মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তির পর এবার ফ্রান্সের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং স্বাস্থ্য-সহ মোট ২০টি ক্ষেত্রে একাধিক চুক্তি (India-France Deal) সই করল ভারত। মঙ্গলবার মুম্বইয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রঁর (Emmanuel Macron) দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা করা হয়। উদ্ভাবন ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগী ফ্রান্স (India France Deal) একথা স্পষ্ট করে দেন প্রেসিডেন্ট মাক্রঁ।
সম্পর্কের গভীরতাই আমাদের শক্তি
এদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রঁর আলোচনায় বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও প্রযুক্তি-সহ একাধিক কৌশলগত বিষয় উঠে আসে বলে জানা গিয়েছে। মুম্বইয়ে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, “আজ বিশ্ব এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত-ফ্রান্স অংশীদারিত্ব বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।” তিনি আরও বলেন, “ফ্রান্স ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধু দেশ, এই সম্পর্কের গভীরতাই আমাদের শক্তি।” মঙ্গলবার মোদি-মাক্রঁ বৈঠকের পরে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং স্বাস্থ্যের মতো ২১টি বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা চুক্তি সইয়ের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, তিন দিনের সফরে সস্ত্রীক ভারতে এসেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট। সোমবার গভীর রাতে মুম্বইয়ে অবতরণ করে তাঁর বিমান। মঙ্গলবার সকালে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীতে মহারাষ্ট্রের রাজ্যপালের বাসভবনে দুই রাষ্ট্রনেতার বৈঠক হয়। এর পরে একই গাড়িতে চড়ে তাঁরা যান একটি হোটেলে আয়োজিত ভারত-ফ্রান্স ইনোভেশন ফোরামে যোগ দিতে।
বিশ্বস্ত অংশীদার ভারত
এদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাক্রঁ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রসারকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর কথায়, “রাফাল জেট থেকে সাবমেরিন, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতা সম্প্রসারণ করছি।” পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, “ফ্রান্সের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অংশীদারদের মধ্যে ভারত অন্যতম।” নয়াদিল্লির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা গড়ে তোলার বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমরা ভারত-ফ্রান্স সহযোগিতা আরও গভীর শক্তিশালী করতে চাই। আগামি কয়েক বছরের মধ্যে ৩০ হাজার ভারতীয় পড়ুয়াকে স্বাগত জানাতে ফ্রান্স প্রস্তুত।’’
এআই সামিটে যোগ
মুম্বইয়ে বৈঠক শেষে মঙ্গলবার রাতেই কৃত্রিম মেধা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি পৌঁছেছেন দুই রাষ্ট্রনেতা। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়ে ভারতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন মাক্রঁ। এরপর বৃহস্পতিবার এই সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ভারত ও ফ্রান্সের যৌথ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে।
ভারত-ফ্রান্স ২১টি চুক্তি
ভারত ও ফ্রান্স দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে “স্পেশাল গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ”-এ উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মোদি-মাক্রঁ। বৈঠকের পর মোট ২১টি চুক্তির কথা ঘোষণা করা হয়। উভয় দেশ ‘হরাইজন ২০৪৭ রোডম্যাপ’ ও উন্নীত অংশীদারিত্বের বাস্তবায়ন নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য বার্ষিক আলেচনার কথা বলেছে। দুই দেশের বিদেশমন্ত্রীদের মধ্যে এই আলোচনার কথা হবে। পাশাপাশি ‘ইন্ডিয়া-ফ্রান্স ইয়ার অব ইনোভেশন’ এবং ‘ইন্ডিয়া-ফ্রান্স ইনোভেশন নেটওয়ার্ক’ চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে চুক্তি
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে কর্ণাটকের ভেমাগালে ভারতের প্রথম এইচ১২৫ হেলিকপ্টার সংযোজন লাইন উদ্বোধন করা হয়েছে। কর্নাটকে এইচ-১২৫ হেলিকপ্টারে ‘ফাইনাল অ্যাসেম্বলি লাইন’-র (যন্ত্রাংশ একত্রিত করা) উদ্বোধন করা হল। যা ভারতের প্রথম বেসরকারি হেলিকপ্টারের ‘ফাইনাল অ্যাসেম্বলি লাইন’। টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস এবং এয়ারবাসের যৌথ উদ্যোগে সেই কাজ চলবে। যে প্রকল্পকে ভারতে বিমান তৈরির ক্ষেত্রে বড় ‘বুস্টার ডোজ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আর সেই প্রকল্পের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতায় উড়তে সক্ষম হেলিকপ্টার তৈরি করবে ভারত এবং ফ্রান্স।
‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সম্মত
দুই দেশ ভারত সরকার ও ফরাসি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি নবীকরণ এবং বিএইএল ও সাফরানের যৌথ উদ্যোগে ভারতে ‘হ্যামার’ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সম্মত হয়েছে। ভারতে হ্যামার মিসাইল তৈরির বিষয়ে মউ স্বাক্ষর করেছে ভারত ইলেকট্রনিকস লিমিটেড এবং সাফরান ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ডিফেন্স। যে মিসাইল আপাতত রাফাল যুদ্ধবিমানে ব্যবহার করা হয়। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হ্যামার মিসাইল মোটামুটি ৬০-৭০ কিলোমিটার দূরে থাকা গ্রাউন্ড ‘টার্গেট’-কে নিখুঁতভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে। পাহাড়ি এলাকা এবং বাঙ্কারের মধ্যে একেবারে নিখুঁতভাবে ধ্বংসলীলা চালাতে পারে হ্যামার এয়ার-টু-গ্রাউন্ড মিসাইল।
রাফাল যুদ্ধবিমান নিয়ে আলোচনা
ভারতীয় সেনাবাহিনী ও ফরাসি ল্যান্ড ফোর্সেসের প্রতিষ্ঠানে পারস্পরিকভাবে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে। মঙ্গলবার মোদি-মাক্রঁ বৈঠকে দ্বিতীয় দফায় ফ্রান্সের দাসো অ্যাভিয়েশনের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনা এবং ডুবোজাহাজ নির্মাণের বিষয়টি নিয়েও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রের খবর। সমঝোতা হয়েছে যৌথ উদ্যোগে হিমালয়ের উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে উড়ানে সক্ষম হেলিকপ্টার নির্মাণের বিষয়ে।
উদীয়মান প্রযুক্তি ক্ষেত্র
গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি, বিশেষত প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যৌথ উন্নত প্রযুক্তি উন্নয়ন গোষ্ঠী গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও ধাতু নিয়ে সহযোগিতার জন্য যৌথ অভিপ্রায় ঘোষণা করা হয়েছে। উন্নত উপকরণ বিষয়ক একটি কেন্দ্র স্থাপনে ডিএসটি ও সিএনআরএস-এর মধ্যে ইচ্ছাপত্র বিনিময় হয়েছে। এছাড়াও ভারত-ফ্রান্স দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির প্রোটোকলে সংশোধন আনা হবে। স্টার্ট-আপ, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কৌশলগত সহযোগিতার জন্য টি-হাব ও নর্ড ফ্রান্সের মধ্যে অভিপ্রায়পত্র এবং ডিএসটি ও সিএনআরএস-এর মধ্যে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
ইন্দো-ফ্রেঞ্চ কেন্দ্র স্থাপন
ডিজিটাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে একটি ইন্দো-ফ্রেঞ্চ কেন্দ্র স্থাপনে যৌথ অভিপ্রায় ঘোষণা করা হয়েছে। নয়াদিল্লির এইমসে ‘ইন্দো-ফ্রেঞ্চ সেন্টার ফর এআই ইন হেলথ’ চালু হবে। সংক্রামক রোগ ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য গবেষণায় সহযোগিতার জন্য ডিবিটি ও এএনআরএস-এর মধ্যে অভিপ্রায়পত্র বিনিময় হয়েছে। এছাড়া ‘ইন্দো-ফ্রেঞ্চ সেন্টার ফর মেটাবলিক হেলথ সায়েন্সেস’ প্রতিষ্ঠায় চুক্তি হয়েছে। এর পাশাপাশি এরোনটিক্স ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি জাতীয় উৎকর্ষ কেন্দ্র স্থাপনে অভিপ্রায়পত্র বিনিময় হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতায় ভারতের নব ও নবায়নযোগ্য শক্তি মন্ত্রক এবং ফ্রান্সের অর্থ, শিল্প, জ্বালানি ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব মন্ত্রকের মধ্যে সমঝোতা স্মারক নবীকরন করা হয়েছে। ভারতীয় ডাক বিভাগ, যোগাযোগ মন্ত্রক ও ফ্রান্সের লা পোস্টের মধ্যেও একটি অভিপ্রায়পত্র বিনিময় হয়েছে।
মহাকাশ প্রযুক্তির বিভিন্ন পরিকাঠামো
মঙ্গলবার ফ্রান্সের সংস্থা এক্সোট্রেলের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে তিন ভারতীয় সংস্থা ধ্রুব স্পেস, পিক্সেল এবং এক্সডিলিঙ্ক্স ল্যাব্স-এর সঙ্গে। মঙ্গলবার দুপুরে এক্সোট্রেল নিজেই এই চুক্তির কথা ঘোষণা করেছে। এক্সোট্রেল মূলত বিভিন্ন মহাকাশ প্রযুক্তি তৈরি করে। জানা যাচ্ছে, তারা তিন ভারতীয় সংস্থাকে ‘প্রোপালশন সিস্টেম’ বিক্রি করবে। কত টাকার প্রযুক্তি কেনার বিষয়ে এই চুক্তি হয়েছে, তা প্রাথমিক ভাবে প্রকাশ্যে আসেনি। যে তিন ভারতীয় সংস্থার সঙ্গে এক্সোট্রেল চুক্তি সেরেছে, তিনটিই মহাকাশ প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। ধ্রুব স্পেস কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি করে। পিক্সেল তৈরি করে মহাকাশ প্রযুক্তির বিভিন্ন পরিকাঠামো। এক্সডিলিঙ্ক্স ল্যাব্স-ও ছোট কৃত্রিম উপগ্রহের ডিজাইন তৈরি করে। দুই দেশই এই নতুন অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যসহ কৌশলগত খাতে সহযোগিতা আরও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

Leave a Reply