Rafale Indian Weapons: পুরো সোর্স কোড নয়, তবু রাফালে যুক্ত হবে দেশীয় অস্ত্র! ভারতের জন্য ‘পথ’ খুলছে ফ্রান্স?

france-offer-make-in-india-weapons-integration-source-code-icd-rafale

মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতীয় বায়ুসেনার রাফাল যুদ্ধবিমানে দেশীয় অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে নয়াদিল্লিকে আরও বেশি স্বাধীনতা দেওয়ার পথ খোঁজা যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ফ্রান্স। ১১৪টি অতিরিক্ত রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাব নিয়ে ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে আলোচনা চলার মধ্যেই এই বার্তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, ভবিষ্যতে বিদেশি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করলেও তার অস্ত্রভাণ্ডার ও প্রযুক্তিগত আপগ্রেডের ক্ষেত্রে ভারত আরও বেশি আত্মনির্ভর হতে চাইছে।

ফরাসি এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সের ভাইস চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডমিনিক তার্দিফ বর্তমানে ভারতে রয়েছেন। ‘তরঙ্গ শক্তি’ মহড়ার আবহে তিনি জানিয়েছেন, ভারতীয় বায়ুসেনার প্রয়োজনীয়তা ফ্রান্স বুঝতে পারছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, রাফালকে এমনভাবে ব্যবহারের একটি ব্যবস্থা খোঁজা হচ্ছে, যাতে ভারত ভবিষ্যতে শুধু বিমানের সঙ্গে আগে থেকেই সংযুক্ত অস্ত্রের উপর নির্ভরশীল না থাকে।

ভারতের ‘সার্বভৌমত্ব’ ও আত্মনির্ভরতার প্রশ্ন

তার্দিফ বলেন, একটি দেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সার্বভৌমত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্সও এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের সঙ্গে দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতাও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

ভারত গত কয়েক বছরে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে আত্মনির্ভরতার উপর বিশেষ জোর দিয়েছে। দেশীয় অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, সেন্সর, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিকে বিদেশি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত করার বিষয়টিও সেই বৃহত্তর নীতির অংশ। রাফাল যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রেও নয়াদিল্লির লক্ষ্য একই—বিদেশি বিমান ব্যবহার করলেও গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যাতে সম্পূর্ণভাবে বিদেশি সরবরাহকারীর উপর নির্ভর করতে না হয়।

তার্দিফের বক্তব্য, এমন একটি ব্যবস্থা খুঁজে বের করাই মূল বিষয়, যার মাধ্যমে ভারতীয় বায়ুসেনা রাফালের সঙ্গে মূলত আগে থেকে সংযুক্ত নয়—এমন অস্ত্রও ব্যবহার করতে পারে। এই বিষয়ে ফরাসি প্রতিরক্ষা সংস্থা, ভারতীয় শিল্প সংস্থা এবং দুই দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সম্পূর্ণ সোর্স কোড না পেলেও কি দেশীয় অস্ত্র যুক্ত করা সম্ভব?

রাফাল নিয়ে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। আধুনিক যুদ্ধবিমানের সফটওয়্যার অত্যন্ত জটিল। বিমানের মিশন সিস্টেম, রেডার, সেন্সর, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং অস্ত্র ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলি সফটওয়্যার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে কোনও নতুন অস্ত্রকে বিমানের সঙ্গে সংযুক্ত করতে গেলে বিমানের অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার সম্পর্কে নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত তথ্যের প্রয়োজন হয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরো যুদ্ধবিমানের ‘সোর্স কোড’ হাতে তুলে দিতে হবে। বরং একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে ইন্টারফেস কন্ট্রোল ডকুমেন্ট বা আইসিডি-র মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত তথ্য দেওয়া।

সহজভাবে বললে, আইসিডি হল এমন একটি প্রযুক্তিগত নথি, যেখানে একটি অস্ত্র, সেন্সর বা অন্য কোনও সরঞ্জাম কীভাবে বিমানের বিভিন্ন সিস্টেমের সঙ্গে যোগাযোগ করবে, তার নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রয়োজনীয় তথ্য থাকে। এই ধরনের ইন্টারফেস-স্তরের তথ্য পাওয়া গেলে সম্পূর্ণ সোর্স কোডের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই দেশীয় অস্ত্রকে রাফালের সঙ্গে সংযুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভারতের দৃষ্টিতে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সম্পূর্ণ সোর্স কোড পাওয়া একদিকে যেমন প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাজনিত নানা প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে দেশীয় অস্ত্র সংযুক্ত করার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সফটওয়্যার কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া অপরিহার্য নাও হতে পারে।

১১৪ রাফালের প্রস্তাবিত চুক্তিতে কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?

ভারত ইতিমধ্যেই ফ্রান্সের কাছ থেকে পাওয়া ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে। এবার আরও ১১৪টি রাফাল কেনার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-র গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকার কথা রয়েছে। ফলে শুধু বিমান কেনাই নয়, ভারতের নিজস্ব শিল্পক্ষেত্রকে এর সঙ্গে কতটা যুক্ত করা যায়, সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এই বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যেই দেশীয় অস্ত্র ও প্রযুক্তি রাফালে সংযুক্ত করার দাবি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, ভারত যদি ভবিষ্যতে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র, সেন্সর বা অন্যান্য যুদ্ধ-প্রযুক্তি তৈরি করে, তা হলে প্রতিটি নতুন ব্যবস্থাকে বিদেশি যুদ্ধবিমানের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হতে চাইছে না নয়াদিল্লি।

অর্থাৎ, ১১৪ রাফালের সম্ভাব্য চুক্তিতে ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু কতগুলি বিমান আসবে তা নয়। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—বিমানগুলির সঙ্গে ভারতীয় শিল্পের সম্পর্ক কতটা গভীর হবে এবং ভবিষ্যতে ভারত নিজস্ব অস্ত্র ও প্রযুক্তি কতটা স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারবে।

রাফাল এফ৪ থেকে এফ৫—ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

রাফাল নিজেও ক্রমাগত আধুনিকীকরণের মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে ফ্রান্স রাফালের উন্নত এফ৪ মানের দিকে এগোচ্ছে। পাশাপাশি ২০৩০-এর দশকের জন্য পরবর্তী বড় আধুনিকীকরণ ধাপ হিসেবে এফ৫ নিয়ে কাজ চলছে।

ফরাসি সংসদের নথি অনুযায়ী, রাফাল এফ৫ কর্মসূচিতে সেন্সর, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং প্রপালশন-সহ একাধিক ক্ষেত্রে উন্নতির পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে আজ রাফালের সঙ্গে কোন অস্ত্র বা প্রযুক্তি সংযুক্ত করা যাবে, সেই প্রশ্নটি শুধুমাত্র বর্তমান ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত নয়। আগামী এক-দুই দশকে ভারতীয় বায়ুসেনার যুদ্ধক্ষমতা কীভাবে গড়ে উঠবে, তার সঙ্গেও বিষয়টি সম্পর্কিত।

ভারত ইতিমধ্যেই দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির পরিসর দ্রুত বাড়াচ্ছে। ভবিষ্যতে সেই প্রযুক্তি যদি রাফালের মতো অত্যাধুনিক বিদেশি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সহজে যুক্ত করা যায়, তা হলে একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধবিমানকে কেন্দ্র করে তৈরি করা দেশীয় অস্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহারিক পরিসরও বাড়তে পারে।

শুধু রাফাল নয়, বৃহত্তর আত্মনির্ভরতার প্রশ্ন

রাফালে দেশীয় অস্ত্র সংযুক্তির বিষয়টি তাই একটি নির্দিষ্ট চুক্তির প্রযুক্তিগত শর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা-আত্মনির্ভরতার প্রশ্নও জড়িত।

বিদেশি যুদ্ধবিমান কেনার পর তার অস্ত্র, সফটওয়্যার এবং আপগ্রেডের ক্ষেত্রে যদি ব্যবহারকারী দেশকে প্রতিবার মূল নির্মাতার অনুমতির উপর নির্ভর করতে হয়, তা হলে যুদ্ধবিমানের পূর্ণ অপারেশনাল স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে। ভারত সেই নির্ভরতা কমিয়ে এমন একটি মডেল চাইছে, যেখানে বিদেশি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সমন্বয় করা সম্ভব হবে।

ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বার্তা সেই আলোচনাকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তবে ঠিক কী ধরনের প্রযুক্তিগত তথ্য ভারত পাবে, দেশীয় কোন কোন অস্ত্র রাফালের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব হবে এবং প্রস্তাবিত ১১৪টি বিমানের চুক্তিতে এই বিষয়টি কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে—তা এখনও আলোচনার বিষয়।

Please follow and like us:

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

LinkedIn
Share