ্যাস টারবাইনের মতো জটিল প্রযুক্তি দেশেই তৈরি করার উদ্যোগ দেখাচ্ছে, ভারত শুধু অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম আমদানি কমানোর দিকেই নয়, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মূল ভিত্তি দেশেই গড়ে তুলতে চাইছে।

সব মিলিয়ে, প্রায় ১.১০ লক্ষ কোটি টাকার ডিএসি অনুমোদনকে শুধু একটি বড় প্রতিরক্ষা ক্রয় হিসেবে দেখলে বিষয়টির পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়বে না। সেনা, নৌসেনা ও বায়ুসেনার যুদ্ধক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর লক্ষ্যকে একই সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবেই এই সিদ্ধান্তকে দেখা হচ্ছে।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share